আসছে ঈদ, বাড়ছে ছিনতাই

17 September, 2015 : 8:40 am ৬১

আমাদের কথা ডেস্ক :

ঈদের ছুটি পেলেন সালাম সাহেব। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গ্রামের বাড়িতে স্বজনদের কাছে যাবেন ঈদ করতে। দীর্ঘ ৪-৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও যখন গাড়ি পাচ্ছিলেন না, ঠিক তখনই দেবদূতের মতো পুরো পরিবারটিকে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে নিল একদল লোক। নিজেদের ব্যবহৃত ভাড়ায় মাইক্রোবাস চালকের ছদ্মবেশে এরা সালাম সাহেব ও তাঁর পরিবারকে গাড়িতে উঠিয়ে নিতে চাইল অল্প ভাড়ায়। তিনিও রাজি। যেহেতু খুব দ্রুত তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে ফিরতে হবে স¦জনদের কাছে, তাই সাত-পাঁচ না ভেবে উঠে পড়লেন গাড়িতে। পরে নিরাপদ জায়গায় গিয়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে গোটা পরিবারটির সর্বস্ব কেড়ে নিল লোকগুলো। ঘটনাটি গত রমজানের ঈদের।এ ধরনের ছিনতাইয়ের ঘটনা রাজধানীতে নতুন নয়। প্রতিনিয়তই মহানগরীর কোথাও না কোথাও এ ধরনের ঘটনা ঘটেই চলছে। তবে ঈদ সামনে এলেই তা যেন কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কারণ, বেশ কয়েকটি মৌসুমি ছিনতাইকারী চক্রও এ সময় সক্রিয় হয়ে ওঠে। বছরের বিশেষ কোনো অনুষ্ঠান বা দুটি ঈদে এরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এ সময়টাতে তাদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারায় সাধারণ জনগণ।

কোরবানির ঈদ সামনে রেখে রাজধানীতে ছিনতাইকারীরা যেন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ছিনতাই প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপও এ ক্ষেত্রে কার্যকর হচ্ছে না। ছিনতাইকারীদের ধরতে গিয়ে পুলিশ সদস্যও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। আবার অন্যদিকে পুলিশের কিছু সদস্যও ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন।

ছিনতাই বৃদ্ধির বিষয়টি পুলিশও স্বীকার করেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) হিসাব অনুযায়ী, গত মে থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ছিনতাইয়ের অভিযোগে মামলা হয় ৮৪টি। পুলিশের হিসাবেই গত এক মাসে ছিনতাইয়ের ঘটনা অনেক বেড়েছে।

অবশ্য ভুক্তভোগী ও বেসরকারি হিসাবে গত এক মাসে ছিনতাই হয়েছে দেড় শতাধিক। রাজধানীর সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ সময় ছিনতাইকারীদের হাতে আহত অন্তত ৮০ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। ভোরের পাতায় আসা অভিযোগ অনুযায়ী ২ থেকে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১০ দিনে ঢাকার ২০টি স্থানে ৪৫টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে ডিএমপি সদর দফতরে আইনশৃৃঙ্খলা ও ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে রাখতে ডিএমপি কমিশনার তল্লাশি চৌকি এবং টহল কার্যক্রম জোরদার করা, পুলিশ ক্যাম্প ও ফাঁড়িগুলোকে সক্রিয় করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চৌকিও বসেছে। অবশ্য তল্লাশি চৌকি বেশিরভাগই করা হয় রাতে। এছাড়া বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা জানান, তাঁদের এলাকায় আইনশৃৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল কমে গেছে; ফলে ছিনতাই বাড়ছে।

পুলিশ ও র‌্যাব কর্মকর্তারা দাবি করেন, ছিনতাইকারী গ্রেফতার হলেও ক’দিনের মাথায় জামিনে বেরিয়ে এসে আবার ছিনতাই করছে। ফলে ছিনতাই কমাতে ও তাদের আবার গ্রেফতারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বেগ পেতে হচ্ছে। পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ‘রাজধানীর বিভিন্ন থানার সাদা পোশাকের (সিভিল টিম) কিছু সদস্যের বিরুদ্ধেও ছিনতাই এবং অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ বেড়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানায়, ছিনতাইকারীদের হাতে আহত ব্যক্তিরা চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গেলে ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। কিন্তু আহত করে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে কম। অস্ত্র ঠেকিয়ে বেশি ছিনতাই হয়। ছিনতাইয়ের শিকার বেশিরভাগ মানুষই হয়রানি ও ঝামেলার আশঙ্কায় মামলা করেন না। ফলে ছিনতাইয়ের মামলা হয় কম। আবার কেউ কেউ মামলা করতে গেলেও থানা তা নেয় জিডি হিসেবে। ফলে ছিনতাইয়ের প্রকৃত হিসাব পুলিশের কাছেও থাকে না।

সূত্রটি আরও জানায়, ছিনতাইকারী চক্রগুলো বিভিন্ন শপিংমল, মার্কেট, বাস টার্মিনাল, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই করে থাকে। এসব এলাকায় তারা নির্দিষ্ট লোককে টার্গেট করে সুবিধামত জায়গায় পৌঁছালে তাঁকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সর্বস্ব কেড়ে নেয়। এছাড়া এ সময়টাতে মফস্বল এলাকা থেকে মালামাল কিনতে আসা ব্যবসায়ীদের টার্গেট করেও টাকা-পয়সা কেড়ে নেয় এ চক্রের সদস্যরা।

এসব ঘটনায় ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাত বা আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে সাধারণ মানুষের মৃত্যুও হয়। রাস্তাঘাটে ছিনতাইয়ের পাশাপাশি সুযোগ বুঝে এ চক্রগুলো রাজধানীর বাসাবাড়িতেও হামলা চালায়। গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ঈদ এলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে মৌসুমি কয়েকটি ছিনতাইকারী চক্র। ঈদের সময়টাতে রাস্তাঘাট নিরিবিলি থাকায় সহজেই কাউকে টার্গেট করে তাঁর সর্বস্ব কেড়ে নেয় এসব দুর্বৃত্ত।

গত ৭ সেপ্টেম্বর ভোরে রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় এক চালককে গুলি করে প্রাইভেটকার ছিনতাই করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এ সময় চালকের সঙ্গে থাকা তাঁর বন্ধুকেও মারধর করা হয়। জানা যায়, এয়ারপোর্ট থেকে প্রাইভেটকার চালক রবিন ফয়সাল (২৭) ও তাঁর বন্ধু আহমেদ মামুন (২৮) তাঁদের প্রাইভেটকারটি মিরপুর ১৩ নম্বর হয়ে ১০ নম¦র পৌঁছালে একটি ট্রাক গতিরোধ করে। ট্রাক থেকে চার-পাঁচজন নেমে এসে তাঁদের মারধর করে ও গুলি করে প্রাইভেটকারটি নিয়ে যায়। পরে গুলিবিদ্ধ রবিনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যান মামুন।

গত ১৫ জুন ভোর সাড়ে ৫টার দিকে রাজধানীর বনানী ফ্লাইওভারে দুই ভাইকে কুপিয়ে একটি মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। আহত সহোদর শাহ আলম (৩৫) ও বাবর (৩০) রাজধানীর তুরাগের বাউনিয়া বাঁধের বাসিন্দা। তাঁরা জানান, নীলক্ষেতে তাঁরা বইয়ের ব্যবসা করেন। ওই রাতে ব্যবসার কাজে তাঁরা লালবাগে ছিলেন। কাজ শেষে ভোরে বাসায় ফেরার পথে বনানী ফ্লাইওভারের কাছে প্রাইভেটকার আরোহী কয়েক ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে মোটরসাইকেল হারান তাঁরা।

এর আগের বছরের ১১ জুন রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজধানীর কোতোয়ালি থানার শাঁখারীবাজারে একটি সোনার দোকানের মালিককে গুলি করে প্রায় ১০০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে পালিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, ‘ঈদ সামনে রেখে মৌসুমি ছিনতাইকারী চক্রগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাদের কবলে পড়ে সাধারণ মানুষের যেন সর্বস্ব না হারাতে হয়, সেজন্য বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে পুলিশ। ছিনতাইকারীদের ধরতে পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশও মাঠে রয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) বিভিন্ন ছদ্মবেশে ফাঁদ পেতে এসব চক্রকে ধরতে অভিযান চালাচ্ছে।’

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হক জানান, ‘কিছু মৌসুমি ছিনতাইকারী ঈদ এলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে। যেহেতু কয়েক দিন বাদেই কোরবানির ঈদ, তাই এই ঈদ সামনে রেখে বাড়তি নিরাপত্তাসহ এদের তৎপরতা রুখতে সক্রিয় রয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সদস্যরা। ছিনতাইর ঘটনা রোধে এবং জনসাধারণের চলাচল নির্বিঘ্ন করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই নেওয়া হয়েছে।’ ঢাকা মহানগরসহ সারাদেশে চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ রোধে বিশেষ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

[gs-fb-comments]