পৃথিবীতে মানুষের কত রকমের পেশা থাকে। পেশাজীবী মানুষ সব সময় তাদের কাজকে আঁকড়ে ধরেই জীবিকার খোঁজ করেন। সেই হিসেবে পকেটমারাকে কি পেশা বলা যাবে? আপনার কাছে হয়তো না, কিন্তু পৃথিবীর বহু মানুষের কাছে পকেট মারাটা একটা পেশাই বটে। কেউ কেউ আবার বংশপরম্পরায় পকেট মারেন। মানে দাদা মারতেন, বাপের কাছ থেকে শেখা, এখন নিজেও মারছেন। বয়সের বাঁধাধরা একদম নেই। শিশু, কিশোর-কিশোরী, নারী-পুরুষ, যে কেউ হতে পারে এই কাজের কাজী।

বগুড়া শহরের হার্ড পয়েন্টে একটা পাড়া আছে। নাম চেলোপাড়া। শহরের মধ্যে যেন অচেনা আরেক শহর। বহমান কৃষ্টি-কালচারের বাইরে থেকে তারা নিজেদের মতো করে চলে। সমাজ, সামাজিকতা সবকিছু তাদের আলাদা। পাড়ার মেয়েরা দিনের বেলায় ফেরি করে চুরি-ফিতা, আয়না-চিরুনি, আলতা-লিপিস্টিক, অন্তর্বাস ইত্যাদি। এসব মাথায় নিয়ে গ্রামে-গঞ্জে বিক্রি করে বেড়ায় তারা। আর পুরুষরা শহরের অলিগলি, ব্যস্ত মার্কেট ঘুরে ঘুরে মানুষের পকেটে আঙুল চালায়। নিখুঁত কৌশলে তুলে নেয় দামি ফোনসেট, নগদ টাকা। পাঁচ থেকে আটজনের একটা দল একসঙ্গে কাজ করে। টার্গেট করা শিকারের চারপাশে সাধারণ মানুষের মতো ঘিরে রাখে তারা। নিজেরাই জটলা পাকিয়ে এক ফাঁকে পকেটে হাত ঢুকানোর পরিবেশ তৈরি করে নেয়। তারপর সুযোগ বুঝে দলটার নেতা হাতিয়ে নেয় পকেটে থাকা মূল্যবান যা কিছু থাকে। দ্রুত হাত বদল হয়ে যায় সদ্য মেরে দেয়া ফোনসেট অথবা টাকা। এরপর নতুন শিকার টার্গেট। আবার একই কায়দায় ঘায়েল করে ফেলে বেড়াতে বের হওয়া কিংবা সওদা করতে আসা মানুষটিকে।

এই পকেটমারদের সবারই জন্ম ও বেড়ে ওঠা বগুড়া শহরের উত্তর চেলোপাড়ায়। এ পাড়ার প্রায় ২০০ পরিবারের বশংবদ পেশা পকেটমারা। বাপ-দাদা-পরদাদার ছিল এই পেশা। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম তারা নিজের মধ্যে চর্চা করে আসছে পেশাটি। পকেটমারাকে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পেশা বলে মান্য করে তারা।

সাংবাদিক পরিচয়ে এই পাড়ায় ঢোকা খুবই কঠিন। কারণ এখানে বসবাসরত প্রায় ৯৮ ভাগ মানুষই পকেটমারদের সহযোগী হিসেবে কাজ করে।

প্রায় ১৫০ বছর আগে যখন করতোয়া নদী ছিল, তখন এর অববাহিকায় বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন এসে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন কাজের জন্য অস্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকে। বিশেষ করে বেদে শ্রেণির মানুষরা নদীর তীরে তাঁবু গেড়ে আশ্রয় নিত। তারা পেশায় ছিল সাপুড়ে। দিনের বেলায় তারা বিভিন্ন স্থানে সাপের খেলা দেখিয়ে রোজগার করত। এদের কেউ কেউ তখন থেকেই বগুড়ার করতোয়ার উপকণ্ঠে স্থায়ীভাবে থেকে যায়। করতোয়ার সেই উপকণ্ঠটিই বর্তমান চেলোপাড়া। এদের শিক্ষার হার শূন্যের কোঠায়। এই পরিবারগুলোর কোনো শিশুকে স্কুলে পাঠানো হয় না।

কয়েকজন নারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের সন্তানদের বিয়ে-শাদিও তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে। তাদের মতাদর্শের বাইরে সাধারণ পরিবারের কারো সঙ্গে ছেলেমেয়ের বিয়ে দেয় না তারা। স্থানীয় গোষ্ঠীতে না হলে এদের উত্তরসূরি আরো দুটি পাড়া পার্শ্ববর্তী গাইবান্ধা ও সিরাজগঞ্জ জেলাতে বসবাস করে, এদের মধ্যে পাত্রপাত্রী আদান-প্রদান হয়।

স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিরা অনেকবার চেষ্টা করেও এদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে নিতে পারেনি। বাবার হাত ধরেই ছোটবেলা থেকে তারা পকেট কাটা, চুরিবিদ্যার ছবক নেয়। সন্তানের বয়স ৭ থেকে ১০ বছর হলেই বাবারা তাদের মাঠে নামায়। প্রথমে ছোটখাটো সহজ কিছু চুরি শেখানো হয় তাদের। মসজিদ থেকে জুতা সেন্ডেল, দোকানে ভিড়ের সময় দোকানির চোখ ফাঁকি দিয়ে কিছু লোপাট করে নেয়া, শহরের রাস্তায় জ্যামের সময় মোটরসাইকেল, সাইকেল অথবা ভ্যান থেকে কিছু টান দেয়া তাদের প্রাথমিক শিক্ষার অংশ। এভাবেই বাবার তত্ত্বাবধানে তারা একসময় পাকা পকেটমার হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

ভাববেন না পকেটমার বলে তারা মুখ লুকিয়ে থাকে। বরং বগুড়ার চোলোপাড়ার পকেটমার পরিবারগুলো বেশ দাপটের সঙ্গেই বসবাস করছে। বগুড়া শহরের গণ্ডি পেরিয়ে ঢাকা শহর ছাড়িয়ে দেশের নানান প্রান্তে পকেট কাটছে এখানকার বাসিন্দারা। এমনকি দেশের সীমানা পেরিয়ে পাশের দেশ ভারত পর্যন্ত এদের পদচারণ আছে।

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থির হয়ে উঠলে মিছিল মিটিং সমাবেশ যখন বেশি হয়, সেই সময়টা পকেটমারদের জন্য ‘সুবর্ণ সুযোগ’ হয়ে আসে। রাজনৈতিক দলের সমাবেশ, মহাসমাবেশগুলোতে থাকে এদের টার্গেট। বিশেষ করে শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়াসহ জাতীয় রাজনৈতিক নেতাদের সমাবেশ দেশের যেখানেই হোক, বগুড়ার পকেটমাররা সেখানেই উপস্থিত হবে।

দুই-একজন পকেটমার জানালেন, তারা যখন বগুড়ার বাইরে কাজের জন্য বের হন তখন তারা দামি মাইক্রোবাসে করে যান। এ সময় পোশাক ও বেশভূষা দেখে তাদের পকেটমার বলে ধারণা করা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক সমাবেশের বাইরে টঙ্গীতে তাবলিগ জামাতে সবচেয়ে বেশি পকেট কাটেন তারা। পায়জামা-পাঞ্জাবি এমনকি জোব্বা-পাগড়ি মাথায় দিয়ে মুসল্লিদের মাঝে মিশে পকেট কাটেন তারা।

চেলোপাড়া সংলগ্ন নারুলী ফাঁড়ি থানার একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, শুধু চেলোপাড়াতেই ২০০ জনের মতো পকেটমার আছে। তাদের অনেকেই ভারত পর্যন্ত পকেট কাটার জন্য যায়। হিন্দুধর্মালম্বীদের দুর্গাপূজাসহ বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান সামনে রেখে তারা ভারতে পাড়ি জমায়। ওই পুলিশ কর্মকর্তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, কালাম, লুতফর, বিমানসহ পকেটমারের একটি টিম বর্তমানে ভরতে অবস্থান করছে।

বগুড়াতে তারা কয়েটি পয়েন্টে পকেটমারা কাজ করে থাকে। নিউমার্কেটের প্রধান গেট, মার্কেটের ভেতর, সাতমাথা, থানামোড়, কাঁঠালতলা এবং কোর্ট এলাকায় ১০ থেকে ১৫টি দল প্রতিদিন সকাল থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত অন্যের পকেটের পিছু পিছু ছোটে। এদের আরো দুটি দল বাসে ও রেলগাড়িতে নিয়মিত ডিউটি দেয়। বগুড়া আন্তজেলা বাস টার্মিনাল ঠনঠনিয়া থেকে প্রায় ২০টি স্থান থেকে লোকাল বাস ছেড়ে যায়। এসব লোকাল বাসে অনেক ঠাসাঠাসি করে যাত্রীরা যাতায়াত করে। অন্যদিকে বগুড়া থেকে সান্তাহার এবং বোনারপাড়া হয়ে লালমনিরহাট, দিনাজপুরের উদ্দেশে চারটি ইন্টারসিটি এবং ৮-১০টি মেল ও লোকাল ট্রেন ছেড়ে যায় এবং ছেড়ে আসে। এসব ট্রেন ও বাসযাত্রীদের প্রতিদিন পকেটমারের কাছে ধরাশায়ী হতে হয়। বাস ও ট্রেনের দলগুলোকে নেতৃত্ব দেন মাসুদ, খোকন ও সাইদ।

এদের বিরুদ্ধে সদর থানায় অন্তত পাঁচ শতাধিক মামলা চলছে। জনগণের হাতে ধরা পড়লে পুলিশ তখন জনরোষ থেকে উদ্ধার করে গ্রেপ্তার দেখিয়ে জেলে দেয়। এক-দুই মাস জেল খেটে আবার এরা মাঠে সক্রিয় হয়ে ওঠে।

তাদের সর্দার হিসেবে কিছু ব্যক্তির নাম শুনতে পাওয়া যায় চেলোপাড়ায় গেলে। কখনো কোনো পকেটমার পুলিশের হাতে ধরা পড়লে এই সর্দাররা তদবির করে থানা থেকে তাদের ছাড়িয়ে আনেন। কখনো থানা থেকে ছাড়িয়ে আনা সম্ভব না হলে কোর্ট থেকে উকিল-মহুরির মাধ্যমে এদের জেল থেকে মুক্ত করতে সহযোগিতা করে। মূলত তাদের অভিভাবক হয়ে ভালোমন্দ দেখা, মামলার দেখাশোনা করা এবং পুলিশের কাছ থেকে তদবিরের মাধ্যমে ছাড়িয়ে আনাই সর্দারদের কাজ। এর বিনিময়ে তারা ধরা পড়া পকেটমারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে থাকে।

পুলিশ কিংবা সাধারণ মানুষ এদের ধরামাত্র দ্রুত বমি অথবা পরনের কাপড়ে পায়খানা করে বসে। এভাবে নিজের শরীর মেখে বিব্রত অবস্থায় ফেলে দেয় ধরতে আসা ব্যক্তিদের। অন্যদিকে এরা জিহ্বার নিচে সব সময় ধারালো ব্লেড রাখে। কেউ তাদের ধরার জন্য এলে সেই ব্লেড বের করে নিজের শরীর কেটে রক্তাক্ত করে। ভয়ে তখন তাদের ছাড়তে বাধ্য হয় সাধারণ মানুষ। এসব কিছুই নাকি তাদের প্রশিক্ষণের অংশ।

বগুড়া নারুলী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি এখানে দায়িত্ব নেয়ার পর এই এলাকার মাস্তান, চাঁদাবাজ, চোর, পকেটমারদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছি।’ তিনি আরো জানান, উত্তর চেলোপাড়ায় অবস্থানরত পকেটমারদের নির্মূল করতে তার অভিযান চলবে। তিনি ওই পল্লীর দুর্নাম ঘোচাতে চান।