ঢাকা: কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তন করলে মালিকানা হারাতে হবে এমন বিধান রেখে কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন- ২০১৫’র খসড়া প্রকাশ করেছে সরকার।
পাশাপাশি আইনের খসড়ায় দেশের খাস জমির বন্দোবস্ত বা ভোগদখলের অধিকার দেওয়া হয়েছে শুধুমাত্র ভূমিহীনদের। ভূমিহীন ছাড়া কেউ খাসজমি বন্দোবস্ত নিলেও তা বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। এ সব বিধান রেখে ভূমি মন্ত্রণালয় আইনের খসড়াটি প্রস্তুত করেছে। এটি চূড়ান্ত করতে  মতামতও চাওয়া হয়েছে।
খসড়া আইনের ৪ ধারার বিভিন্ন উপধারায় বলা হয়, বাংলাদেশের সব কৃষিজমির ওপর দেশের যে কোনো কৃষক বা কৃষিজীবীর অধিকার থাকবে। কৃষিজমি কেনা বা উত্তরাধিকার সূত্রে কিংবা সরকারের কাছ থেকে প্রাপ্ত বন্দোবস্ত সূত্রে ভোগদখলে রাখার অধিকার অক্ষুণ্ন থাকবে।
কৃষিজমি যে কেউ কেনাবেচা করতে পারবেন না। শুধুমাত্র কৃষি কাজেই ব্যবহার করতে হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে ওই জমির মালিকানা সরকারের ওপর ন্যস্ত হবে।
প্রস্তাবিত খসড়ার এ ধারার ভিন্ন উপধারায় বলা হয়েছে, দেশের সব খাস কৃষিজমি কেবল ভূমিহীনরা বন্দোবস্ত এবং ভোগ দখলের অধিকারী হবেন। তবে খাস কৃষিজমি কৃষি কাজ ব্যতীত অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না। আর ভূমিহীন ব্যতীত কৃষি খাসজমি অন্য কাউকে বন্দোবস্ত দেওয়া হলে তা বাতিল হবে।
আইনের খসড়ায় দুই বা তিন ফসলি জমি অধিগ্রহণেরও কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। বলা হয়েছে, দুই বা তিন ফসলি জমি সরকারি-বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য কোনো অবস্থাতেই অধিগ্রহণ করা যাবে না।
কৃষিজমি একফসলি বা একাধিক ফসলি যাই হোক না কেন, তা কৃষিজমি হিসেবেই ব্যবহার করতে হবে। কোনো কৃষিজমি নষ্ট করে আবাসন, শিল্পকারখানা, ইটের ভাটা বা অন্য কোনো অকৃষি স্থাপনা কোনোভাবেই নির্মাণ করা যাবে না। তবে অনুর্বর, অকৃষি জমিতে আবাসন, বাড়িঘর, শিল্পকারখানা প্রভৃতি স্থাপন করা যাবে।
যে কোনো শিল্পকারখানা, সরকারি-বেসরকারি অফিস ভবন, বাসস্থান এবং অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে ভূমির ঊর্ধ্বমুখী ব্যবহারকে গুরুত্ব দিতে হবে।
কৃষি জমিতে চিংড়ি চাষ নয়
খসড়ায় বলা হয়, কোনো কৃষিজমি চিংড়ি মহাল হিসেবে ঘোষণা করা যাবে না। সরকার ঘোষিত জাতীয় চিংড়ি নীতিমালা, ২০১৪ মোতাবেক চিংড়ি মহালের এলাকা ব্যতীত অন্যান্য এলাকায় চিংড়ি চাষ করা যাবে না।
ভূমির বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন নয়
সরকার কর্তৃক বনভূমি হিসেবে ঘোষিত ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ইতোমধ্যেই যে সব জমি বনভূমি, টিলা-পাহাড় শ্রেণির জমি, জলাভূমি, চা-বাগান, ফলের বাগান, রাবার বাগান ও বিশেষ ধরনের বাগান হিসেবে পরিচিত যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া সেগুলোতে ভূপ্রকৃতিগত কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না।  ভরাট করে বা বিনষ্ট করে আবাসিক এলাকা তৈরি বা শিল্পায়ন ইত্যাদি করা যাবে না। বাস্তবে এর ব্যত্যয় ঘটলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে সরকার।
ভূমির অপচয় বন্ধ করা হবে
ভূমির অপচয় রোধকল্পে জমির অধিগ্রহণ ন্যূনতম পর্যায়ে রাখতে হবে। অধিগ্রহণ করা জমির অপব্যবহার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। অধিগ্রহণ করা জমি বেদখলে বা জবরদখলে থাকলে তা অনুসন্ধান করে জবর দখলমুক্ত করতে হবে।
ভূমি জোনিং
সরকার ভূমির বিদ্যমান বহুমাত্রিক ব্যবহার, প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য ও এর  অন্তর্নিহিত ক্ষমতা এবং গুণাগুণ অনুযায়ী কৃষি, মৎস্য, পশুসম্পদ, বন, চিংড়ি চাষ, শিল্পাঞ্চল, পর্যটন, প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা এবং প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য এলাকা ইত্যাদি ক্ষেত্রে ভূমির পরিকল্পিত ও সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। এ লক্ষে সারাদেশে পর্যায়ক্রমে ভূমি জোনিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে।
যে সব ভূমি জোনিং হবে
কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, আবাসন, নদী, সেচ ও নিষ্কাশন নালা, পুকুর, জলমহাল ও মাৎস্য এলাকা, বনাঞ্চল, সড়ক ও জনপথ এবং রেলপথ, হাটবাজার, বাণিজ্যিক ও শিল্পএলাকা, চা, রাবার ও হর্টিকালচার এলাকা, উপকূলীয় অঞ্চল, পর্যটন এলাকা, চরাঞ্চল ও পরিবেশগতভাবে বিপন্ন এলাকা এবং অন্যান্য এলাকাকে ভূমি জোনিং হিসেবে বিবেচিত হবে।
আইন না মানলে জেলসহ ৫০ লাখ টাকা জরিমানা
কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইন অমান্য বা লঙ্ঘন করলে অনূর্ধ্ব  ৫ বছর সশ্রম কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। বিচার হবে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে। তবে জরুরি প্রয়োজনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আইন মোতাবেক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে পারবেন।