মিয়ানমারে চলতি রমজান মাস ও তার আগে বেশ কিছু মসজিদ ও মাদরাসা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। উগ্রপন্থী বৌদ্ধ সংগঠনগুলোর এই দুষ্কৃতে সহযোগিতা করছে স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসন। ফলে নামাজ আদায়ে খুবই সমস্যায় পড়তে হচ্ছে দেশটির মুসলিমদের। দেশটিতে নতুন সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা দেখাও দিয়েছে এর ফলে।

বড় হওয়ার পর থেকেই পূর্ব ইয়াঙ্গুনের একটি মাদরাসা ও সংযুক্ত মসজিদে নামাজ পড়েন স্থানীয় মুসিলম চিত তিন (৫৫)। এমনকি দেশটির দীর্ঘ সামরিক শাসনের সময়ও এই মাদরাসাটির ওপর কোনো আঘাত আসেনি। কিন্তু এক মাস আগে এই মাদরাসাটিতে হামলা চালায় উগ্র বৌদ্ধরা। তারা প্রশাসনকে চাপ দেয় মাদরাসাটি বন্ধ করতে ও এখানে নামাজ আদায় নিষিদ্ধ করতে। দুই তলা বিশিষ্ট মাদরাসা ভবনটির চারদিক থেকে কাঁটা তার দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে এবং প্রধান গেটে তালা ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রায় ৫০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এই মাদরাসাটিতে নিয়মিত ছাত্র আছে ৩০০ জন। এ ছাড়া শুক্রবার কমপক্ষে এক হাজার লোক এখানে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করে।

চিত তিন বলেন, ‘এর চেয়ে দুঃখের ঘটনা আর কিছু হতে পারে না’। তার ছয় বছর বয়সী দুই নাতিও এই মাদরাসটির ছাত্র উল্লেখ করে তিনি বলেন, সামনে বাচ্চাদের পরীক্ষা, এই সময় মাদরাসা বন্ধ করে দেয়া হলো। পরীক্ষা না দিতে পারলে তাদের অনেক ক্ষতি হবে। তাকে এখন নামাজ আদায়ের জন্য ২০ মিনিট হাঁটা দূরত্বে যেতে হয় বলে জানান তিনি। আশপাশের মসজিদ ও মাদরাসা বন্ধ হওয়ায় সেখানে স্থান সঙ্কুলান হচ্ছে না। আবার তাদের এই নামাজের জায়গাটিকেও টার্গেট বানিয়েছে উগ্র বৌদ্ধরা।

রয়টার্স জানিয়েছে, মাদরাসা ও মসজিদ বন্ধ করে দেয়ার পর স্থানীয় মুসলিমরা প্রতিবাদ স্বরূপ রাস্তায় নামাজ আদায়ের কর্মসূচি দেয়। কিন্তু তাতে ধরপাকড় শুরু হয় তাদের ওপর। হয়রানির ভয়ে স্থানীয় মুসলিমদের অনেকেই সংবাদমাধ্যমের সাথে কথা বলতে রাজি হননি। এরই মধ্যে রাস্তায় নামাজ আদায়ের উদ্যোক্তাদের একজন স্থানীয় যুবক মো: জয়ের ছয় মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে আদালতের রায়ে।

গত কয়েক সপ্তাহে মিয়ানমারের বাণিজ্যিক রাজধানী ইয়াঙ্গুনে আরো বেশ কয়েকটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছে উগ্রবাদীদের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অং সান সু চির গণতান্ত্রিক সরকার আসার পরও উগ্র বৌদ্ধদের সহিংসতা বন্ধ হচ্ছে না। বরং কিছু ক্ষেত্রে সামরিক সরকারের সময়ের চেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে মুসলিমরা। দু-একটি ঘটনায় উগ্রবাদী কয়েকজনকে গ্রেফতার করলেও তাতে কমছে না অপরাধ।

মিয়ানমারের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় মান্দালয় অঞ্চলের মেইখতিলা শহরে মুসলিমদের ধর্মপালনে বিভিন্নভাবে বাধা দেয়া হচ্ছে। ২০১৩ সালে এই শহরটিতে ব্যাপক মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা সঙ্ঘটিত হয়েছে। স্থানীয় ভয়েস পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, চলতি রমজানে শহরটির তিনটি স্থানে তারাবির নামাজের আয়োজন বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। ব্যক্তিগতভাবে কেউ নিজ বাড়িতে জামাতে নামাজের ব্যবস্থা করতে চাইলে পুলিশ যুক্তি দিয়েছে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যত্র নামাজ আদায় বেআইনি। নিয়মিত এই জায়গাগুলোর আশপাশে টহল দিচ্ছে পুলিশ। পত্রিকাটি আরো জানিয়েছে, ওই শহরে ২০১৩ সালে দাঙ্গার সময় বন্ধ করে দেয়া ১৩টি মসজিদের মধ্যে পাঁচটি পরে চালু করা হয়েছে।

ইয়াঙ্গুনের মুসলিম স্কলার সান উইন শেইন বলেন, ‘যেহেতু কর্তৃপক্ষ আমাদের সুবিধামতো জায়গায় নামাজ পড়তে দেয় না, তাই আমরা অনুরোধ করেছি আমাদের জন্য একটি জায়াগা নির্ধারণ করে দিতে। কিন্তু কোনো সাড়া পায়নি’।