॥ অজয় দাশগুপ্ত ॥

ভাবিয়া করিও কাজ করিয়া ভাবিওনা। এই আপ্তবাক্যটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও আমরা মানিনা। বিশেষত রাজনীতিবিদরা মানেন না। যে কাজ করে আমি টিকতে পারবো না বা টেকাতে পারবো না সেটা আমি করব কোন আনন্দে? বিশেষত রাজনীতিবিদ বা মন্ত্রীদের তো এই দূরদর্শিতা আছে বলেই তারা মন্ত্রী বা নেতা। এমন হতেই পারে সব সিদ্বান্ত বা সব কথা জনগণের পছন্দ হবেনা। দুনিয়ার কোথাও কেউ তাদের ইচ্ছের সবকিছু মানাতে পারেননি। গান্ধীর মত নেতা বা বঙ্গবন্ধুর মত জনপ্রিয় মানুষ এমনকি মাও জে দং এর মত একনায়কও সবকিছু জায়েজ করাতে পারেননি। কিন্তু এমন নয় যে তাদের কথা বা কাজে জনগণ বা তারুণ্যকে রাস্তায় নেমে হৈহৈ করে দাবি আদায় করে নেতাকে নাজুক জায়গায় ফিরতে বাধ্য করেছিল। আজকে বাংলাদেশে যা চলছে বা যেভাবে চলছে তার সাথে মাথা নষ্ট বলে পরিচিত ব্যাপারটার কেমন জানি একটা যোগ আছে। এবং সেটাই দুর্ভাবনার বিষয় ।
বহুকাল আগে আমি সিমিন হোসেন রিমির মুখে একটা গল্প শুনেছিলাম। সাংসদ রিমি তখনো সাংসদ হননি। কিবরিয়া সাহেবের অকাল মৃত্যুর পর সবাই যখন একত্রিত তখন নাকি তারা প্রশ্ন করেছিলেন আওয়ামী লীগের ভাবী অর্থমন্ত্রী কোথায়? কোথায় সেই জ্ঞানী বা দূরদর্শী মানুষেরা? বয়সী নেতারা বলেছিলেন আছে আছে। সেই আছের একমাত্র কলাগাছ মুহিত সাহেব। তিনি যে বিজ্ঞ ও নানা বিষয়ে পারদর্শী সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু দেয়ার বা নেয়ার ক্ষমতা প্রকৃতিগতভাবেই সীমাবদ্ধ। মানুষ এক বয়সের পর উপদেষ্টা হয়ে দিন কাটায়। তখন ফুলটাইম নয় তার কাজ পার্ট টাইমের। ওভাবেই তারা দিতে পারেন তাদের সেরা ফলাফল। আমরা বলছিনা আবুল মাল আবদুল মুহিতের তা করা উচিত। কিন্তু এই যে আন্দোলনের ঢেউ তরুণ-তরুণীদের মনে ও চিন্তায়। সরকার, জয়বাংলা, আওয়ামী লীগ বিষয়ে ভীতি ঢুকলো এর প্রতিকার হবে কিভাবে? এর ফসল কি ভোটের সময় বিরোধীদলের ঘরে যাবেনা? আমিতো চোখ বুঝলেই দেখতে পাচ্ছি জয় বাংলা ভ্যাট সামলা আর দেহ পাবি মন পাবি, ভ্যাট পাবিনা হবে বিশাল বিশাল পোস্টার। মুহিত সাহেব যদি কথা বার্তায় সংযত হতেন ভ্যাট প্রয়োগের কথা ও প্রত্যাহার দুটোই খুব স্বাভাবিকভাবে হতে পারতো। হয়নি।
পৃথিবীর যেকোন উন্নত দেশে অর্থমন্ত্রী বা ট্রেজারার হচ্ছেন দ্বিতীয় সবোর্চ্চ পদ। তারা প্রধানমন্ত্রীত্বের জন্য লাইনে থাকেন । উপমহাদেশ বা আমাদের মত দেশে তা দিবাস্বপ্ন। কিন্তু তাতে তো আর পদের গুরুত্ব কমেনা। বিষয়টি আওয়ামী লীগ ও সরকারের জন্য পরাজয়ের। তাদের জন্য ভাবনারও বটে। নাগরিক সমাজ বিশেষত মধ্যবিত্তের সন্তানরা রাজধানী কেন্দ্রিক আন্দোলনের নামে দেশ কাঁপিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এতে সরকার ও পিছু হটতে বাধ্য হয়। বিএনপি-জামাত-বাম-ডান যা পারেনি এরা তাই পেরেছে। কোন যাদুবলে বা কোন উত্তাল সমর্থনে নয় অর্থমন্ত্রীর ভুলের কারণে।
রাজনীতি যদি মেধা, আদর্শ, দূরদর্শিতা বাদ দিয়ে বাহুবলে চলতে চায় তার তো এই দশা হবেই। কে আসলে ভ্যাট দেবে আর কে দেবেনা সেটাই পরিষ্কার করতে পারেনি তারা। চতুর ব্যবসায়ী লেখাপড়াকে বাণিজ্যে নামিয়ে আনা মানুষগুলো আন্দোলনের পেছনে কলকাঠি নেড়ে বুঝিয়ে দিয়েছে তাদের সাইজ করা সহজ না। এদেশে সরস্বতীর চাইতে লক্ষীর পাওয়ার বেশি এটা অর্থমন্ত্রী নিজেই জানতেননা ভাবতেই লজ্জা লাগে। এখন কি তবে ‘করিয়া ভাবিও কাজ, ভাবিয়া করিও না’র যুগ এসেছে?
লেখক : কবি ও কলামিস্ট