বাংলাদেশে এখন দুই বংশের রাজনীতি চলছে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান। তিনি বলেন, প্রধান দুটি দলই বংশভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। রাজনৈতিক বংশের প্রতিনিধি হিসেবে এসেছেন দল দুটির প্রধানরা। এ অবস্থা উত্তরণে অনেক সময় লাগবে। ড. আকবর আলি খান বলেন, এ দুই দল রাজনীতিকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে, তা হ্রাস করতে হলে অনেক কিছুর পরিবর্তন প্রয়োজন। তা অদূর ভবিষ্যতে হবে বলে মনে হয় না। গত শুক্রবার গুলশানের বাসভবনে বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।

আকবর আলি খান অর্থসচিব ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি একজন অর্থনীতিবিদ, ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবেও ব্যাপকভাবে পরিচিত। খোলামেলা আলোচনায় ড. আকবর আলি খান সব রাজনৈতিক দল নিয়েই কথা বলেছেন। এ সময় নানা বিষয়ে তার মতামত তুলে ধরেন।

ড. আকবর আলি খান বলেন, এ দেশে জাতীয় পার্টির জনপ্রিয়তা সীমিত। বাম দলগুলো একে অপরের কুৎসা রটনায় লিপ্ত। ক্ষমতায় গেলে তাদের বাম চরিত্র থাকে না। ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য ক্ষমা না চাইলে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ করা উচিত। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০ সম্পর্কে তিনি বলেন, এই ভিশনে বড় ধরনের কোনো সাফল্য আসবে না। খবরের কাগজে দেখলাম, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্রপতি হবেন বেগম খালেদা জিয়া ও প্রধানমন্ত্রী হবেন তারেক রহমান। এই যদি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী হয় তাহলে ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে পুনর্বিন্যাস করা হবে তা আমি বুঝতে পারছি না। বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমলারা দেশ সেবা করার জন্য আমলাতন্ত্রে যোগ দেয় না, নিজেরা উচ্চ পদে যাওয়ার জন্য যোগ দেয়। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দায়িত্ব পালনে নিজের দুঃখবোধের কথাও তুলে ধরেন ড. আকবর আলি খান। তিনি বলেন, সবচেয়ে দুঃখ আমাকে যেটা দেয়, তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি মরহুম ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে আমরা বহুবার বোঝানোর চেষ্টা করেছি, যদি একটা মোটামুটি সুষ্ঠু নির্বাচন না করতে পারি, তাহলে সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিন্তু যখন বুঝতে পারলাম, তার পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব হবে না, তখনই আমরা সবাই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলাম। নির্বাচন কমিশনের রোডম্যাপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে, সেটাতে অনেক ভালো কথা থাকবে—এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করতে হলে এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে হবে যাতে সব রাজনৈতিক দল স্বেচ্ছায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। যারা নির্বাচনে পরাজিত হবে তারাও যেন বলে, নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়েছে। এটা ছাড়া রোডম্যাপ করে আর না করে কোনো কিছু হবে না। শেষমেশ তরুণ প্রজন্ম নিয়ে নিজের আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, তরুণ সমাজকে আদর্শবাদী এবং নীতিবান হতে হবে। এজন্য যত ঝামেলাই হোক, তাদের নীতি ও আদর্শের সঙ্গে কোনো সমঝোতা করা যাবে না। নইলে দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। নিচে প্রশ্নোত্তর আকারে সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হল—

 

দেশের চলমান রাজনীতি কোন পথে?

দেশের চলমান পরিস্থিতিতে কোনো বিপত্তির কারণ দেখা যাচ্ছে না। তবে এর পেছনে বিভিন্ন উপাদান এখনো সক্রিয় রয়েছে। ফলে পরিস্থিতি যে কোনো সময় আয়ত্তের বাইরেও চলে যেতে পারে। তাই সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানের দিকেই সবার নজর দেওয়া উচিত। আর সমস্যা যেগুলো আছে, সেগুলোর সমাধান না হলে স্থিতাবস্থা থাকতেও পারে, না-ও থাকতে পারে। এ ধরনের ঝুঁকি না নেওয়ার চেয়ে বরং স্থিতাবস্থা যাতে বজায় রাখা যায়, সে জন্য রাজনৈতিক সমাধান বাঞ্ছনীয়।

 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখনো শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া আলোচনার শীর্ষে। অন্য কোনো দল বা নেতা সেই অর্থে আস্থা তৈরি করতে পারেননি কেন?

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সবচেয়ে আলোচিত। দুদলের প্রধান শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা অনেক। অন্য কোনো দলের প্রতি সেই অর্থে কোনো আস্থা সৃষ্টি হয়নি। জাতীয় পার্টির প্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদেরও জনপ্রিয়তা সীমিত। তবে প্রধান দুটি দলই বংশভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। রাজনৈতিক বংশের প্রতিনিধি হিসেবে এসেছেন দল দুটির প্রধানরা। দুই বংশের প্রাধান্য নিয়েই বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতি চলছে। এ অবস্থা উত্তরণে অনেক সময় লাগবে। বর্তমানে দুই দল রাজনীতিকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে, তা হ্রাস করতে হলে অনেক পরিবর্তনের প্রয়োজন। তবে তা অদূর ভবিষ্যতে হবে বলে মনে হয় না। নতুন নেতৃত্ব হয়তো সামনে আসতে পারে। সে জন্য নতুন রাজনৈতিক দল সৃষ্টি করতে হবে। এ মুহূর্তে ওইসব রাজনৈতিক দল খুব একটা সুবিধা করতে পারবে বলে মনে হয় না। যদি ১০-১৫ বছরের সময়সীমা নিয়ে ব্যক্তিরা রাজনীতিতে নামেন তাহলে হয়তো অন্তত ১০ বছর পর রাজনীতিতে পরিবর্তন আনতে পারবেন। তবে আগামী ১০ বছরের মধ্যে এই দুটি রাজনৈতিক দলের গ্রহণযোগ্যতা কমবে বলে মনে হয় না।

 

খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০ কেমন হলো।

সব রাজনৈতিক দলেরই একটি ভিশন থাকে। এটার মধ্যে আশ্চর্যজনক কিছু নেই। তবে এটা দিয়ে আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপির কি তফাৎ— সেটা খুব স্পষ্ট করা গেছে বলে মনে হয় না। সুতরাং এ মুহূর্তে যেটা করা উচিত তা হচ্ছে, সরকারি দলের সঙ্গে বিএনপির তফাতটা কোথায় তা জাতির সামনে তুলে ধরা। যে কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে, তার বহু কর্মসূচি আওয়ামী লীগও বাস্তবায়ন করছে। সেদিক থেকে কোনো তফাৎ নেই। সুতরাং আমার মনে হয় না, এই ভিশনে বড় ধরনের কোনো সাফল্য আসবে।

 

ভিশনে বলা হয়েছে, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনবে।

প্রতিশ্রুতি দিলে পরে সেটির বাস্তবায়নের প্রশ্ন ওঠে। রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে প্রধানমন্ত্রী শাসিত ব্যবস্থা বেগম খালেদা জিয়া ও তার দল বিএনপিই করেছে। সুতরাং সব ক্ষমতা কেন তারা প্রধানমন্ত্রীর হাতে পুঞ্জীভূত রেখেছিলেন তা জনগণের কাছে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন আছে। ভিশনে সেই ব্যাখ্যা নেই। এজন্য বলি, প্রতিশ্রুতি যে কেউ দিতে পারে। এখানে আরও একটি দুর্বলতা রয়েছে। আমি খবরের কাগজে দেখলাম, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্রপতি হবেন বেগম খালেদা জিয়া ও প্রধানমন্ত্রী হবেন তারেক রহমান। এই যদি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী হয় তাহলে ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে পুনর্বিন্যাস করা হবে তা আমি বুঝতে পারছি না।

 

বাম রাজনৈতিক দলগুলো সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি?

বাম রাজনৈতিক দলগুলো অতীতেও সফল ছিল না, এখনো নয়। প্রথমেই তাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তারা সব সময় খণ্ডিত। একে অপরের কুৎসা রটনায় লিপ্ত। এ ধরনের বাম নেতৃত্ব দিয়ে দেশের খুব একটা কাজ হবে বলে মনে হয় না। তারা যদি তাদের চরিত্র পরিবর্তন করতে পারে, তাহলে তারা সফল হতে পারে।

 

 বামদের একটি অংশ সরকারের অংশীদার। তাদের ভূমিকা নিয়ে যদি বলতেন?

আসলে বাম শব্দটা মেনিফেস্টুতে থাকাই যথেষ্ট নয়। অনেক বাম নেতা আছেন তারা রাজনীতি করেন না। সুবিধাবাদী নেতা হিসেবে সরকারের অংশীদার হয়েছেন। সব দেশেই এ ধরনের বাম রাজনীতিবিদ আছেন। তারা যখন ক্ষমতায় যান, তখন তাদের বাম চরিত্র আর থাকে না। তারা তখন সুবিধাবাদী চরিত্রে রূপান্তরিত হন।

 

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি অনেকেই নিষিদ্ধ করার কথা বলছেন।

সরকারের দেখা উচিত, প্রচলিত আইনে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা যায় কিনা। জামায়াতের বিরুদ্ধে অভিযোগ দুটি। একটি হলো মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ভূমিকায় ছিল। সে জন্য অনেকেরই সাজা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, ১৯৭১ সালে জামায়াতের যে ভূমিকা তার জন্য দলটি আজও দুঃখ প্রকাশ করেনি। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি মনে করি, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য দুঃখ প্রকাশ করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা থাকা তাদের উচিত নয়।

 

আগামী নির্বাচন নিয়ে নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। এটাকে কীভাবে দেখছেন?

নির্বাচন কমিশন রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে, সেটাতে অনেক ভালো কথা থাকবে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করতে হলে এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে হবে যাতে সব রাজনৈতিক দল স্বেচ্ছায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। যারা নির্বাচনে পরাজিত হবে তারাও যেন বলে, নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়েছে। এ ছাড়া রোডম্যাপ করে আর না করে কোনো কিছু হবে না। এ কাজে নির্বাচন কমিশনকে অত্যন্ত সাহসী হতে হবে। নীতিবান হতে হবে। সাহসী ও নীতিবান হলে নির্বাচনী অনেক সমস্যা কেটে যাবে। তাদের দেখাতে হবে, তারা নিরপেক্ষ। তাদের সেই ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে হবে। তবে এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের সেই ভাবমূর্তি গড়ে ওঠেনি। যদি ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে পারে যে তারা নিরপেক্ষ, কোনো দিকে ঝুঁকে পড়বে না—তাহলে এ সমস্যা অনেকাংশে সমাধান হবে। তবে কথা বলা সোজা। ভাবমূর্তির জন্য তাদের বাস্তবসম্মত কাজ করতে হবে। তবে এখন পর্যন্ত তারা এমন কোনো কাজ করেনি, যাতে তাদের কোনো ভাবমূর্তি উল্লেখ করার মতো। নির্বাচন কমিশন যদি প্রাথমিকভাবে কাজ করে ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত করতে পারে তাহলে তাদের রোডম্যাপ সবাই বিশ্বাস করবে।

 

 সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এলাকায় যারা জনবিচ্ছিন্ন, তারা দলের মনোনয়ন পাবেন না। প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যকে কীভাবে দেখছেন?

এটা খুবই স্বাভাবিক কথা। প্রতিটি দল এমন প্রার্থীকে মনোনয়ন দেবে যার জনপ্রিয়তা অনেক বেশি। এটা একটি সাধারণ সূত্র। যে কোনো দেশের রাজনৈতিক দল এটা করে থাকে। সুতরাং এ নিয়ে বিশেষ মন্তব্য করার কিছু নেই। তবে আমি মনে করি, সব দলেরই যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া উচিত। যাদের বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল রেকর্ড রয়েছে, তাদের মনোনয়ন দেওয়া উচিত নয়। কারণ, এটা আইনসম্মত হবে না।

 

সংসদে অপেক্ষাকৃত তরুণদের আসা উচিত কিনা?

তরুণ নেতৃত্ব সংসদে কী পরিমাণ আসবে না আসবে তা নির্ভর করছে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি তরুণদের উৎসাহিত করতে চান, তাহলে তাদের সংসদেও আনতে হবে। অন্যথায় তাদের প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে হবে। সেই বিদ্রোহে তারা সফল হবেন কিনা সেটা এখনই বলা যাবে না। সুতরাং তরুণ নেতৃত্বের ভূমিকা কী হবে না হবে তা নির্ধারণ করবে বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্ব।

 

নারীদের সংসদে আনার ক্ষেত্রে এখনো সংরক্ষিত কোটা রয়েছে।

সংরক্ষিত আসন সৃষ্টি করা হয়েছিল এ কারণে যে, রাজনৈতিক দলগুলো থেকে যথেষ্ট সংখ্যক নারী প্রার্থী দেওয়া হয় না। এই সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে বাংলাদেশে আরও বেশ কিছু দিন চালু রাখতে হবে। তবে এ ব্যাপারে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। আগে যে পরিমাণ সাধারণ আসনে নারীরা এমপি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আসতেন, আজ সেখানে অনেক বেশি পরিমাণ নির্বাচিত হয়ে আসছেন।

 

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে কি বিদেশিদের প্রভাব থাকে?

আমার মনে হয় না কোনো রাষ্ট্র সরাসরি নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে চায়। তবে শোনা যায়, অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে অর্থ দিয়ে থাকেন। সে সম্পর্কে আমার কাছে কোনো প্রমাণ নেই। আমি এ ধরনের কথা বাজারে অনেক শুনেছি।

 

বিশাল আকারের বাজেট আসছে। কীভাবে দেখছেন?

প্রতি বছরই বাজেটের আকার বৃদ্ধি পায়। বাজেট পুরোপুরি বাস্তবায়নও হয় না। বাজেটের আসল উদ্দেশ্য অর্জিত হচ্ছে না। যেমন এখনকার বাজেট থেকে নির্ণয় করা সম্ভব না—সরকার কত টাকা নতুন কর বসিয়েছে। বড় বড় প্রজেক্ট নেওয়া হয়, এগুলো বাস্তবায়নের কী হচ্ছে, সে সম্পর্কে আমরা জানতে পারি না। ফলে বাজেট দিয়ে দেশের অর্থনীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আনা যাবে বলে মনে হয় না। কারণ, বর্তমানে যেভাবে বাজেট দেওয়া হয়, তাতে অনেক ত্রুটি রয়েছে।

 

আপনি চাকরি জীবনে সর্বোচ্চ পদে ছিলেন, আপনি কি মনে করেন বর্তমানে যারা সরকারি চাকরি করছেন, তারা তাদের পেশাদারিত্ব রক্ষা করতে পারছেন?

এটা শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের দায়িত্বই নয়, পরিবেশেরও প্রয়োজন। বর্তমান পরিবেশে পেশাদার আমলারা ঠিকমতো কাজ করতে পারবে কিনা, তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আমি একটি বই লিখেছি, ‘গ্রেসামস ল‘ সিনড্রম অ্যান্ড বেয়ন্ড’। গ্রেসাম বিধি হলো দুষ্ট লোকেরা ভালো লোকদের তাড়িয়ে বেড়ায়। বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রেও দুষ্ট লোকেরা ভালো লোকদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। এ কারণে পেশাদার আমলারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছেন না। ফলে অনেকেই এ ব্যবস্থাকে মেনে নেবেন না। তারাও গ্রেসামস ল‘ সিনড্রমের অংশ হয়ে যান। এজন্য একদিকে সরকারি কর্মচারীদের পেশাদারিত্বে অনুগত থাকা উচিত, অন্যদিকে সে ধরনের পরিবেশও থাকতে হবে। এখন সেই পরিবেশ নেই। অবশ্য অনেকেই স্বেচ্ছায় দলীয় আনুগত্য স্বীকার করে। পদোন্নতি পেতে হলে এটাই একমাত্র উপায়। আমলারা তো দেশসেবা করার জন্য আমলাতন্ত্রে যোগ দেয় না, নিজেরা উচ্চপদে যাওয়ার জন্য যোগ দেয়। যদি পরিবেশ এমন থাকত যে, দলবাজি করলে লাভ হবে না, তাহলে আমলাতন্ত্র সঠিকভাবেই পরিচালিত হতো বলে আমি মনে করি।

 

আপনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। ওই সময়ের এমন কোনো ঘটনা আছে যা আপনাকে কষ্ট দেয় বা আনন্দ দেয়?

সবচেয়ে দুঃখ আমাকে যেটা দেয়, তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি মরহুম ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে আমরা বহুবার বোঝানোর চেষ্টা করেছি, যদি একটা মোটামুটি সুষ্ঠু নির্বাচন না করতে পারি, তাহলে সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। একপর্যায়ে তিনি আমাদের সঙ্গে একমতও হয়েছিলেন। মাত্র আটজন সচিবকে পরিবর্তন করার জন্য আগের দিন সন্ধ্যা বেলায় রাষ্ট্রপতিসহ পুরো উপদেষ্টা পরিষদ সবাই একমত হয়ে আমরা একটি কাগজে স্বাক্ষর করলাম। পরের দিন সকালে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ বললেন, এটা তার পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তখনই আমরা ধরে নিয়েছিলাম, তার পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব হবে না। তখনই আমরা সবাই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলাম।

 

আপনার চাকরি জীবনে বিশেষ কোনো ঘটনাও বলতে পারেন।

আমার চাকরি জীবনের বহু ঘটনা আছে তা স্বল্প পরিসরে বলা সম্ভব নয়। আমি এরই মধ্যে কোনো কোনো ঘটনার কথা বলেছি। এখন বলতে গেলে অনেক সময় লাগবে।

 

 

আপনার অবসর সময় কাটে কীভাবে?

এখন আমি মূলত পড়াশোনা করি ও বই লিখি। এই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ৪২৪ পৃষ্ঠার ‘অবাক বাংলাদেশ, বিচিত্র ছলনা জালে রাজনীতি’ নামে একটি বই বেরিয়েছে। বইটি লিখতে আমার প্রায় বছর দুই সময় লেগেছে। এর আগে আমি আরেকটি বই লিখেছি, ‘গ্রেসামস ল‘ সিনড্রম অ্যান্ড বেয়ন্ড’। সেখানেও বছর দুই লেগেছে।

আমি অতি সম্প্রতি আটটি বই প্রকাশ করেছি। এই বই লেখা ও বই পড়াতেই বেশির ভাগ সময় কেটে যায়। এ ছাড়া আমি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই। সেখানেও আমার কিছু সময় দিতে হয়। এই মিলে আমি যথেষ্ট ব্যস্ত সময় কাটাই। এ পর্যন্ত আমি ১৩টি বই প্রকাশ করেছি। চারটি বই প্রকাশ করেছে ইউপিএল, প্রথমা প্রকাশ করেছে তিনটি, পাঠক সমাজ প্রকাশ করেছে একটি।

এ ছাড়া এশিয়াটিক সোসাইটি একটি, সমুন্নয় বাংলাদেশ প্রকাশ করেছে একটি, পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন ট্রেনিং কমপ্লেক্স প্রকাশ করেছে দুটি, আমেরিকা ও ডাচ কোম্পানি প্রকাশ করেছে একটি। এখন বাজারে মূলত সাত-আটটি বই পাওয়া যায়।

 

তরুণ সমাজের উদ্দেশে যদি কিছু বলেন।

আমি মনে করি, তরুণ সমাজকে আদর্শবাদী এবং নীতিবান হতে হবে। যদি সুবিধার জন্য বিচ্যুতি ঘটে তাহলে শুধু তাদের নিজেদেরই ক্ষতি হবে না, দেশের ভবিষ্যৎও অন্ধকার। সুতরাং তাদের নীতি ও আদর্শের জায়গায় কোনো সমঝোতা না করতে আহ্বান জানাচ্ছি।

 

আপনার পরিবারের কথা যদি বলেন।

আমার একটি মাত্র সন্তান ছিল, গত ডিসেম্বর মাসে মারা গেছেন। আমিও অসুস্থ।

দেশের জনগণের জন্য সব সময় আমি মঙ্গল কামনা করি। যেখানেই যাই সেখানেই সাধারণ মানুষ আমার জন্য দোয়া করে। আমিও দেশবাসীর জন্য দোয়া করি, সবাই যেন ভালো থাকে।

 

আপনাকে ধন্যবাদ।

আপনাকে ও সর্বাধিক প্রচারিত বাংলাদেশ প্রতিদিনের অগণিত পাঠককেও ধন্যবাদ।

 

একনজরে

১৯৪৪ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে জন্মগ্রহণ করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান। তিনি সমাজ গবেষক, অর্থনীতিবিদ, ইতিহাসবিদ। ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৬১ সালে আইএসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ ও পিএইচডি করেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের কারণে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা তাকে তার অনুপস্থিতিতে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়। বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্বও পালন করেন তিনি। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে অধ্যাপনা করছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৩টি গ্রন্থের প্রণেতা ড. আকবর আলি খান। তার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ : ডিসকভারি অব বাংলাদেশ ও অ্যাসপেক্টস অব পিজ্যান্টবি  হেভিয়ারইন  বেঙ্গল  দেশে-বিদেশে বহুল প্রশংসিত। তার সর্বশেষ গ্রন্থ অবাক বাংলাদেশ : বিচিত্র ছলনা জালে রাজনীতি।