নিজস্ব প্রতিনিধি ঃ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আলমগীর কবিরকে গ্রেফতারের ঘটনায় আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে স্থানীয় রাজনীতি। গত বুধবার বিজয়নগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট তানভীর ভূঁইয়ার ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত আবদুল মতিন নামে এক ব্যক্তির করা প্রতারণার মামলায় আলমগীরকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরদিন বৃহস্পতিবার ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করে আলমগীরের মুক্তি দাবি করেন তার সমর্থকরা। মহাসড়ক অবরোধের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে আলমগীর সমর্থকদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে মামলা দায়ের করেছে।

তবে আলমগীরের গ্রেফতারের নেপথ্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী ছায়েদুল হকের সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর ও বিজয়নগর) আসনের সংসদ সদস্য র.আ.ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকেই দায়ী করছেন অনেকে। আলমগীরের ব্যক্তি উদ্যোগে ১২ জুন অনুষ্ঠিতব্য একটি ইফতার মাহফিলে মৎস্যমন্ত্রী ছায়েদুল হকের ঘনিষ্ঠজন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শফিকুল আলমকে দাওয়াত করায় তার বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে পরিবারের লোকজনের অভিযোগ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিগত জেলা পরিষদ নির্বাচনে সদস্য পদে বিজয়নগর উপজেলা থেকে অংশ নেন আলমগীর। তবে নির্বাচনে তিনি নিকটতম প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়ার কাছে এক ভোটে পরাজিত হন। ওই নির্বাচনে আলমগীর চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী শফিকুল আলমের পক্ষে কাজ করেন।

আলমগীরের ছোট বোন শামছুন্নাহার ও তার সমর্থকরা জানান, জেলা পরিষদের নির্বাচনে অংশ নেয়া, মৎস্যমন্ত্রী ছায়েদুল হক ও শফিকুল আলমের পক্ষে কাজ করার জন্য আলমগীরের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। সাংসদ মোকতাদির চৌধুরীর ইশারাতেই আলমগীরকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে দাবি তাদের।

ছায়েদুল-মোকতাদির দ্বন্দ্বের সূত্রপাত

বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ও গুনিয়াউক ইউনিয়নে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়েই ছায়েদুল হকের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ায় জেলা আওয়ামী লীগ ও মোকতাদির চৌধুরী। মন্ত্রীর পছন্দের প্রার্থীদের বাদ দিয়ে নিজেদের পছন্দ করা প্রার্থীর নাম সুপারিশ করে কেন্দ্রে পাঠায় জেলা আওয়ামী লীগ।

পরবর্তীতে মন্ত্রী দুই ইউপিতে মোকতাদির চৌধুরী ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকারের বিরুদ্ধে সোয়া এক কোটি টাকা মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ তোলেন। এসব নিয়েই মন্ত্রীর সঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগ ও মোকতাদির চৌধুরীর দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে রূপ নেয়। গেল বছর নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনায়ও মোকতাদির চৌধুরী ও তার সমর্থকদের দায়ী করেন মন্ত্রী ছায়েদুল হক।

নতুন করে ছায়েদুল-মোকতাদির দ্বন্দ্ব

গত ২৩ এপ্রিল বিজয়নগর উপজেলা প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন কেন্দ্র উদ্বোধনী অনুষ্ঠান নিয়ে নতুন করে দ্বন্দ্বে জড়ান ছায়েদুল হক ও মোকতাদির চৌধুরী। ওই অনুষ্ঠানে মোকতাদির চৌধুরীকে ‘আমন্ত্রণ’ না জানানোয় বিজয়নগর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান তানভীর ভূঁইয়া ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া সংবাদ সম্মেলন করে মন্ত্রীর অনুষ্ঠান বর্জনের ঘোষণা দেন।

অনুষ্ঠানের দিন বিজয়নগরে হরতাল ডাকে উপজেলা আওয়ামী লীগ। জেলা ও উপজেলা ছাত্রলীগ মন্ত্রীকে প্রতিহত করারও ঘোষণা দেয়। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কায় ২৩ এপ্রিল বিজয়নগর, আশুগঞ্জ, সরাইল ও সদর উপজেলায় ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন। তবে ছায়েদুল হক পুলিশি প্রহরায় জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শফিকুল আলমকে নিয়ে প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন কেন্দ্র উদ্বোধন করেন।

এবার আলমগীরের গ্রেফতারের ঘটনায় আবারও উঠে এলো ছায়েদুল হক ও মোকতাদির চৌধুরীর দ্বন্দ্বের বিষয়টি। তবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের অভ্যন্তরীন কোন্দল নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে বলে প্রবীণ রাজনীবিদদের ধারণা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রবীণ রাজনীতিক আমাদের কথা’কে বলেন, ছায়েদুল হক ও মোকাদির চৌধুরীর মধ্যে দীর্ঘদিনের যে রাজনৈতিক বিরোধ চলছে সেটির সমাধান না করা গেলে আগামী নির্বাচনে কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলবে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো তাদের দ্বন্দ্বের সুযোগ নিতে পারে। তাই এখন দলের অভ্যন্তরীন কোন্দল নিরসন করে দলকে সুসংগঠিত করতে হবে।