আমাদের কথা ডেস্ক :
এত দিন ধরে নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হওয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবশেষে দলীয়ভাবে করার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। আর তা হলে সামনের পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে দলীয়ভাবে প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের একাধিক সূত্রে এ ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। আগামী ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে সারা দেশে পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তবে দলীয়ভাবে নির্বাচন করতে চাইলে তা নির্ধারিত সময় থেকে দুই মাস পেছাতে হবে বলে কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন। দলীয় সূত্রগুলো জানায়, ১১ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সামনের পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দলীয়ভাবে করার কথা জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন শেষ পর্যন্ত নির্দলীয়ভাবে হয় না, বরং এতে আইনের ব্যত্যয় ঘটে। এ জন্য আইনটাই পরিবর্তন করা দরকার। প্রধানমন্ত্রী আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়ে এতে দলের জনপ্রিয়তার প্রমাণ দেখাতে নেতাকর্মীদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিতে পরামর্শ দেন। তিনি জনসমর্থন বাড়াতে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডগুলোর ব্যাপক প্রচারণার উদ্যোগ নিতেও কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশনা দেন।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় প্রধানমন্ত্রীর এ মনোভাব বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো নির্দেশনা আমি পাইনি। তবে কাল (সোমবার) মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনানুষ্ঠানিকভাবে আমি এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ চাইব। তিনি যদি দলীয়ভাবে নির্বাচনের মত জানান, তাহলে একটি সংবাদ সম্মেলন করে বিষয়টি আমরা সবাইকে জানিয়ে দেব। এরপর আমরা এ নিয়ে কাজ শুরু করব। নির্দলীয়ভাবে নির্বাচনের জন্য আইন সংশোধন করতে হবে।’
মোশাররফ বলেন, ‘যদি সামনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে করতে হয় সে ক্ষেত্রে জানুয়ারির বদলে তা মার্চে করতে হবে। কারণ আইন সংশোধনে যথাযথ প্রক্রিয়া শেষ করতে এটুকু সময় লাগবে। যাঁরা এখন পৌরসভা ও ইউনিয়নের দায়িত্বে রয়েছেন, তাঁরাই এ দুই মাস দায়িত্ব পালন করে যাবেন। এতে তাঁদের তেমন কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।’
স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ বলেন, ‘আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দলীয় ব্যানারে করার কথা ভাবছে সরকার। এ ব্যাপারে কিছুটা আইনগত জটিলতা রয়েছে, আইন সংশোধন করে এ জটিলতা দূর করা হবে।’ তিনি শনিবার বিকেলে ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় এসব কথা বলেন।
সভায় দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে কাজী জাফর উল্যাহ বলেন, ‘ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা নৌকা প্রতীক নিয়েই নির্বাচন করবেন। এ জন্য দেশপ্রেমী জনগণকে তৃণমূল থেকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে শক্তিশালী করতে হবে।’
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নূহ-উল-আলম লেনিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সর্বশেষ কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে নেতৃবৃন্দ সামনের পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দলীয়ভাবে করার মনোভাব জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে করা দরকার। এখন এ বিষয়ে মন্ত্রিসভায় সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে আইন পাস করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবেই হবে ধরে নিয়ে আমরা সংগঠনকে সেভাবেই প্রস্তুত করছি।’
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে করার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। আমরা সে অনুযায়ী সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে আগামী পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দলীয়ভাবে হওয়াটা নির্ভর করবে কবে আইন সংশোধন হবে, এর ওপর।’
প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আইন পরিবর্তনের ইচ্ছার কথা জানালেও সামনের পৌরসভা নির্বাচনের আগে তা করা হচ্ছে না বলে মনে করেন মন্ত্রিসভার একজন সদস্য। তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কথা বলেছেন। এ ক্ষেত্রে আইন বদলাতে হবে। সামনের পৌরসভা নির্বাচনের আগে তা করা হবে বলে মনে হয় না। ডিসেম্বরে পৌরসভা নির্বাচন করতে চাইলে নভেম্বরে নির্বাচন কমিশনকে তফসিল ঘোষণা করতে হবে। আইন পরিবর্তন করতে চাইলে দ্রুততার সঙ্গে তা করতে হবে। সব কিছু চূড়ান্ত করে নভেম্বরে সংসদের আগামী অধিবেশনের শুরুতেই আইন পাস করা দরকার। সরকারের কাছে এ বিষয়টি এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকারের মধ্যে আছে বলে মনে হয় না।’
দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচন চান রাজনীতিবিদরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতার মতে, আইন অনুসারে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে এটি দলীয়ভাবেই হয়ে থাকে। ফলে দলীয়ভাবেই এ নির্বাচন হওয়া উচিত।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেহেতু স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় করার উদ্দেশ্যের সঙ্গে বাস্তবতার বিস্তর ফারাক দেখা দিয়েছে, সেহেতু এ বিধানটি নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবা দরকার। পাশের দেশ ভারত ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশেই দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়। আমাদের এখানেও তা করা যেতে পারে।’
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের বিষয়ে আমরা চোখ বন্ধ করে বসে থাকি, না দেখার ভান করি। এটি উচিত নয়। ওয়ার্কার্স পার্টি মনে করে, দলীয়ভাবেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়া উচিত। আমরা নির্বাচন কমিশনে এ বিষয়ে একটি প্রস্তাবও দিয়েছি।’
সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে হয়। লুকোচুরি বাদ দিয়ে আমাদের দেশেও নির্দলীয় নির্বাচনের বিধানটি তুলে দেওয়া উচিত।’