স্পোর্টস রিপোর্টার,  চট্টগ্রাম //

জানুয়ারিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে দুই ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্টটি খেলেছিল বাংলাদেশ। রানবন্যার ওই ম্যাচে দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন মুমিনুল হক সৌরভ। এছাড়াও সে ম্যাচের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিলো, ‘চিটাগং’ থাকতে সে ভেন্যুতে এটিই ছিলো বাংলাদেশের শেষ টেস্ট ম্যাচ।

না চিটাগং কোথাও যায়নি। মাসকয়েক আগে ইংরেজি বানানের সাথে উচ্চারণের সামঞ্জস্য ফেরাতে আনুষ্ঠানিকভাবে চিটাগং (Chittagong) এর বানান বদলে করা হয়েছে চট্টগ্রাম (Chattogram)। নাম বদলের পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ প্রথমবারের মতো চট্টগ্রামের মাঠে খেলতে নেমেছে বাংলাদেশ দল।

দশ মাসের ব্যবধানে ‘চিটাগং’ বদলে ‘চট্টগ্রাম’ হয়ে গেলেও একটুও বদলায়নি মুমিনুল হক সৌরভের ব্যাটের সৌরভ। সেই দশ মাস আগের জোড়া সেঞ্চুরির সুখস্মৃতি সাথে নিয়ে খেলতে নেমে আবারও হাঁকিয়েছেন সেঞ্চুরি। সাগরিকার এই মাঠে হ্যাটট্রিক সেঞ্চুরির পাশাপাশি মোট ছয়টি সেঞ্চুরি করে রেকর্ডবুকে নিজের নাম তুলে ফেলেছেন মুমিনুল।

অথচ ইনিংসের শুরুটা একটুও অনুকূলে ছিলো না মুমিনুলের। উইকেটে যখন এলেন তখনো চকচক করছে নতুন বল, ইনিংসের তৃতীয় বলেই উইকেট পেয়ে উজ্জীবিত ক্যারিবীয়ান পেসার কেমার রোচ। তার জন্য রাখা হলো তিনটি স্লিপ, গালি ও পয়েন্ট ফিল্ডার। মুখোমুখি প্রথম বলে জয়ী রোচই। মুমিনুলের ব্যাটের ভেতরের কানায় লেগে বল চলে যায় ফাইন লেগে। এক রান নিয়ে যাত্রা শুরু করেন কক্সবাজারের এ তরুণ।

এরপর থেকে রোচ কিংবা ওয়েস্ট ইন্ডিজের কোনো বোলারদেরই জিততে দেননি ২৭ বছর বয়সী মুমিনুল। নিজের স্বভাবসুলভ ব্যাটিংয়ে ছড়ি ঘুরিয়েছেন সাগরিকার উইকেটে, আধিপত্য বিস্তার করেছেন ক্যারিবীয় বোলারদের ওপর, তুলে নিয়েছেন জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে ষষ্ঠ এবং সবমিলিয়ে ক্যারিয়ারের অষ্টম সেঞ্চুরি।

অপর প্রান্তে শুরু থেকেই নড়বড়ে ব্যাটিং করছিলেন ইমরুল কায়েস। একবার ফিল্ডারের বদান্যতায় বেঁচে যাওয়া, একবার বোলার নো বল করায় বেঁচে যাওয়া ও বেশ কয়েকবার ব্যাটের কানায় লাগিয়ে নিজের ইনিংস এগিয়ে নিতে থাকেন ইমরুল। অন্যপ্রান্তে ঠিক ইমরুলের বিপরীতই ছিলেন মুমিনুল।

উইকেটের চারপাশে স্ট্রোকের ফুলঝুরি ছড়ান তিনি। নিজের সাবলীল ব্যাটিংয়ে মাত্র ৬৯ বলেই সাত চারের মারে পূরণ করেন চট্টগ্রামের মাঠে নিজের প্রথম পঞ্চাশ। দ্বিতীয় পঞ্চাশ আসে আরও দ্রুত। পরের পঞ্চাশ করতে ৬৭ বল খেলেন তিনি। তবে কমে বাউন্ডারির সংখ্যা। সবমিলিয়ে ১৩৬ বলে ৯ চার ও ১ ছয়ের মারে সেঞ্চুরি করেন মুমিনুল।

আগের ওভারে ক্যারিবীয়ান লেগস্পিনার দেবেন্দ্র বিশুকে ছক্কা মেরে ৯২ থেকে পৌঁছে যান ৯৮-তে। পরের ওভারে রোস্টন চেজকে স্কয়ার কাটে সীমানা ছাড়া করে নিজের অষ্টম ও সাগরিকায় ষষ্ঠ সেঞ্চুরি তুলে নেন মুমিনুল। দলীয় ২২২ রানের মাথায় আউট হওয়ার আগে ১৬৭ বল খেলে ১০ চার ও ১ ছয়ের মারে ১২০ রান করেন তিনি। আর মাত্র ১১ রান করতে পারলে মুশফিকুর রহিমের পর দ্বিতীয় ক্রিকেটার হিসেবে চট্টগ্রামের মাঠে ১০০০ রান পূরণ হতো মুমিনুলের। এ মাইলফলকে পৌঁছতে পরের ইনিংসের অপেক্ষা করতে হচ্ছে তাকে।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, এ মাঠে ছয়বার পঞ্চাশ পেরিয়েছেন মুমিনুল এবং প্রত্যেকবারই পঞ্চাশকে শতকে পরিণত করেছেন কক্সবাজার সমুদ্রের পাশে বেড়ে ওঠা এ ক্রিকেটার। সাগরিকায় ছয় সেঞ্চুরির সাথে মিরপুরের শেরে বাংলায়ও দুইটি সেঞ্চুরি রয়েছে মুমিনুলের। সবমিলিয়ে ক্যারিয়ারের অষ্টম সেঞ্চুরিতে দেশের হয়ে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির সংখ্যায় তামিম ইকবালের পাশে বসেছেন তিনি।

এতদিন ধরে ৮টি সেঞ্চুরি নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির মালিক ছিলেন তামিম। সে রেকর্ডেই ভাগ বসালেন মুমিনুল। এছাড়া একই ভেন্যুতে ছয়টি সেঞ্চুরি করে রিকি পন্টিং (এডিলেইড ও সিডনি), গ্রাহাম গুচ (লর্ডস), মাইকেল ভন (লর্ডস) ও ম্যাথু হেইডেনের (মেলবোর্ন) পাশে নিজের নাম তুলেছেন মুমিনুল।

তবে এক ভেন্যুতে সর্বোচ্চ ১১ সেঞ্চুরির রেকর্ড রয়েছে মাহেলা জয়াবর্ধনের (এসএসসি, কলম্বো), এছাড়া স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের মেলবোর্নে ৯, জ্যাক ক্যালিস ক্যাপটাউনে ৯, কুমার সাঙ্গাকারা এসএসসিতে ৮, এডিলেইডে মাইকেল ক্লার্ক ৭ ও গলে সাঙ্গাকার ও জয়াবর্ধনের ৭টি করে সেঞ্চুরি রয়েছে।

জানুয়ারিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জোড়া সেঞ্চুরির পর চলতি মাসেই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ঢাকা টেস্টে মুমিনুল করেছিলেন ১৬১ রান। আর এবার সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে বিরাট কোহলির সাথে যুগ্মভাবে চলতি বছরে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরি করার কৃতিত্ব দেখালেন মুমিনুল। কোহলি ও মুমিনুল ব্যতীত চলতি বছরে দুটির বেশি সেঞ্চুরি নেই আর কোনো ব্যাটসম্যানের।

২০১৩ সালে মুমিনুল নিজের ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন শ্রীলঙ্কার মাটিতে। নিজের ক্যারিয়ারের প্রথম দুই ইনিংসেই পঞ্চাশ ছাড়িয়েছিল সৌরভের ব্যাট। কিন্তু সেঞ্চুরি হয়নি একটিও। পরে একই বছর দেশের মাটিতে নিজের প্রথম ম্যাচটিই খেলেন জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে। প্রথম ইনিংসেই করেন এখনো পর্যন্ত ক্যারিয়ার সর্বোচ্চ ১৮১ রান।

সেই যে শুরু! এরপর থেকে চট্টগ্রামে খেললেই যেন রানের ফোয়ারা ছোটে মুমিনুলের ব্যাটে। তিনি সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন চট্টগ্রামে খেলা নিজের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় টেস্টেও। ২০১৪ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১০০* ও একই বছর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অপরাজিত ইনিংসে করেছিলেন ১৩১ রান। মাঝে সেঞ্চুরির দেখা পাননি তিনটি টেস্টে।

এরপর আবার চলতি বছরে জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে খেলা তিন ইনিংসেই শতরানের দেখা পেয়েছেন মুমিনুল। সবমিলিয়ে নিজের ক্যারিয়ারের আট সেঞ্চুরিই ছয়টিই করেছেন চিটাগং অথবা চট্টগ্রামে। যার মানে দাঁড়ায়, হোক চিটাগং বা চট্টগ্রাম; একই সৌরভ ছড়াচ্ছেন মুমিনুল হক সৌরভ।