স্বাধীনতা যুদ্ধে আমার মায়ের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যখন কারাগারে বন্দি করা হতো তখন ছাত্রলীগ যত আন্দোলন সংগ্রামের পরামর্শ সেটা বঙ্গমাতার কাছ থেকেই নিতেন এবং শুধু কারাগারে থাকা অবস্থায় না, সব সময় ছাত্রলীগের সাথে আমার মায়ের একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। গতকাল সোমবার বিকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে শোক দিবস উপলক্ষে ছাত্রলীগের আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী এভাবেই তার মায়ের স্মৃতিচারণ করছিলেন। শৈশব থেকে কৈশোর এমনকি বড় হয়েও মায়ের সেই অমলিন মুখ ও সাহচর্যের কথা এখনো প্রধানমন্ত্রীর স্মৃতিকে নাড়া দেয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন কারগারে বন্দি হতেন তখন ছাত্রলীগের কোনো অর্থের প্রয়োজন হলে আমার মা গহনা বিক্রি করতেও পিছ না হননি এবং ছাত্রলীগকে সুসংগঠিত ভাবে গড়ে তোলার জন্য তার ছিল অগ্রণী ভূমিকা।
স্বাধীনতাযুদ্ধে মায়ের ভূমিকা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হবে, স্বাধীন দেশের পতাকা থাকবে, স্বাধীন দেশের জাতীয় সংগীত থাকবে আর এই স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য যে শ্লোগান প্রয়োজন এই শ্লোগানগুলি জাতির পিতা ঠিক করে দিতেন। এমনকি কারাগারে থাকা অবস্থায় বাইরে কি হচ্ছে সেই খবরগুলো যখন কারাগারে আমরা সাক্ষাৎকারের জন্য যেতাম, তখন সাক্ষাৎকারের সময় সেখানে সরকারি গোয়েন্দার সংস্থার লোকসহ কারাগারের লোক উপস্থিত থাকত। কিন্তু তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে, কান এড়িয়ে, বাইরের সমস্ত তথ্যগুলো বঙ্গবন্ধুর কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তার নির্দেশ নিয়ে আসা, এই কাজ বঙ্গমাতা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে করতেন। এবং আমার মায়ের অসাধারণ স্মরণ শক্তি ছিল। স্মরণ শক্তি দিয়েই বঙ্গবন্ধুর কথাগুলো মনে রাখতেন এবং কথাগুলো আগেই ছাত্রলীগকে বলে দিতেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামে আমার মা সবসময় বঙ্গবন্ধুর পাশে ছিল। সেদিক থেকে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত সৌভাগ্যবান, যে তিনি পরিবারের সমর্থন সবসময় পেয়েছেন, আমারা দাদা, দাদী, মা সকলেই সবসময় তার পাশে ছিলেন, তাকে প্রেরণা দিয়েছেন, তাকে সাহস দিয়েছেন, কখনো নিজেদের সামান্য চাহিদার জন্য আমার বাবাকে বিরক্ত করেননি। আমার মায়ের যেটুকু আর্থিক সম্পদ ছিল, সেই সম্পত্তির একটি অর্থও নিজের জন্য খরচ করেন নি। সবকিছু জমা করে রাখতেন। তিনি জানতেন বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করেন সুতরাং তার খরচের জন্য এগুলো লাগবে এবং সেই অর্থসম্পদগুলো তাকেই দিয়ে দিতেন। আমার মায়ের কখনো কোনো চাহিদা ছিল না। আমি বড় সন্তান, আমি সব কিছুই দেখেছি। করাচিতে যখন পার্লামেন্ট বসত তখন বঙ্গবন্ধু সেখানে যেতেন কিন্তু আমার মা কখনো পাকিস্তানে আমার বাবার সাথে যেতে চাইত না। তিনি কখনো পাকিস্তানে যাননি এবং যেতেও চাইতো না। আমার বাবার মনের কথা জানতেন, যে এই দেশকে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন করতে চান। কাজেই সেই চিন্তাটি আমরা তার ভেতরে সব সময় দেখেছি। যে কারণে প্রতিটি সংগ্রামে, আন্দোলনে পর্দার আড়ালে থেকে তিনি কাজ করেছেন। এবং কিভাবে একটি সংগ্রাম গড়ে তুলতে হয় তার থেকে ভাল আর কেউ জানে না। আন্দোলন সংগ্রাম যতটুকু শিখেছি ততটুকু মায়ের কাছ থেকেই শিখেছি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো বলেন, আমরা মা অত্যন্ত সহজ সরল ভাবে জীবন পরিচালিত করতেন। স্বাধীনতার পর আমার মা ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িটিতেই ছিলেন। তিনি কখনো প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে যান নি। কারণ তিনি বলেছেন, ওই শান-শওকতে আমার ছেলে-মেয়ে যদি বড় হয় তাহলে তাদের আমি মানুষ করতে পারব না। তারা ওই বিলাস বহুল জীবনে অভ্যস্ত হয়ে যাবে। যে কারণে তিনি সবসময় সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ছিলেন, রাষ্ট্রপতির স্ত্রী ছিলেন, তারপরও আমার বাবার খাবার নিজে পাক করতেন এবং আমার দাদা, দাদীর জন্যও রান্না আমার মা নিজের হাতে করতেন। নিজের হাতে পরিবেশন করে খাবার দিতেন। কখনো কোনো অহমিকা আমার মায়ের মধ্যে ছিল না। অত্যন্ত সাধারণ ভাবে তিনি জীবনযাপন করতেন এবং সেই শিক্ষাই তিনি আমাদের দিয়ে গেছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার মা সবসময় বলতেন, সব সময় মাটির দিকে তাকাতে, নিচের দিকে তাকাবে। তোমার থেকে কে খারাপ আছে তার দিকে তাকাও, তোমার থেকে কে ভাল আছে তার দিকে তাকাতে যেও না। কারণ সেদিকে তাকাতে গেলে এবং সে জায়গায় পৌঁছাতে গেলে তোমাদের পদস্খলন ঘটবে। তুমি এদেশের দরিদ্র মানুষের কথা চিন্তা কর। বিলাস বহুল জীবন তাদের ছিল না এবং সেই শিক্ষাও আমাদের দিয়েছেন আমরা মা। আমার মা বলেছেন এত বিলাস বহুল পোশাক পড়ে কাকে দেখাবে, যে দেশের মানুষ এক বেলা ভাত পায় না। তোমরা বিলাস বহুল পোশাক পড়বে যেদিন এ দেশের মানুষ দু’বেলা তাদের পেট ভরে খেতে পারবে। তাদের জীবন উন্নত হবে তোমরা সেদিনই এই বিলাশ বহুল পোশাক পড়বে। আমরা মায়ের কাছ থেকে সেই শিক্ষাই পেয়েছি।
লেখাপড়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, লেখাপড়ার প্রতি আমার মা ছিলেন অত্যন্ত মনোযোগী। কিন্তু তিনি লেখাপড়া করতে পারেনি। কারণ তখনকার সময়ে টুঙ্গিপাড়া গ্রামে পৌঁছাতে ২২ থেকে ২৪ ঘণ্টা সময় লেগেছে এবং নৌ পথ ছাড়া আর কোনো গতি ছিল না। এবং ওই এলাকায় লেখা পড়ার করার মত তেমন কোনো সুযোগও ছিল না। পড়ালেখার জন্য মাত্র একটি স্কুল ছিল এবং সেই স্কুলে যাওয়া তত সহজ ছিল না। সেই সময়ে মেয়েদের লেখা সুযোগ ছিল অত্যন্ত কম। মেয়েদের বয়স ১০ বছর হলে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হত। কিন্তু আমার মায়ের লেখা পড়ার প্রতি ছিল অত্যন্ত মনোযোগ। সেজন্য আমাদের বাড়িতে যে মাস্টার ছিল তাদের কাছে আমার মা পড়তেন। সেই সাথে নিজেও অনেক পড়াশুনা করতেন এবং বই কিনতেন। আমার বাবা যখন জেলে ছিল তখন তিনি জেল থেকে কিছু বইয়ের তালিকা দিতেন এবং সেই বইগুলো নিউমার্কেট এমনকি বাংলাবাজার গিয়ে কিনে নিয়ে আসতেন। পড়াশুনা, ঘর সংসার সামলানোর পাশাপাশি রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দেখাশুনা করতেন আমার মা।