ইসলামী ব্যাংকে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা নিয়ে কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ। তিনি বলেন, বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিজে এই টাকা নিয়েছেন। আরেকটি নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এতেও ব্যাপক নিয়োগবাণিজ্য হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
ইসলামী ব্যাংকে এক দস্যুবৃত্তি চলছে বলেও মন্তব্য করেন ভাইস চেয়ারম্যান। তাকে নিয়ে গত বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকের চেয়ারম্যান আরাস্তু খানের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় গতকাল আমাদের সময়ের কাছে তিনি এসব অভিযোগ করেন।

সৈয়দ আহসানুল আলম বলেন, কোনো ধরনের পরীক্ষা ছাড়াই ৩৯ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে একজন বাদে ৩৮ জন যোগদান করেছেন। নিয়োগবাণিজ্যের মাধ্যমে এই নিয়োগ হয়েছে। এমডি নিজে প্রতি প্রার্থীর কাছ ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা নিয়েছেন। কোনো কোনো পরিচালকের কাছে এর লিস্টও আছে। এটি এখন ওপেন সিক্রেট। কাকে কত ভাগ দিয়েছেন এর প্রমাণ আমাদের কাছে নেই।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মানুসারে ব্যাংকে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষা আউটসোর্সের মাধ্যমে নেওয়া যায়। মৌখিক পরীক্ষা ব্যাংককে নিতে হবে। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকের ভাইভাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর মাধ্যমে করা হচ্ছে। এতে ব্যাপক নিয়োগবাণিজ্যের আশঙ্কা প্রকাশ করেন অধ্যাপক সৈয়দ আহসানুল আলম।

উল্লেখ্য, প্রবেশনারি অফিসার পদে নিয়োগের জন্য পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৫০৬ জনের গত ৮ মে থেকে ৯ মে পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ অডিটরিয়ামে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়।
আহসানুল আলম আরও বলেন, ইসলামী ব্যাংককে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক বানানোর জন্য সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এর প্রতিবাদে দাঁড়িয়েছে পর্ষদের সদস্য। ব্যাংকের সম্মান রক্ষার জন্য আমরা কাজ করি। কিন্তু আমাদের কোনো বিষয় উনারা আমলে নেন না। একটা মিটিং হয়ে গেলে তার আলোচ্যসূচি পরিবর্তন করে পরবর্তী মিটিংয়ের আগে আমাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। এক দস্যুবৃত্তি চলছে ইসলামী ব্যাংকে।

গত বৃহস্পতিবার ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ব্যাংকের চেয়ারম্যান আরাস্তু খান বলেন, ব্যাংকের গোপনীয় বিষয় প্রকাশ করে শপথ ভঙ্গ করেছেন। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছেন। আরাস্তু খান গত বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ভাইস চেয়ারম্যান তার নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে ইসলামী ব্যাংক ফের স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে যে অভিযোগ করেছেন, তার কোনো ভিত্তি নেই। তাকে পদত্যাগের জন্য হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে যে অভিযোগ তিনি করেছেন তা-ও ভিত্তিহীন। আহসানুল আলম পারভেজ চাইলে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে পারেন। তার থাকা বা পদত্যাগ নিয়ে ব্যাংকের ভেতর থেকে কোনো চাপ নেই। এ ছাড়া জাকাত ফান্ড, সিএসআর, শিক্ষাবৃত্তি ও অন্যান্য বিষয়ে সৈয়দ আহসানুল আলম যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা ভিত্তিহীন বলে সংবাদ সম্মেলনে বলেন চেয়ারম্যান। ওই সংবাদ সম্মেলনে পরিচালকদের মধ্যে জয়নাল আবেদীন, মিজানুর রহমান, ড. সিরাজুল করিম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুল হামিদ মিয়া উপস্থিত ছিলেন।

চেয়ারম্যানের বক্তব্যের প্রতিবাদে গতকাল গণমাধ্যমে ৯ জন পরিচালকের স্বাক্ষরিত লিখিত বক্তব্য পাঠিয়েছেন। তিনি বলেন, সংবাদ সম্মেলনে আরাস্তু খান ‘মিথ্যাচার’ করেছেন। ব্যাংকটির ২১ জন পরিচালকের মধ্যে ৯ জন বিবৃতিতে সই করেছেন। এ ছাড়াও তিনজন বিদেশে রয়েছেন, যারা এই বিবৃতিতে একমত পোষণ করেছেন। ওই লিখিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত ১৩ মে পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে সৈয়দ আহসানুল হকসহ অন্য পরিচালকদের পদত্যাগ করতে চাপ দেওয়ার বিষয়টি উত্থাপিত হয়। এতে পর্ষদের সদস্যরা কঠিন প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ ব্যক্ত করেন। তারা এই হীন বিপজ্জনক ষড়যন্ত্রের নেপথ্য শক্তিকে বের করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের নজরে আনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

এতে আরও বলা হয়, ব্যাংকের শীর্ষ পদ থেকে রাষ্ট্রবিরোধী চিহ্নিত অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সরানোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়। পরিচালকদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়। পরিচালকরা তাদের মধ্যকার একতা বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করেন এবং বলেন হুমকির মুখে যদি কোনো পরিচালককে পদত্যাগ করানো যায়, তবে একের পর এক মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের পরিচালকদের পর্ষদ থেকে বিদায় নিতে হবে। তারা বলেন, কোনো পরিচালককে হুমকির মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হলে বহু সম্মানিত পরিচালক একযোগে পদত্যাগ করবেন। কারণ তাদের পক্ষে হুমকির মুখে স্বাধীন ও সম্মানজনকভাবে ব্যাংক পরিচালনা করা সম্ভব হবে না।

বিবৃতিতে পরিচালকদের মধ্যে মেজর জেনারেল (অব) ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল মতিন, আব্দুল মাবুদ পিপিএম, অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল আলম, হেলাল আহমেদ চৌধুরী, বোরহান উদ্দিন আহমেদ ও সাইফুল ইসলাম এফসিএ। এদের মধ্যে বিভিন্ন কমিটির প্রধানও রয়েছেন।
উল্লেখ্য, গত ৫ জানুয়ারিতে সাবেক অতিরিক্ত সচিব আরাস্তু খানকে চেয়ারম্যান, অধ্যাপক সৈয়দ আহসানুল আলমকে ভাইস চেয়ারম্যান করার পাশাপাশি ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদেও পরিবর্তন আসে।