শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেছেন, ‘এখনকার ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছে। পাঠ্যবই পড়তে চায় না, এটা বড় একটা দুর্ঘটনা। আমার মনে হয়, ফেসবুক সংক্রান্ত ব্যাপারগুলোর এখানে ভূমিকা রাখছে। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া, চিন্তা ভাবনায় সিরিয়াস করতে হবে। কিভাবে করবো জানি না। বই পড়া একটা ভালো স্টার্ট পয়েন্ট। সব জায়গায় লাইব্রেরি থাকা, বই পড়া এ ব্যাপারগুলো চালু করতে হবে।

শুক্রবার (৯ জুন) রাজধানীর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে সংলাপ সূত্র আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি।ড. জাফর ইকবাল বলেন, ‘আমাদের প্রধান কাজ মানুষকে জানাতে হবে। যারা আমাদের বিরুদ্ধে কাজ করছে তারাও মানুষকে জানাচ্ছে। তবে সেটি সঠিক নয়। ব্রেন ওয়াশ করছে নানাভাবে, ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছে। আমারা যদি তাদেরকে থামাতে চাই তাহলে আমাদের সঠিক তথ্য দিয়ে জানাতে হবে।’

ড. জাফর ইকবাল বলেন, ‘হেফাজতে ইসলামটা কি? এটা কওমি মাদ্রাসার একটি সংগঠন। বাংলাদেশে গরিব মানুষ আছে, তাদের সন্তানদের লেখা পড়ার সুযোগ নেই। তারা লিল্লাহ মাদ্রাসায় দিয়ে দেন। কারণ সেখানে থাকা-খাওয়া ফ্রি এবং লেখাপড়াও হয়। আমাদের দেশে এটা কেন তৈরি হয়েছে। কারণ আমরা তাদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করতে পারিনি।’

জাফর ইকবাল বলেন, ‘আমরা তাদের (গরিব মানুষের) বিরুদ্ধে কথা বলছি, এটা তো ঠিক না। আমাদের তো ব্যবস্থা করা উচিত ছিল, একটা গরিব বাবা-মা মাদ্রাসায় না দিয়ে, একটা ভালো স্কুলে দিতো। এটা খুবই ফান্ডামেন্টাল ইস্যু। আমার মনে হয়, যেখানে একটা কওমি মাদ্রাসা গরিব ছেলেমেয়েদের নিচ্ছে। তার পাশে আমরা ভালো স্কুল তৈরি করতে পারি, যেখানে থাকা-খাওয়া ফ্রি, গরিব বাচ্চারা পড়তে পারবে। লং রানে একটা ভালো সল্যুশান হবে, সেটা কি খুব কঠিন?’

ড. জাফর ইকবাল বলেন, ‘আমরা যখন ছোট ছিলাম, শীতকাল মানেই কালচারাল অনুষ্ঠান,উৎসব। আর এখন শীতকাল মানে ওয়াজ। ওয়াজে আমার কোনও সমস্যা নেই। যারা করতে চায় করুক। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে- যখন ওয়াজ হয়, তখন একটা ছোট এলাকায় ৫০ জন মানুষ বসে আছে, তারা ৫০টা মাইক লাগিয়ে দেন। বিশাল এলাকার প্রত্যেক মানুষকে সেই ওয়াজ শুনতে হয়। যদি ভালো হতো আমার শুনতে আপত্তি নেই। কিন্তু মাঝে মাঝে আমার নিজের নামেও গালগাল করছে।

আইনগতভাবে নিশ্চয় কোনও জায়গায় ধরতে পারি, একটা অনুষ্ঠান করলে তার মাইক থাকবে শুধু সেই এলাকার মানুষকে শোনানোর জন্য, তার বাইরে অন্য মানুষকে শোনাতে পারবে না। আমার মনে হয় এই প্রবেলমটা অ্যাড্রেস করা দরকার।’

ড. জাফর ইকবাল বলেন, “অনেকে দুঃখ করে বলেছেন, ‘সুলতানা কামলকে যখন থ্রেট করলো, আমরা দশ হাজার মানুষ মাঠে নামতে পারলাম না।’ আসলে তারা (হেফাজত) অর্গানাইজড, তারা মানুষকে মাঠে নামিয়েছে। আমরা যদি চাইতাম পারতাম না এমন নয়। আমরা তো অর্গানাইজড নই যে বলে দিলাম, সবাই চলে আসলো। তবে যদি প্রয়োজন হয়ে তবে অবশ্যই মাঠে নামতে হবে।

অনেককে বলছেন, ‘তাদের (হেফাজত) মুখের ভাষা খারাপ, হাড্ডি মাংস আলাদা করে দেবে।’ কিন্তু ক’দিন আগে দেখলাম ছাত্রলীগের ছেলেরা বলছেন, ‘ইমরানকে (গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র) কুত্তার মতো পেটাবে।’ সেই কাজটা ঠিক হলো কিনা, সেটা নিয়ে কেউ প্রতিবাদ করেছি কিনা? আমাদের সবার ভাষা এ রকম হয়ে যাবে, একজন আরেকজনকে কুত্তার মতো পেটাবো, আরেকজন হাড্ডি মাংস আলাদা করবে, এটা ঠিক না। ওদের (হেফাজত) বিরুদ্ধে যারা দাঁড়াবে, তারা (ছাত্রলীগ) যদি ঠিক না হয়, তাদেরকে (হেফাজত) সেখান থেকে পেছানো যাবে না। আমাকে ভালো হতে হবে, সুন্দর ভাষায় ঠিকভাবে কথা বলতে হবে, তা না হলে আমার কথা অন্য মানুষ শুনবে না।’

অনুষ্ঠানে উপস্থিত মিডিয়াকর্মীদের উদ্দেশ করে ড. জাফর ইকবাল বলেন, ‘এখানে টেলিভিশনের অনেক মানুষজন আছেন। তাদের কাছে প্রশ্ন করতে চাই- সুলতানা কামাল এবং হেফাজতের একজন নেতাকে পাশাপাশি চেয়ারে বসানো হলো কেন? এটা আমি জানতে চাই। কেন এই দু’জনকে পাশাপাশি বসাতে হবে?

আপনাদের টেলিভিশনের প্রচারণা বাড়ানোর জন্য?
আলোচনার শুরুতে সংলাপসূত্র এর পক্ষে কি-নোট উপস্থাপন করেন জুলফিকার আলি মানিক। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন কবি ও সাহিত্যিক আহমদ রফিক, মাহফুজা খানম, অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক, ড. সলিমুল্লাহ খান, খুশি কবির, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ড. সরওয়ার আলী, শিল্পী লুবনা মরিয়ম, তারেক আলী, সাবেক তথ্য কমিশনার সাদেকা হালিম, সাংবাদিক সোহরাহ হাসান, কাজী খলিকুজ্জামান, অজয় রায়, শিফা হাফিজা, সুভাস সিংহ রায়, কবি রাজু আলাউদ্দিন, সাংবাদিক মুন্নী সাহা, উন্নয়ন কর্মী আসিম মুনির প্রমুখ।