পারলেন না রাজনাথ সিং

16 September, 2015 : 7:55 am ৫৪

আমাদের কথা ডেস্ক :
ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার রীতিমত জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং ঘোষণা দিয়েছিলেন যে কোন মূল্যে বাংলাদেশে গরু আসতে দেবেন না। সীমান্তে সৈন্য-সামন্ত অর্থাৎ বিএসএফ রক্ষীদের কড়া নজরদারি ও গুলি করে এবং পিটিয়ে বাংলাদেশি গরু ব্যবসায়ীদের হত্যার ঘটনা ঘটিয়েও গরু আসা বন্ধ করতে পারেননি।
ভারতে এখনো গরু জবাই বন্ধের কোশেস চলছে। কয়েকটি প্রদেশ ছাড়া সমগ্র ভারতে গরুর গোশত বন্ধ করে দেয়ার কথা বলেছেন দেশটির সংস্কৃতি মন্ত্রী মহেশ শর্মা। এসব দেখে শুনে খুব সহজেই মানুষের মনে প্রশ্ন ওঠে ভারত যে গরুর গোশত অন্যদেশে রফতানি করে তাতো আর জীবন্ত করা সম্ভব নয়। নাকি বাংলাদেশে গরুর গোশত প্রক্রিয়াজাত করে রফতানি শুরু হওয়ায় এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা। গরু বাংলাদেশে এলে চামড়া হারায় ভারত। ভারতের চামড়া শিল্প এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বৈকি। তবে ধর্মের মোড়কে গরু জবাই নিষিদ্ধ কিংবা বাংলাদেশে গরু আসতে না দেওয়া যে আদতে সম্ভব হবে না তা ইতিমধ্যে পরিস্কার হয়ে গেছে। বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ইতোমধ্যে অবাধে গরু আসা শুরু করেছে।
ভারত থেকে এ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত নাকি অসুস্থ গরু আসছে তা দেখার কেউ নেই। গরু মিয়ানমার ও ভুটান থেকে আসছে। আগেও ভারতের রাজস্থান থেকে উট এসেছে, মহিষ তো আসছেই। তবে ধর্মীয় কারণে গোমাতা হত্যার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞার আড়ালে বাণিজ্যিক দিকটিই প্রধান বিবেচ্য হয়ে আছে।
ভারতীয় গরু বাংলাদেশে না আসলে এদেশের ক্রেতাদের হয়ত একটু বেশি মূল্যে গরু কিনতে হত, সে সামর্থ তাদের আছে। কিন্তু ভারতীয় গরু আসলে বাংলাদেশের কৃষক যারা গরু লালন-পালন করে তারা অর্থনৈতিকভাবে মার খান। এভাবে গরু বাংলাদেশে আসতে না দেয়ার ঘোষণা দিয়ে, সীমান্তে কড়া নজরদারি করে ভারতীয় গরুর দাম আরো চড়িয়ে দেয়ার একটা হেতু তো আছেই, বরং এ ফাঁকে বাংলাদেশের অনেক কৃষক গরু লালন-পালনে মনোযোগী হয়ে ওঠেন যারা এখন ভারতের গরু আসায় লোকসানে পড়বেন।
আর ভারত বাংলাদেশে গরু আসতে না দিয়ে অন্তত ৩১ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাণিজ্য থেকে বিরত থাকবে এমন বুকের পাটা রাজনাথ সিং বা বিজেপি রাজনীতির নেই। বাণিজ্য তা বৈধ হোক বা অবৈধ হোক তার একটা গতিপথ আছে যা পরিবর্তন হয় মাত্র কিন্তু স্থির বা থেমে থাকে না। এসব জেনেই রাজনাথ সিং থেকে শুরু করে বিজেপি নেতারা গরু বাংলাদেশে আসতে না দেয়ার হুঙ্কার ছাড়ছেন। ওদিকে গরু ঠিকই আসছে।
বরং রাজশাহীর সুলতানগঞ্জ করিডোর দিয়ে শুধু ভারতীয় গরু আসছে না, বেশ কয়েকটি করিডোর দিয়ে গত বছরের তুলনায় বেশি গরু আসছে বলে স্থানীয় সাংবাদিকরা জানাচ্ছেন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে, সারা দেশে খামারি ও সাধারণ মানুষের কাছে কোরবানির যোগ্য ৪০ লাখ হৃষ্টপুষ্ট গরু ও মহিষ আছে। ঘাটতি আছে ১০ লাখ গরু। মিয়ানমার ও ভুটান এ ঘাটতি পূরণ করবে আর ভারত তা চেয়ে চেয়ে দেখবে এমন কখনো হয়নি, এবারও হচ্ছে না।
বরং ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আলোচনা হলে, রাজস্ব দিয়ে গরু আসার একটা বন্দোবস্ত হলে উভয় দেশের সরকার লাভবান হতে পারত। চোরাকারবারীরা এক তরফা গরুর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে পারত না। অভিযোগ রয়েছে চোরাচালানীরা পণ্যের মূল্য হিসেবে সোনার মত গরুকেও লেনদেন হিসেবে ব্যবহার করছে। বিজেপি সরকারের ধর্মীয় অহংবোধ তা হতে দেয়নি।
রাজশাহী সীমান্তে ভারত থেকে গবাদিপশু আমদানির মোট আটটি করিডোর রয়েছে। গত আগস্ট মাসে উত্তরাঞ্চলের সাতটি করিডোর দিয়ে ৩৬ হাজার ৩০৭টি গবাদিপশু এসেছে। এর মধ্যে গরু ২৭ হাজার। অথচ গত বছর এ সময়ে গবাদিপশু আসার সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ৩০৩।
এছাড়া সুলতানগঞ্জ করিডোর দিয়ে সেপ্টেম্বরের প্রথম ১২ দিনে ৩ হাজার ৪০০ গরু-মহিষ ঢুকেছে। গত বছরের চেয়ে এবার ভারত থেকে বেশি গরু আসছে পাটগ্রামে ইসলামপুর শুল্ক করিডোর দিয়ে গত আগস্ট থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪ হাজার ৬০৭টি গরু আসলেও গত বছর এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩৫৫।
কুড়িগ্রামের কাস্টম অফিস বলছে, এ বছরের জুলাই থেকে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গরু এসেছে প্রায় ৬০ হাজার। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ৬৭৫। এমনকি কক্সবাজারে মিয়ানমার সীমান্ত  দিয়ে আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত গরু এসেছে সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল সাড়ে চার হাজারের কম।
ভারতের বিজেপি দলের নেতা থেকে শুরু করে রাজনাথ সিং জানতেন ভারত থেকে গরু বাংলাদেশে আসা বিএসএফ দিয়ে বন্ধ করা যাবে না। গরু আসবেই বরং গরু আসতে দেয়া হবে না বলে ঈদের দিন কয়েক আগে আগের বছরের চেয়ে বেশি গরু ঢুকিয়ে দেয়ার এক বাণিজ্যিক কৌশল নেয়াই ছিল বিজেপি সরকারের মূল লক্ষ্য।
এর ফলে বাংলাদেশে খামারিরা কোমড় বেঁধে যে গরু লালন পালনে মনোযোগী হয়েছিলেন এখন তারা আর ততটা লাভের মুখ দেখতে পারবেন না। সরকার এ ব্যাপারে বরাবরের মত নিশ্চুপ কারণ চোরাচালানে যে পণ্য ভারত, মিয়ানমার বা ভুটান থেকে আসে এবং এর ফলে বাজারে যদি তা সস্তায় মেলে তাহলে এক ধরনের স্বস্তিবোধ করেন নীতিনির্ধারকরা। এর একটা রাজনৈতিক মূল্য আছে। গরুর দাম কম থাকলে এর কৃতিত্ব রাজনৈতিকভাবে নিতে চায় সরকার। কিন্তু প্রায়শ্চিত্ত করে কৃষকরা।
সরকার খামারিদের বরং গরু লালন-পালন করার জন্যে খাদ্য থেকে শুরু করে উপকরণ, চরাঞ্চলে ঘাস চাষের সুবিধার ব্যবস্থা করতে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় উৎসাহী নয়।
এজন্যে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশি খামারিদের ১২ গুণ বেশি অর্থ খরচ করে গরু লালন পালন করতে হয়। সে গরু যখন হাটে নিয়ে যায়, তখন কমদামি ভারতীয় গরুর সামনে টিকতে না পেরে লোকসান দিয়ে গরু বিক্রি করে চোখ মুছতে মুছতে কৃষক বা খামারি বাড়ি ফেরেন। এতে সরকারের কিছু যায় আসে না।
এবারের কোরবানির বাজার সামনে রেখে বগুড়া জেলার ১ হাজার ২৬১টি খামার ও কৃষকের বাড়িতে মোট ৭৬ হাজার ৮২২টি পশু হৃষ্টপুষ্ট করার পর ভারতীয় গরু আসতে দেখে কৃষক ও খামারিরা আল্লাহ আল্লাহ করছেন। মনে তাদের আশঙ্কা ধার দেনা করে বা ঋণ নিয়ে যে গরু নিজ সন্তানের মত লালন পালন করেছেন, এখন তা তাকে কাঁদায় কি না।
গত বছর একই জেলায় ১ লাখ ৩৫ হাজার গরু এবং ৮৯ হাজার ছাগল ও ভেড়া কোরবানি হয়েছিল। এ ছাড়া সিরাজগঞ্জ, পাবনা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কোরবানির হাটে গরু আসবে। কিন্তু সর্বত্রই ওই একই সমীকরণ, আগে কম দামে ভারতীয় গরু কিনে ভোক্তারা খুশী মনে বাড়ি ফিরবেন, তারপর যদি দয়া হয় তাহলে কৃষক ও খামারিরা তার পশুর ন্যায্য মূল্য, পেলেও পেতে পারেন।

[gs-fb-comments]