বিডিমর্নিং ডেস্ক-

ভারতের আসাম ও অরুণাচলের মধ্যে ঢোলা ও শাদিয়া এলাকার খরস্রোতা ধলা নদী, যা আর ৪ কিলোমিটার ভাটিতে এসে আরও দুইটি নদীর সঙ্গে মিশে হয়েছে ব্রহ্মপুত্র। সেই নদীর ওপর ২ হাজার ৫৬ কোটি ভারতীয় মুদ্রায় ৯ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু ও ২৮ কিলোমিটার অ্যাপ্রোচ রোড নির্মিত হয়েছে। বাংলাদেশের মুদ্রায় ধরলে এই টাকা ২ হাজার ২০০ কোটি টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়।

শুক্রবার ভুপেন হাজারিকা সেতুটির উদ্বোধন করা হয়েছে। আসামে ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী লোহিতের ওপর নির্মিত ৯ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দুই লেনের ঢোলা-সাদিয়া সেতু (আগের নাম) উদ্বোধন করেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

আসামে চালু হওয়া দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘতম এই সেতুর উদ্বোধনের পর এর খরচ ও নির্মাণ সময় নিয়ে বাংলাদেশের পদ্মা সেতুর তুলনা করে সামাজিক মাধ্যমে নানা কথা উঠেছে। অনেকেই বাংলাদেশের পদ্মাসেতুর খরচ ও সময়কে ভুপেন হাজারিকা সেতুর সঙ্গে তুলনা করতে চাইছেন। ভারতের এই সেতুর নির্মাণ ব্যয়ের কথা জানতে পেরে এদেশের পদ্মা সেতুর সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি নিয়ে নানাভাবে জবাব দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

বলা হচ্ছে, বিশ্বের শক্তিশালী সেতুর তালিকায় প্রথম অবস্থানে বাংলাদেশের পদ্মাসেতু। দৈর্ঘ্যের দিক থেকে এর চেয়ে বড় সেতু আরও রয়েছে। সম্প্রতি ভারতে উদ্বোধন করা হয়েছে একটি সেতু যা ৯.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ। পদ্মাসেতু হচ্ছে ৬.১৫ কিলোমিটার। তবে বিশ্বের আর কোনও সেতু তৈরীতে পদ্মার মতো নদীর এতো তলদেশে গিয়ে গাঁথতে হয়নি পাইল, বসাতে হয়নি এত বড় পিলার। আর পদ্মার মতো স্রোতস্বীনী এমন নদীর ওপর সেতু বসেছে মাত্র একটি।

এ বিষয়ে কথা বলেছেন পদ্মাসেতু নির্মাণে নিয়োজিতরা। তারা জানাচ্ছেন শক্তি ও নির্মাণশৈলীর দিক থেকে পদ্মাসেতু কতটা অনন্য। বলছেন এর সঙ্গে অন্য কোনও সেতুর তুলনা চলে না।

এদিকে তথ্যমতে, ভুপেন হাজারিকা সেতুর পাইল লোড মাত্র ৬০ টন। সেখানে পদ্মা সেতুর পাইল লোড ৮ হাজার ২০০ টন। ভারতের ওই সেতুর একেকটি পিলার ১২০ টনের। আর পদ্মা সেতুর একটি পিলার ৫০ হাজার টনের। সে হিসেবে ভারতের সেতুটির চেয়ে পদ্মাসেতু হতে চলেছে ১৩৩গুন বেশি শক্তিশালী।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পদ্মাসেতু তার অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্য বিশ্বের সব চেয়ে ব্যতিক্রমী সেতু হবে। কারণ খরস্রোতার দিক দিয়ে আমাজান নদীর পরই বিশ্বে বাংলাদেশের পদ্মানদীর অবস্থান, যার ওপর দিয়ে সেতু করা হচ্ছে। পদ্মা সেতুর মতো দ্বিতল (গাড়ি ও ট্রেন) সেতু পৃথিবীতে হাতেগোনা কয়েকটি আছে। আর দুই লেনের ভূপেন হাজারিকা সেতুর উদাহরণ পৃথিবীতে কয়েকশ পাওয়া যাবে।

নানা কারণে পদ্মাসেতু হতে যাচ্ছে অনন্য, বৈচিত্র্যময় এবং শ্রেষ্ঠত্বের। তার কিছু উল্লেখযোগ্য দিক রয়েছে। পানি প্রবাহ, সেতুর দৈর্ঘ্য, সেতু নির্মাণের বিভিন্ন উপকরণে এ স্থাপনা বিশ্বের অন্যান্য বড় সেতু/ব্রিজকে ছাড়িয়ে গেছে।

পদ্মানদীতে পাথরের স্তর মিলেছে ১০ কিলোমিটার গভীরে। বিশ্বের অন্যান্য নদী ও নদীর ওপর যেসব সেতু আছে সেগুলোর কোনোটিরই পাথরের স্তর এতো নিচে নয়। এ কারণে ৪০০ মিটার গভীরে পাইল নিয়ে যেতে হয়েছে। যা পৃথিবীর সেতু নির্মাণে বিরল ঘটনা। একেকটি পাইলের ওজন ৮ হাজার ২০০ টন। আর পাইল এতো গভীরে যাচ্ছে যে- ভেতরে এটি ৪০ তলা ভবনের সমান হবে।

পদ্মাসেতুর পাইল নদীর তলদেশে নিতে যে হ্যামার লাগবে সেটি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী হাইড্রোলিক হ্যামার। পৃথিবীর কোথাও আর কোনো সেতুতে এমন শক্তিশালী হ্যামার ব্যবহৃত হয়নি। এই হ্যামারটি জার্মানি থেকে বিশেষ অর্ডারে তৈরি করে আনা।

পদ্মাসেতুর যে পাথর ব্যবহৃত হচ্ছে তার একটির ওজন এক টন। এ পাথর ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্য থেকে (পাকুর পাথর) আমদানি করা হয়েছে। মাত্র ১৫ টুকরো পাথরে ভরে যায় একটি বড় ট্রাক।

আর বিশ্বের সবচেয়ে বড় কারখানা বলা যায় পদ্মাসেতুর পাইল ও স্প্যান ফেব্রিকেশন ইয়ার্ড। যেখানে প্রস্তুত হচ্ছে সেতুর পাইল আর স্প্যান। এই ইয়ার্ডের আয়তন ৩০০ একর। এর একদিকে প্লেট ঢুকছে অন্যদিকে পাইল বের হচ্ছে।

পদ্মানদীর শুধু মাওয়া পয়েন্টে মাত্র ২০ সেকেন্ডে যে পানি প্রবাহিত হয় তা রাজধানী ঢাকার সারাদিনের যত পানি লাগে তার সমান। হিসাব মতে, পদ্মা নদীতে প্রতি সেকেন্ডে ১ লাখ ৪০ হাজার ঘন মিটার পানি প্রবাহ রয়েছে। পানি প্রবাহের দিক বিবেচনায় বিশ্বে আমাজান নদীর পরেই এই প্রমত্তা পদ্মা। পদ্মাসেতুর বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রধান ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী প্রতিবেদককে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

পদ্মাসেতু বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশের সেতু বিভাগ। সেতু বিভাগ সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনে। সেই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মাত্র আড়াই বছরে সেখানে গিয়েছেন প্রায় পৌনে ৩০০ বার। সরবচ্ছ দায়িত্বপ্রাপ্তর পক্ষ থেকে এতটা নিখুঁত তদারকিও এক বিরল ঘটনা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এটাই সবচেয়ে বড় কোন প্রকল্প যা বাস্তবায়িত হচ্ছে। আর কোনো সেতু বা প্রকল্পের কাজে কোনো মন্ত্রীর এতো নজরদারি দেখা যায়নি। এখন পর্যন্ত যার ৪৩ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ২০১৮ ডিসেম্বরে চালু হওয়ার কথা পদ্মা সেতু।

– See more at: http://www.bdmorning.com/desh/193165#sthash.cn0S4Fq8.dpuf