বিশ্বে মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশের ‘কমিউনিটি ক্লিনিক’ স্বাস্থ্যসেবা। বিশ্বে এটি পরিচিতি পেয়েছে, ‘বাংলাদেশ মডেল’ হিসেবে।  এই ‘কমিউনিটি ক্লিনিক’-এর মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এখন পরিচালিত হচ্ছে দেশব্যাপী।  আর এ উদ্যোগকে স্থায়ী রূপ দিয়ে গ্রামীণ জনপদের অসহায়-দরিদ্র মানুষের নিরবচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ‘স্বাস্থ্যসেবা ট্রাস্ট’ গঠনে আইন করছে সরকার। আইনের আওতায় ট্রাস্টের মাধ্যমে সারাদেশে স্থাপিত সব কমিউনিটি ক্লিনিক পরিচালিত হবে। এ লক্ষ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্প্রতি একটি খসড়াও প্রস্তুত করেছে। আর আইনের খসড়া সম্পর্কে মতামতের জন্য তা অনলাইনে প্রকাশও করা হয়েছে। খসড়াটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর জাতীয় সংসদে আইন হিসেবে পাস হলে ট্রাস্টের তহবিলের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের নিরবচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গ্রামের গরিব-দুঃখী মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্যোগ নেন কমিউনিটি ক্লিনিকের। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি এ উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
১৯৯৮ সালের ২৮ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা সেক্টর কর্মসূচি বাস্তবায়ন পরিকল্পনা অনুমোদন দেওয়া হয়। ১৯৯৯ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে ১০ হাজার ৭২৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয়। বর্তমানে ১২ হাজার ৮শয়ের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক চলছে। গ্রামীণ জনগণ বিশেষ করে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিতরা তাদের দোরগোড়ায় স্থাপিত কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে সেবা নিচ্ছেন। ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩৫ কোটির বেশি মানুষ সেবা গ্রহণ করেছেন বলে পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে। ইতোমধ্যে, বিশ্বে ‘কমিউনিটি ক্লিনিক’-এ বাংলাদেশ মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। দরিদ্র মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগের স্থায়ী রূপ দিতে এখন আইন করছে সরকার। ‘কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্যসেবা ট্রাস্ট আইন- ২০১৫’ খসড়ায় ‘কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্যসেবা ট্রাস্ট’ নামে একটি ট্রাস্ট গঠন করা হবে। আইনের আওতায় কমিউনিটি ক্লিনিক পরিচালনায় ট্রাস্টিবোর্ড গঠন করতে হবে। ট্রাস্টিবোর্ডের সভাপতি থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত কোনো ব্যক্তি। এছাড়া স্বাস্থ্যসচিব, অর্থবিভাগের প্রতিনিধি, স্বাস্থ্য মহাপরিচালক, পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের মহাপরিচালক, এসেনসিয়াল ড্রাগ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ফেডারেশন অব চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি, বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির সভাপতি, সরকার মনোনীত দুইজন বিশিষ্ট ব্যক্তি (একজন চিকিৎসক হতে হবে), সদস্য থাকবেন। আর ট্রাস্টিবোর্ডের সদস্যসচিব থাকবেন কমিউনিটি ক্লিনিকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
ক্লিনিক পরিচালনায় ব্যয় নির্বাহে ট্রাস্টের নামে তহবিল থাকবে। তহবিলের দুই অংশের মধ্যে একটি স্থায়ী তহবিল এবং অপরটি চলতি তহবিল হিসাবে পরিচালিত হবে। স্থায়ী তহবিল সরকারের এককালীন দেওয়া অর্থ, যা ব্যাংকে জমা থাকবে। এর লভ্যাংশের সমুদয় বা আংশিক অর্থ স্থায়ী তহবিল হিসাবে জমা থাকবে। আর সরকারের জাতীয় বাজেট থেকে বরাদ্দ দেওয়া অর্থ যাবে চলতি তহবিলে।
এছাড়া স্থানীয়ভাবে দেওয়া কোনো কর্তৃপক্ষের অনুদান, অর্থলগ্নীকারী ব্যাংক-বিমার স্বেচ্ছাধীন অনুদান, প্রবাসীদের অর্থিক সহায়তা, সরকার অনুমোদিত দেশি-বিদেশি উৎস থেকে প্রাপ্ত অর্থ, সমাজের বিত্তবান, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও অন্যান্য সংগঠন থেকে স্বেচ্ছাধীন পাওয়া অর্থ চলতি তহবিল হিসাবে পরিচালিত হবে। চলতি তহবিলের অর্থও ব্যাংক হিসাবে জমা রাখতে হবে এবং ট্রাস্টের যে কোনো কাজে তা ব্যয় করা যাবে। ট্রাস্টিবোর্ড প্রতিবছর ৩০ জুনের পর আগের অর্থবছরের সম্পদিত কার্যাবলীর একটি প্রতিবেদন সরকারের কাছে পেশ করবে।  ২০১৫ সালের ৩০ জুনে শেষ হওয়া Revitalization of Community Health Care Initiatives in Bangladesh (RCHCIB) প্রকল্পের আওতায় সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, নগদ ও ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ ট্রাস্টে ন্যস্ত হবে।  রাস্টের একটি উপদেষ্টা পরিষদ থাকবে। উপদেষ্টা পরিষদ সরকারি গেজেট বা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে গঠিত হবে। এছাড়া ট্রাস্টের কার্যক্রম পরিচালনায় একাধিক কমিটি গঠন করতে পারবে ট্রাস্টিবোর্ড।
ট্রাস্টিবোর্ডের দায়িত্ব ও কার্যাবলী
কমিউনিটি ক্লিনিকের দায়িত্ব ও কার্যাবলীর মধ্যে রয়েছে- কমিউনিটি ক্লিনিক এলাকায় গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের নিরবচ্ছিন্ন সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য প্রশাসনিক, আর্থিক ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনা সম্পাদন।
দায়িত্বের মধ্যে আরো রয়েছে- ট্রাস্ট্রের তহবিলের অর্থ সংগ্রহ ও ব্যবহার, ট্রাস্টের সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করা
এ ছাড়া সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসূচির সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্তকরণ, কমিউনিটি গ্রুপ ও কমিউনিটি সপোর্ট গ্রুপ সক্রিয় ও গতিশীল করা এবং সরকার বা উপদেষ্টা পরিষদ নির্দেশিত অন্যান্য কাজ সম্পাদন করাও ট্রাস্টিবোর্ডের দায়িত্ব।