আমাদের কথা ডেস্ক :
‘আকাশের ওই মিটিমিটি তারার সাথে কইবো কথা, নাইবা তুমি এলে। তোমার স্মৃতির পরশ ভরা অশ্র“ দিয়ে গাঁথবো মালা, নাইবা তুমি এলে।’ এই তো সেই দিন, নিজ মন্ত্রণালয়ের কার্যালয়ে বসে জনপ্রিয় এই গানটি গেয়েছিলেন সদ্যপ্রয়াত সমাজকল্যাণমন্ত্রী মহসিন আলী। অসুস্থতার কারণে সেদিন গানটি শেষ পর্যন্ত গাইতে পারেননি। কে জানত এটাই হবে তার গাওয়া শেষ গান- আর কেউ তার কাছ থেকে এক সময়ের বাংলা চলচিত্রের জনপ্রিয় বাংলা গানগুলো শুনতে পাবেন না। শিল্পবোধের এই মানুষটি আর কোনোদিন আমাদের সঙ্গে কথা বলবেন না। আমাদের আর গান শোনাবেন না। পথ চলতে আর কাউকে ডেকে শাসন করবেন না। আদর করবেন না। এখন তিনি ওই আকাশের মিটিমিটি তারার সঙ্গে কথা বলবেন। স্মৃতির পরশ ভরা অশ্র“ দিয়ে মালা গাঁথবেন- কেউ না আসলেওৃ।
মহসিন আলী মৌলভীবাজারে ছিলেন অসম্ভব জনপ্রিয় একজন মানুষ। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্ব দেখিয়ে যেমনি স্বাধীনতার বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন, তেমিন জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন জনপ্রতিনিধি হিসেবে। জনগণের ভোটে পৌর চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের কাছে পরিচিতি পান সাদা মনের মানুষ হিসেবে। তাই তো নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাবেক অর্থমন্ত্রী প্রয়াত এম সাইফুর রহমানকে প্রায় ৩২ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে মৌলভীবাজার-৩ (সদর ও রাজনগর) আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই ১৯৭১ সালের পর থেকে মহসিন আলীর বাড়ির দরজা ছিল সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। তিনবারের পৌর চেয়ারম্যান, দুবারের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিত্ব গ্রহণের পর দীর্ঘ রাত জেগে তিনি মানুষের জন্য, দেশের জন্য কাজ করে গেছেন। শেষ রাতে কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে আবার সকালে উঠে পড়তেন। মন্ত্রী থাকা অবস্থায় মঞ্চে দাঁড়িয়ে গান গাইতেন মহসিন আলী। সিগারেটও সেবন করতেন। আবার কখনও সাংবাদিকদের হুমকিও দিতেন। এসব কারণে সমালোচিত ছিলেন তিনি। তবে এজন্য কারোর উপর রাগ করতেন না। মনটা সাদা ছিল, তাই সরাসরি কথা বলতে পছন্দ করতেন। মঞ্চে প্রায়ই চোখ বুজে থাকার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন, ‘সারা রাত মানুষের জন্য ঘুমোতে পারিনি। তাই একটু জিরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি দেশ ও মানুষের জন্য চিন্তা করি।’ কখন গুজব ছড়িয়ে পড়ত মহসিন আলীর মন্ত্রিত্ব চলে যাচ্ছে। এসব বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন, ‘আমি গণমানুষের জন্য কাজ করি। মন্ত্রিত্বের জন্য নয়। সারা জীবন আওয়ামী লীগ, মুক্তিযুদ্ধ ও সাধারণ মানুষকে নিয়ে কাজ করেছি।’ তিনি বলতেন, মন্ত্রিত্ব না থাকলেও মানুষের অন্তরের মন্ত্রী হয়ে থাকব। তবে প্রধানমন্ত্রী আমার সততা ও নিষ্ঠার কথা জানেন। আর আমি ওসব নিয়ে ভাবি না, ভাবি জনগণকে নিয়ে।’ অসম্ভব খোলা মনের মানুষ তিনি ছিলেন। জনপ্রতিনিধির দায়বদ্ধতা থেকে তার ওপর বর্তানো অনেক কাজ অসমাপ্ত রেখেই চলে গেলেন তিনি অনেকটা নীরবে। তার অসমাপ্ত এই কাজগুলো এগিয়ে নিতে তার পরিবারের কোনো সদস্যকে নির্বাচনী এলাকার দায়িত্ব দিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি দাবি জানিয়েছেন মৌলভীবাজারের সর্বস্তরের মানুষ।
কর্মজীবন :
২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি তিনি সমাজকল্যাণমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে ও একইসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদ সদস্য, সেক্টরস কমান্ডার ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্য, মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল সদস্য, জেলা ও বিভাগীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ছিলেন। ১৯৮৮ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচনে জয়ের পর তিনি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য, ১৯৯২ সালে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয় থেকে শ্রেষ্ঠ চেয়ারম্যানের পুরস্কার, ১৯৭৬-১৯৮৪ সাল পর্যন্ত মহকুমা/জেলা রেডক্রিসেন্টের সাধারণ সম্পাদক, চেম্বার সভাপতি, জেলা শিল্পকলার সাধারণ সম্পাদক, মুক্তিয্দ্ধু ও সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ভারতের আচার্য দীনেশ চন্দ্র সেন স্মৃতি স্বর্ণপদক ২০১৪ ও নেহেরু সাম্য সম্মাননা ২০১৪ পুরস্কার পান।
তিনি ভারতের কলকাতা থেকে এমবিএ ডিগ্রিপ্রাপ্ত হন। তিনি বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি ও উর্দু ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারতেন। ১৯৪৮ সালে ১২ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার শহরের দর্জিরমহলে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মৃত সৈয়দ আশরাফ আলী ও মাতার নাম আছকিরুন্নেছা খানম। তিনি তিন কন্যা সন্তানের জনক ছিলেন।
অসাম্প্রদায়িক চেতনার এই মানুষটি গরীব, দুঃখী ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য তার মুক্তহস্তে দান ছিল জেলার মানুষের মুখে মুখে। ব্যক্তিগত সহায়সম্পত্তি কিছু করেননি। কিন্তু মানুষের সম্মান, ভক্তি ও ভালোবাসা কুড়িয়েছিলেন তিনি। আজ তিনিও নেই। তার মন্ত্রিত্বও নেই। কিন্তু জনগণের অন্তরের মন্ত্রী হয়ে রইলেন। রিপোর্ট