আমাদের কথা ডেস্ক :

‘এই চানাচুর লাগবে, চানাচুর; ঝাল-মসলা দিয়া চানাচুর। বাদাম আছে বাদাম, বাদাম দিমুনি বাদাম; বইসা বইসা বাদাম খান সময় কাটান। ঠাণ্ডা পানি আছে, জুস আছে; এই ফ্রিজের ঠাণ্ডা পানি লন। আমড়া দিমুনি আমড়া, অরজিনাল বরিশালের আমড়া। হাতপাখা আছে হাতপাখা, সুন্দর সুন্দর ডিজাইনের হাতপাখা।’ খাবার কিংবা অন্য কোনো পণ্য বিক্রির এমন হাঁকডাক শুধু ট্রেনেই শোনা যায়। ট্রেনে চড়েছেন কিন্তু হকারদের এমন হাঁকডাক শোনেননি এমন লোক মেলা ভার। নিয়মিত যাঁরা ট্রেনে চড়েন, তাঁদের জন্য ব্যাপারটা এখন একটু অন্যরকমই ঠেকবে। ট্রেনের সেই চিরচেনা দৃশ্য এখন আর নেই বললেই চলে। হকারদের সেই হাঁকডাক আর শোনা যায় না। ট্রেন এখন হকারবিহীন ‘নিরিবিলি’।
ঈদকে সামনে রেখে ট্রেনে হকার উঠতে দিচ্ছে না পুলিশ। এমনকি স্টেশনগুলোতেও কোনো হকারকে বসতে দেওয়া হচ্ছে না। স্টেশন ও ট্রেনে হকার থাকতে পারবে না-এমন নিয়ম আগে থেকে থাকলেও ঈদ সামনে রেখে এ ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। ট্রেনে অজ্ঞান পার্টির প্রবণতা রোধসহ বিভিন্ন অপরাধ কমানোর পাশাপাশি যাত্রীদের নির্বিঘ্নে চলাচল নিশ্চিত করতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রেলওয়ে পুলিশের ওসি (আইআরপি) মো. নাসিরুল ইসলাম বলেন, স্টেশনে কিংবা ট্রেনে হকার থাকার কোনো নিয়ম নেই। ঈদকে সামনে রেখে এর বাস্তবায়ন জোরদার করা হয়েছে। এটা অব্যাহত থাকবে। ট্রেনে অপরাধপ্রবণতা কমাতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে পণ্য ক্রয়ে যাত্রীদের কোনো সমস্যা হবে না। কেননা, বিভিন্ন স্টেশনে অনুমোদিত দোকান রয়েছে।
গত দুই দিন পূর্বাঞ্চল রেলপথের বিভিন্ন স্টেশন ও ট্রেনে ঘুরে হকারবিহীন পরিবেশ দেখা গেছে। তবে এ নিয়ে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। ট্রেনযাত্রীরা এতে স্বস্তি প্রকাশ করলেও বিকল্প কোনো ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে বেকার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে হকাররা। এমনকি বিক্ষোভও করেছে তারা। কয়েক দিন ধরে তাদের রেলওয়ে স্টেশনে বসতে কিংবা ট্রেনে উঠতে দেওয়া হচ্ছে না।
শনিবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া রেলওয়ে জংশন স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, স্টেশনটি হকারবিহীন। শতাধিক হকারের এ স্টেশনে দেখা মেলেনি একজনেরও। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ক্ষুব্ধ হকাররা স্টেশনে বসতে ও ট্রেনে উঠতে না দেওয়ার প্রতিবাদ জানিয়ে মিছিল নিয়ে পৌর মেয়রের কাছে গেছে। কিছু সময়ের মধ্যে তারা ফিরে এলেও কেউ পণ্য বিক্রি করেনি। মাঝেমধ্যে কেউ বিক্রি করতে চাইলেও পুলিশের বাধার মুখে পড়ছে। আবার হকারদের মধ্যেও এ নিয়ে বাগ্বিতণ্ডা হচ্ছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনে দাঁড়ানো চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রী কুমিল্লার শশীদলের মো. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ট্রেনে হকার না থাকায় পরিবেশটা খুব ভালো। কিন্তু এত হকার কোথায় যাবে সে বিষয়েও চিন্তা করতে হবে। দরিদ্র এ মানুষগুলোর তো পেট চালাতে হবে। প্রয়োজনে সীমিত আকারে হকার ওঠার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। কোনো হকার যদি অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকে, তাহলে তাকে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে পুলিশ।
আখাউড়া রেলওয়ে জংশন স্টেশনে কথা হয় চট্টগ্রাম থেকে সিলেটগামী আন্তনগর পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ট্রেনের অ্যাটেনডেন্ট (যাত্রী সহায়ক) মো. আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে। এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘আমি আন্তনগর মহানগর, মেঘনাসহ বিভিন্ন স্টেশনে ডিউটি করি। কোনো ট্রেনেই এখন আর হকার উঠতে পারছে না। যে কারণে ট্রেনে নিরিবিলি পরিবেশ বিরাজ করছে। যাত্রীরাও এ নিয়ে খুশি। কেননা ট্রেনে একসঙ্গে এত বেশি হকার ওঠে যে এতে যাত্রীদের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’
বিক্রিতে বাধা পেয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন হকার মো. দুলাল মিয়া। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার কোড্ডা গ্রামের এ চানাচুর বিক্রেতা বলেন, ‘১৯৭৪ সাল থেকে ট্রেনে হকারি করি। কয়দিন দইরা আমডারে ট্রেনে উঠতে দিতাছে না। শত শত হকার বিপদে আছে। আমি নিজেও বিপদে আছি। ঈদের সময় যাত্রী বেশি তাহে দেইক্কা বেছা-কিনাও বালা অয়। আর এই সময়ডাতঅই বেছা বন্ধ। তিন মাইয়ার লেহাপড়া, সংসার চালানের খরচ কই থেইক্কা জোগামু, বুঝতাম পারতাছি না।’
আখাউড়া রেলওয়ে থানার ওসি মো. আবদুস সাত্তার বলেন, নির্দেশনা অনুযায়ী স্টেশনে কোনো হকার বসতে দেওয়া হচ্ছে না। ট্রেনেও উঠতে দেওয়া হচ্ছে না হকারদের। আন্দোলন হলেও এ বিষয়ে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ট্রেনযাত্রীদের স্বার্থেই এটা করা হচ্ছে।