‘জীবন সুন্দর। আকাশ-বাতাস পাহাড়-সমুদ্র। সবুজ বনানী ঘেরা প্রকৃতি সুন্দর। আর সবচেয়ে সুন্দর এই বেঁচে থাকা। তবুও কি আজীবন বেঁচে থাকা যায়!’

না, চাইলেই চিরকাল বেঁচে থাকা যায় না। পৃথিবীর অমোঘ সত্য বাণী – ‘জন্মিলে মরিতে হবে।’ তবু আমরা বেঁচে থাকার জন্য নিরন্তর সংগ্রাম করি। বেঁচে থাকতে সুতীব্র বাসনা ব্যক্ত করে বলি – ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে। মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।’

তবে জীবন এমন কিছু মুহূর্ত কখনো কখনো চলে আসে যখন জীবনের চেয়ে মৃত্যুকেই শ্রেয় মনে হয় এবং শ্রেয়তরও বটে। এমন মৃত্যু মানুষকে চিরকালের জন্য বাঁচিয়ে রাখে- কায়ায় না হোক, মায়ায়। এমন মৃত্যুবরণকারী মানুষের শরীরী মৃত্যু ঘটে, কিন্তু তারা চিরকাল বেঁচে থাকেন মানুষের মনে। তেমনই এক মৃত্যুর ঘটনা এটি।

চারদিকে আগুনের লেলিহান শিখা। এক প্রকাণ্ড সাপের মতো সামনে যা পাচ্ছে সবকিছুই গিলে খাচ্ছে আগুন। এক তলা থেকে অন্য তলায় দ্রুত বেগে ছড়িয়ে পড়ছে। এমন মুহূর্তে ২৪তলা ভবনের একটি তলায় আটকা পড়েছেন এক বৃদ্ধ (৮২) ও তার স্ত্রী (৬০)।

বৃদ্ধ দম্পতির পক্ষে সম্ভব নয় এই আগুনকে বৃ্দ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিরাপদে ভবন থেকে বেরিয়ে যাবে। যুবক বয়স হলো হয়তো পারত। যেমনটি পারত তার তিন যুবক সন্তান।

তবে বৃদ্ধ বাবা-মাকে আগুনের মুখে তুলে দিয়ে স্বার্থপরের মতো ভবন থেকে পালিয়ে যেতে পারেনি তিন সন্তান। বরং বাবা-মাকে মৃত্যুর মুখে রেখে পালিয়ে যাওয়া জীবন থেকে বীরের মতো বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সঙ্গে মৃত্যুকে হাসিমুখে বরণ করাকেই শ্রেয় মনে করেছে তারা।

এটি কোনো বীরগাথা কাল্পনিক গল্প নয়। বরং সত্যি ঘটনা। সম্প্রতি লন্ডনের ২৪তলা গ্রেনফেল টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ডে এক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ পরিবারের ঘটনা।

গ্রেনফেল টাওয়ারের ১৭তম তলায় থাকতেন বৃদ্ধ কামরু মিয়া ও তার স্ত্রী রাবেয়া। তাদের সঙ্গে থাকতেন তিন সন্তান- বড় ছেলে হামিদ (২৯), ছোট ছেলে হানিফ (২৬) ও মেয়ে হুসনা বেগম (২২)।

গত ১৪ জুন ওই ভবনটিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ভয়াবহ আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি লন্ডন ফায়ার সার্ভিসের প্রায় ২৫০ সদস্য। পুরো ২৪তলা ভবনই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

আগুন লাগার পর পরই তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কামরু মিয়া ও তার স্ত্রী রাবেয়া দেখতে পান- অনিবার অপ্রতিরোধ্য ঘাতকের মতো হাতে ‘মৃত্যু’ নামক ভয়াল অস্ত্র হাতে দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে আগুন। কিছু ভেবে ওঠার আগেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে তাদের ফ্ল্যাটে। কামরু মিয়া ও রাবেয়া এতটুকু বুঝতে পারেন যে- এই আগুন এড়িয়ে নিরাপদে ভবন থেকে বের হওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব না। ৮২ বছর বয়সি কামরু মিয়া তো স্বাভাবিক অবস্থাতে চলতে-ফিরতেই পারেন না। তিনি এই আগুনে কীভাবে ১৭তলা থেকে নিচে নামবেন! রাবেয়ারও অনেকটা একই অবস্থা।

অগত্যা তারা তিন সন্তানকে তাদের রেখে ভবন থেকে পালাতে বলেন। তবে যাদের জন্য আজ তারা ‍পৃথিবীর আলো দেখতে পাচ্ছেন, যারা এত কষ্ট করে তাদেরকে এত বড় করে তুলেছেন সেই ‍বৃদ্ধ বাবা-মাকে আগুনে পুড়ে মরতে রেখে যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি তিন সন্তান। বরং আগুন যখন পুরো ছড়িয়ে পড়ে, যখন তারা বুঝতে পারেন যে, এই সর্বগ্রাসী আগুন থেকে বাবা-মাকে বাঁচানো সম্ভব নয়, তখন ওই তিন সন্তান বাবা-মায়ের সঙ্গে বীরের মতো মৃত্যুবরণ করাকেই শ্রেয় মনে করেন। তারা তখন আত্মীয়দের ফোন করে জানিয়ে দেন, বাব-মায়ের সঙ্গে আগুন লাগা ভবনেই থাকবেন তারা।

আগুন লাগার প্রায় দুই ঘণ্টা পর এক আবেগঘন আলাপচারিতায় ওই তিন সন্তান তাদের জন্য আত্মীয়দের শোক করতে না করেন। তারা বলেন- তারা আরো ভালো স্থানে যাচ্ছেন। তারা বাবা-মায়ের সঙ্গে বেহেশতে যাচ্ছেন। কারণ বাবা-মায়ের পায়ের নিচেই সন্তানের বেহেশত।

গ্রেনফেল ভবনে আগুন লাগে ১৪ জুন ভোররাত ১২টা ৫০ মিনিটে। এর এক ঘণ্টা পরও ভোররাত ১টা ৪৫ মিনিটে নিরাপদে ভবন থেকে বের হতে পারতেন। তবে তারা তা করেননি। আত্মীয়দের সঙ্গে শেষ কথা বলেন ভোররাত ৩টা ১০ মিনিটে।

ওই তিন সন্তানের খালাতো ভাই সমীর আহমদ (১৮) বলেন, ‘ওই তিন সন্তানের বাবা হাঁটতে পারতেন না বলা চলে। তারা তখন কী করবেন? বাবাকে পরিত্যাগ করবেন?’

তিনি বলেন, ‘ভোররাত ১টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত তারা তাদের বাবা-মা ছাড়া নিরাপদে ভবন থেকে বের হতে পারতেন। তবে তারা তা করেননি।’

সমীর আহমদ বলেন, ‘শেষবার যখন কথা হয়, আমার খালা হানিফের সঙ্গে কথা বলেন। হানিফ খুব শান্ত ছিলেন এবং বলেন, আমার সময় চলে এসেছে। আমাদের জন্য দুঃখ করবেন না। বরং আমাদের জন্য আনন্দিত হবেন। কারণ আমরা আরো ভালো স্থানে যাচ্ছি।’

ওই তিন সন্তানের প্রতি সবিনয় শ্রদ্ধাবনত হয়ে তিনি বলেন, ‘তাদের প্রতি হ্যাটস অফ। তারা কাপুরুষোচিত কাজ করেননি। তারা তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে অবস্থান করেছেন। তাদের কাছে পরিবার গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তারা একসঙ্গে বসবাস করেছেন এবং একসঙ্গে মৃত্যুবরণ করেছেন।’

উল্লেখ্য, জুলাই মাসে লিচেস্টারে হুসনা বেগমের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল।

বর্তমানে ওই পরিবারের একজন সদস্যই বেঁচে আছেন। তিনি হলেন কামরু মিয়ার আরেক ছেলে মোহাম্মদ হাকিম। তিনি ওই দিন সন্ধ্যায় বাসায় ছিলেন। তবে রাতে আগুন লাগার আগেই তিনি বাসা থেকে বাইরে গেলে আগুন থেকে বেঁচে যান।

কামরু মিয়ার তিন সন্তান নিঃসন্দেহে পৃথিবীতে বাবা-মায়ের প্রতি ভালবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেলেন। নব্য তথাকথিত আধুনিক সন্তানরা যারা বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসেন তারা কী কামরু মিয়ার তিন সন্তানের কাছ থেকে কোনো শিক্ষা নেবেন?