গণজাগরণ মঞ্চের একাংশের আহ্বায়ক ও রংপুর মেডিকেল কলেজের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ডা. ইমরান এইচ সরকার দেশবাসীর কাছে অখ্যাতই ছিলেন। ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও মেডিকেলের বাইরে তার কোনো নামদাম ছিল না। বলা যায়, ইমরান এইচ সরকার নামে এদেশের মানুষ কাউকে চিনতো না।

২০১২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কথিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী আব্দুল কাদের মোল্লাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায় দেয়ার পরই হঠাৎ করে সামনে চলে আসে আজকের ইমরান সরকার। সেদিন আওয়ামী লীগ সরকার একটি দূরবীসন্ধি ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে ইমরানকে বেছে নিয়েছিল।

৫ ফেব্রুয়ারি বিকেলেই জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে ইমরান সরকারের নেতৃত্বে বামপন্থী গোষ্ঠীকে সরকার শাহবাগে বসিয়ে দেয়। এজন্য ইমরানকে মোটা অঙ্কের টাকা দেয়া হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই সরকারি টাকায় বেশ জমে উঠে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ। এ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান সরকারের নামও সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

আইন পরিবর্তন করে তারা কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবি জানায়। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টায় তারা শাহবাগে অবস্থান করে। বিভিন্ন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এসে তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। একই সঙ্গে আন্দোলনের আড়ালে শুরু হয় তাদের অসামাজিক কর্মকাণ্ড। বিভিন্ন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রীই তখন এখানে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তাদের সকল প্রকার থাকা-খাওয়ার খরচ বহন করেছে সরকার। এমনকি ইমরানের ব্যক্তিগত খরচ এবং তার নিরাপত্তার জন্যও প্রতিদিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে টাকা দেয়া হতো। র‌্যাবের ডিজি বেনজির আহমদ একটি টিভি টকশোতে ইমরানের উপস্থিতিতেই তা স্বীকার করেছেন।

এদিকে, শাহবাগের পুরো ঘটনাগুলোই সিসি ক্যামেরায় রেকর্ড করা হতো। একজন পুলিশ কনস্টেবলের দায়িত্বে ছিল এই সিসি ক্যামেরা। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চে ছেলে-মেয়েদের অসামাজিক কর্মকাণ্ডের সংবাদ যখন বিভিন্ন গণমাধ্যমে আসা শুরু হল, তখন হঠাৎ করেই একদিন বাথরুম থেকে সিসি ক্যামেরার দায়িত্বে থাকা সেই পুলিশ কনস্টেবলের লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে এনিয়ে সারাদেশে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিসি ক্যামেরায় ধারণ করা শাহবাগের অসামাজিক কর্মকাণ্ডের সকল ডকুমেন্ট ছিল ওই পুলিশ কর্মকর্তার কাছে। ভবিষ্যতে এগুলো ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সরকার পরিকল্পিতভাবে ওই পুলিশ কনস্টেবলকে হত্যা করে বাথরুমে তার লাশ রেখে দেয়। পরে প্রচার করা হয় যে, তিনি আত্মহত্যা করেছেন।

জানা গেছে, শাহবাগ আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে এসে ইমরান সরকারের কাছে এমন তথ্য এসেছে যে, জামায়াত নেতাদের ফাঁসি কার্যকরের পর সরকার তাকেও গুম করে ফেলতে পারে। এরপরই ইমরান সরকার একদিন কানাডায় পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করে। বিমানবন্দর গিয়েও ইমিগ্রেশনে আটক পড়ে যায়। সরকারের উপরের ইশারায় ইমরানকে যেতে দেয়া হয়নি। এ ঘটনার পরই মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে ইমরান সরকার। এরপর থেকেই সরকারের বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির প্রকাশ্যে সমালোচনা শুরু করেন। এরমধ্যে তিনি আরও একাধিকবার বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু, সরকার তাকে কোনো ভাবেই যেতে দিচ্ছে না।

জানা গেছে, শাহবাগে বিভিন্ন দাবি নিয়ে আন্দোলন করলেও নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠায় আছেন ইমরান। তিনি বুঝতে পেরেছেন যে, আওয়ামী লীগ নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য এতদিন তাকে ব্যবহার করেছে। এখন তাকে ছুড়ে ফেলে দিলেও আওয়ামী লীগের কিছু হবে না।

অপরদিকে, শাহবাগের আন্দোলন থেকেই পরিচয় হয়েছিল শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের মেয়ের সঙ্গে। নুরুল ইসলাম নাহিদও বর্তমানে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য। ইমরান সরকার তার নিরাপত্তার কথা ভেবেই শিক্ষামন্ত্রীর মেয়েকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। এজন্য বামপন্থী কয়েকজন রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীর মাধ্যমে লবিং করেছিলেন। এতে তিনি সফলও হয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতার মেয়ে বিয়ে করেও স্বস্তিতে নেই ইমরান সরকার। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে একেরপর এক হুমকিতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন ইমরান সরকার। আওয়ামী লীগের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা ছাত্রলীগকে দিয়ে এসব করাচ্ছে বলেও মনে করছেন ইমরান সরকার।

অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে বিভিন্ন কারণে মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের গুরুত্ব থাকলেও দলের নেতাকর্মীদের কাছে তার কোনো গুরুত্ব নেই। দলের মধ্যে নাহিদের কোনে প্রভাব নেই বলেও মনে করছেন ইমরান। তাই, মন্ত্রীর মেয়ে বিয়ে করার পরও সুরক্ষা পাচ্ছেন না ইমরান সরকার। ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলে ইমরান ভবিষ্যত নিয়েও খুব শঙ্কায় আছেন।