শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে কোচিং বাণিজ্যে জড়িত শিক্ষকদের খুঁজছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কমিশন থেকে চিঠি দিয়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের কাছে কোচিংবাজ শিক্ষকদের তালিকা চাওয়া হয়েছে। প্রায় দেড় ডজন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুদকের এই চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. শাহান আরা আমাদের সময়কে জানান, দুর্নীতি দমন কমিশন গত ৯ এপ্রিল চিঠি দিয়ে তার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সকল শিক্ষকদের শাখা ও শিফটভিত্তিক নামের তালিকা (এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের চিহ্নিতকরণসহ) রেকর্ডপত্র তথ্যের বিবরণ দিতে বলা হয়েছে।

তিনি জানান, আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মোট ৫৭৫ জন শিক্ষককের নাম দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে কে কোচিং বাণিজ্যে জড়িত বা জড়িত নয় প্রত্যেকের খোঁজখবর নিয়ে চিহ্নিত করাটা আমার জন্য কঠিন। আমার প্রতিষ্ঠান থেকে কয়েকদিন পর পর শিক্ষকদের সতর্ক করে নোর্টিশ দেওয়া হয়। দুদকের কাছে সবার তথ্যই দেওয়া হয়েছে। কারা কোচিং বাণিজ্য করছে তাদের চিহ্নিত করবে দুদক।

সূত্র মতে, কোচিংবাজদের তালিকায় মতিঝিল স্কুল অ্যান্ড কলেজে শতাধিক শিক্ষকের নাম আলোচনায় এসেছে। এই প্রতিষ্ঠানটির কোচিংয়ের সঙ্গে জড়িত স্কুল শাখার ১০৯ জন এবং কলেজ শাখার ১৯ শিক্ষকের নাম এসেছে।

দুদকের চিঠির জবাবে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. শাহান আরা গত ১৬ এপ্রিল দুদক চেয়ারম্যান বরাবর চিঠিও দিয়েছেন।

উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ২০ জুন মাসে কোচিং বন্ধের নীতিমালার প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়, সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা নিজ প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের কোচিং বা প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। তবে তারা নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানপ্রধানের অনুমতিসাপেক্ষে অন্য স্কুল, কলেজ ও সমমানের প্রতিষ্ঠানে দিনে সর্বোচ্চ ১০ জন শিক্ষার্থীকে নিজ বাসায় পড়াতে পারবেন। কোনো কোচিং সেন্টারের নামে বাসা ভাড়া নিয়েও কোচিং বাণিজ্য পরিচালনা করা যাবে না।

তবে এই নীতিমালা বাস্তবায়ন নিয়ে শিক্ষা প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোচিং বন্ধে নীতিমালা ঘোষণা করলেও তা বাস্তবায়নে যেভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ছিল তা নিতে পারেনি শিক্ষা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, কোচিং বাণিজ্য বন্ধে নীতিমালা করা হয়েছে। অনেক শিক্ষকের এমপিও বন্ধ হয়ে গেছে। আগে যেসব শিক্ষক অধিক হারে কোচিং করাতেন তারা কোচিং করানো অনেকটা বন্ধ করেছেন। সবকিছুই একদিনে সম্ভব নয়। তবে কোচিং নিয়ে মন্ত্রণালয় একটা নাড়া দিয়ে এই পর্যায়ে এনেছে। কোচিং বন্ধে অভিভাবকদেরও ভূমিকা থাকতে হবে।

তবে শিক্ষাবিদরা বলছেন, কোচিং বন্ধে সরকারের যেমন কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তেমনি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মনোজগতে পরিবর্তন আনতে হবে। আর শিক্ষকদের হতে হবে দায়িত্বশীল। শিক্ষকরা যদি শ্রেণিকক্ষে নিজেদের উজাড় করে দিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ান তা হলে তাদের তো আর কোচিংয়ের জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয় না।

শিক্ষাবিদ ড. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, কোচিং বাণিজ্য রোধে শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকসহ সব মহলকেই সচেতন হবে হবে। আইন করে এটা রোধ করা যাবে না। কোচিংয়ের নেতিবাচক দিকগুলো জনসম্মুখে তুলে ধরতে হবে। তা হলে অনেকেই সচেতন হবে বলে মনে করি।

তিনি বলেন, শিক্ষা প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে কোচিং বাণিজ্য বন্ধে যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়া। কোচিং বাণিজ্য ঠেকাতে নীতিমালা প্রণয়নের দীর্ঘদিন পার হলেও শিক্ষা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা নীতিমালা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছেন। বরং নীতিমালার নামে কাগজে-কলমে কিছু সুপারিশের মাধ্যমে শিক্ষকদের কোচিং ব্যবসা আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ও বাইরে কোচিং বাণিজ্য শুধু বাড়েনি বরং বেড়ছে কোচিং ফিও।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে জেলা-উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা-২০১২’ বাস্তবায়নের তাগিদ দেয়। কিন্তু মাঠ প্রশাসনে বাস্তবায়ন চিত্র নেই।