মাছের রাজা ইলিশ আর দেশের রাজা পুলিশ। বেশ কিছুদিন আগের বেশ চর্চিত একটি বাক্য। আমি আবারও পুনরাবৃত্তি করলাম। হয়তো অনেকসময় অনেকের কাছে তা বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আবার এটাও ঠিক, কিছু কিছু ব্যাপার আমাদের রক্তে মিশে যায় এবং আমরাও মেনে নেই। তখন পুনরাবৃত্তি আর মনপীড়ার কারণ হয় না। যেমন বৈশাখ এলে বাজবে- এসো হে বৈশাখ……. অথবা রোজার ঈদে- রমজানের ঐ রোজার শেষে……….।

আমি বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে প্রথমোক্ত কথাটির যথার্থতা উপলদ্ধি করেছিলাম। দেশের রাজা পুলিশ ক্ষেত্রবিশেষে হতেও পারে। তবে না হওয়াটাই সাধারণের জন্য মঙ্গলজনক। মাছের রাজা ইলিশ- এতে কারো কোনো আপত্তি নেই। আমাদের ছোটবেলায় টিভিতে একটা বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হতো, সেটার ট্যাগলাইন ছিলো- মাছের রাজা ইলিশ আর বাতির রাজা ফিলিপস। টিভি বিজ্ঞাপনটা ভালোই লাগতো, আর কনসেপ্টটাও গভীর। তবে ঐ মাছের রাজা ইলিশ পর্যন্ত ঠিক আছে কিন্তু নিশ্চিত করে বলা যায় না ফিলিপস বালবই বাতির জগতে সেরা।

সে যাই হোক, বেশ কয়েকদিন আগে রিকশা করে নিজের বাসায় ফিরছি। সাথে আমার স্ত্রী। উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরে টু লেট দেখে কথা বলার জন্য আমি রিকশা থেকে নেমে ঐ বাসার ভিতরে যাই। আমার স্ত্রী রিকশায় ঐ বাসার কিছুটা সামনে অপেক্ষা করতে থাকে। বাসার কেয়ারটেকারের সাথে কথা বলে বের হয়েছি- দেখি গেটে দুই তিনজন পুলিশ। আমাকে জেরা করা শুরু করল। এখানে কেন এসেছি, কই থাকি, দেশের বাড়ি কই, কি করি, গতানুগতিক এসব প্রশ্ন। এরপর কি হবে, মোটামুটি আঁচ করতে পারছি। তাই ঘটল।

‘আমাদের স্যার আপনাকে ডাকছেন।’ পুনরায় একই জেরা। তবে এবার পার্থক্য হলো- স্যার একই প্রশ্ন আমাকে দুই বার করে করতে লাগলেন। এটা হয়তো তথ্যে কোনো গড়মিল পাওয়া যায় কি না- এ কারণেও হতে পারে। বলতে ভুলে গেছি- স্যারের কাছে যাওয়ার আগে আমার মতো আরেক হতভাগা ঐ বাসা থেকে বের হয়। তো দুজন মিলেই স্যারের কাছে আসি। তাকেও জেরা চলতে থাকে।

এ কসময় ‘স্যার’ আমাকে আইডি কার্ড দেখাতে বললেন। সূক্ষœভাবে পরীক্ষা করে বোঝার চেষ্টা করলেন কার্ডটি আসল নাকি নকল। তার কাছে আসলই মনে হলো। কারণ আমার আইডি কার্ডটি টাকার নোট যেমন রঙ পরিবর্তন করে তেমন। ক্লিয়ারেন্স কিন্তু তখনও পাইনি। স্যার দুজনকে গাড়িতে উঠতে বললেন। আমার মেরূদ- শিরশির করে উঠে। এ বিষয়টিও জানা ছিলো। কারণ, এসবকিছু একটি নাটকের সিকোয়েন্স মাত্র।

আমার সাথের ছেলেটি ইতিমধ্যে গাড়িতে উঠে পড়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে ‘স্যার’ তাকেও আইডি কার্ড দেখাতে বললেন। কিন্তু তার কাছে কোনো আইডি কার্ড ছিল না। স্যার তখন আমার তুলনা টেনে বললেন, উনার তো আইডি কার্ড আছে। আপনার নাই কেন? একথায় আমি আশার আলো দেখতে পাই। কারণ, একবার গাড়িতে উঠা মানে জেলের ভাত খেয়ে আসা, নয়তো বিকাশ করা।
ওই সময়টায় আমি একান্তভাবে স্ত্রীর ফোনকলের অপেক্ষায় ছিলাম। কারণ তাকে এই বিপদের কথাটা জানাতে পারলে সে হয়ত স্পটে এসে তৎক্ষণাৎ আমার মুক্তির একটা ব্যবস্থা করতে পারত। অন্যসময় হলে দুই মিনিট যেতে না যেতেই ফোন করে আমাকে অস্থির করে তুলতো। আর আজকে বিপদ বলে সেও ফোন করছে না!

যাই হোক, মুক্তির সুবাতাস দিতেই স্যার হয়ত জিজ্ঞেস করলেন, এখানে কি মাদক কিনতে এসেছেন! আমি আমার হারানো শক্তি ফিরে পাই। বলি, না। আমি টু লেট দেখে এসেছিলাম। সাথে আমার স্ত্রী আছে। তার কথা বলাতেই কিনা, পুলিশ ‘স্যার’ আমার আইডি কার্ডটা ফেরত দেন। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। তবে স্বাভাবিকভাবে হেঁটেই স্ত্রীর কাছে ফেরত আসি।

উপরে যে ঘটনাটির কথা উল্লেখ করলাম তা পুলিশি হয়রানির খুব কমন একটি ঘটনা। অনেকেই এর ভুক্তভোগী। আমার সাথে থাকা ঐ ব্যক্তির জন্য খারাপ লেগেছিল। জানি না, শেষমেশ তার ভাগ্যে কী ঘটেছিল। তবে ভালো কিছু অবশ্যই নয়। এদিক দিয়ে হলেও পুলিশ আসলেই দেশের রাজা। কারণ গাড়িতে তুলে নেয়া ব্যক্তিকে নিয়ে পুলিশ এখন যা খুশি তাই করতে পারে। টাকার রফা ঠিকঠাক মতো না হলে, আসামি বানাতে পারে, যে কোনো মামলায় জড়িয়ে ফেলতে পারে, থানা হাজতে নির্যাতন করে মেরে ফেলতে পারে। আজীবন কাউকে জেলে পচানো মামুলি ব্যাপার।

কারণ, পুলিশ ক্ষেত্রবিশেষে জবাবদিহিতারও ঊর্ধ্বে। আর জনগনকে ইচ্ছাকৃত হয়রানির ক্ষেত্রে পুলিশের সহায়ক একটি আইনি ধারা তো আছেই। নিতান্তই প্রভাবশালীর ফোন না এলে অন্য কেউ কিছু করতে পারবে না। টাকার পরিমাণটা ক্ষেত্রবিশেষে আহামরি নয়, কিন্তু এটাও দিতে না পারলে পরিণামটা ভয়াবহ। অনেক ক্ষেত্রে সারাজীবন দাগ রয়ে যায়।

কিছু কিছু ঘটনায় পুলিশ তল্লাশি করার নামে নিজেরাই মানুষের পকেটে মাদক পুরে দেয়। কার সাধ্য আছে? খোদ পুলিশ প্রধানেরও হয়ত নেই যে মাদক ওই ব্যক্তির কাছে ছিল না, পুলিশই দিয়েছে। আর গাড়িতে তুলে নেয়ার পরিণতি তো বললামই। এসব আমার নিজের কোনো কথা নয়। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিয়মিতভাবেই এধরনের সংবাদ আসছে। যা সত্যিকার অর্থেই উদ্বেগজনক।

কিছুদিন আগে ডিএমপি কমিশনার বলেছেন, কিছুদিনের মধ্যে পুলিশ বাহিনী মানুষের ঘরে ঘরে নক করে বলবে, ‘আপনি ভালো আছেন তো! আপনাকে কোনো সাহায্য করতে পারি!’ আমার মনে হয় না বাড়ির দরজায় পুলিশকে এদেশের মানুষ স্বাভাবিকভাবে নিতে পারবে। বরং দুর্বল চিত্তের দুই একজন হার্ট অ্যাটাক করতে পারে। এখনও সে সময় আসেনি।

পুলিশকে জনগণের বন্ধু হতে হলে দেশের রাজা না হয়ে আগে সেবক হতে হবে। নিরীহ জনগনকে হয়রানি বন্ধ করতে হবে। আগে পুলিশ সম্পর্কে জনগণের নেতিবাচক ভীতি দূর করতে হবে। তাহলেই দরজায় কড়া নেড়ে সুফল পাওয়া যাবে। জনগন পুলিশকে অতিথি হিসেবে অভ্যর্থনা জানিয়ে চা নাস্তা খাইয়ে তাদের কুশলাদি জানাবে।

পুলিশের এসব হয়রানিমূলক কর্মকা- সম্পর্কে সরকার অবশ্যই ওয়াকিফহাল। এসব দূর করতে এবং পুলিশকে আসলেই জনগণের বন্ধু বানাতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছে। একদিনেই পুলিশ বাহিনি আমূল বদলে যাবে না। এটা আমরা সবাই জানি। সরকার যে এনিয়ে কাজ শুরু করেছে তা গৃহীত কিছু সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আপাত বোঝা যাচ্ছে। এ সিদ্ধান্তগুলি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হতেও কিছু সময় লাগবে। সরকারের কাছে অনুরোধ, আপনারা এই প্রক্রিয়াটাকে জোর কদমে সামনে এগিয়ে নেন। আমরা পুলিশকে বন্ধু হিসেবেই পেতে চাই।

তবে বন্ধু পুলিশ কিন্তু বর্তমানেই আছে। ঢালাওভাবে সব পুলিশকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করাটা অন্যায়। অল্প কয়েকজনের জন্য পুরো পুলিশ বাহিনী খারাপ হয়ে যেতে পারে না। কিছু পুলিশ সদস্য আছেন যারা খুবই সৎ, দক্ষ, অমায়িক।

ঘটনাস্থল দিনাজপুর কোতয়ালি থানা। বাবা মা কর্তৃক প্রত্যাখাত অসহায় বালককে আশ্রয় দিয়েছে পুলিশ সদস্যরা। তারা সাময়িকভাবে তার মৌলিক চাহিদাগুলো মেটানোর ব্যবস্থা করেছে। এর জন্য নিজেদের পকেট থেকে সবাই সাধ্যমত ব্যয় করছে। বালকটিও মহাখুশি। এমন নজিরবিহীন আতিথেয়তায়, নির্ভরতায় সে থানাতেই পুলিশ সদস্যেদের মাঝে থেকে যেতে চায়। বড় হয়ে পুলিশ হতে চায়।

এখন বলব আসলেই এক রাজার কথা। হ্যাঁ, তাকে অনায়াসে রাজা বলে সম্বোধন করা যায়। আমি তাকে সেই সম্মান দিলাম এবং শ্রদ্ধায় তার প্রতি নত হলাম। ঢাকাটাইমস এই নিভৃতচারীকে নিয়ে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে। তার কর্মস্থল খুলনা। এই রাজা তার প্রজাদের মানে জনগণের নিরাপত্তা বিধানে রাতের আঁধারে সাদা পোশাকে এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বের হন। এ ধরনের দুই একটি ঘটনা আমাদের মনকে খুশি করে দেয়।

আমরা আমাদের দেশকে নিয়ে আশান্বিত হই। এ ধরনের ঘটনা পুলিশ বাহিনীর অন্যান্য নেতিবাচক কাজগুলোকে কিছুটা হলেও ঢেকে দেয়। কারণ, আমরা বাংলাদেশিরা উদারমনা সহজ সরল স্বপ্নচারী। দশটা খারাপ কাজে আমরা যতটা না ব্যথিত হই। একটি ভালো কাজ সব মুছে দিয়ে আমাদেরকে দ্বিগুণ উদ্বেলিত করে।