জামায়াত ছাড়লেন ব্যারিস্টার রাজ্জাক ৭১-এর ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়ার পরামর্শ

17 February, 2019 : 11:51 am ১৩৯

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকার জন্য জাতির কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার পরামর্শ দিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে পদত্যাগ করেছেন লন্ডনে বসবাসরত দলটির অন্যতম সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। পদত্যাগপত্রে ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক উল্লেখ করেছেন, স্বাধীনতাযুদ্ধে বিরোধিতার জন্য তিনি জামায়াতকে বিলুপ্ত করে দেয়ারও প্রস্তাব করেছিলেন দলীয় ফোরামে। কিন্তু জামায়াত তা গ্রহন করেনি। মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকার জন্য জামায়াত নিষিদ্ধ করার বিষয়ে যখন জোর আলোচনা হচ্ছে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জামায়ত যখন নাম পরিবর্তন করে নতুন নামে রাজনীতি শুরু করার চিন্তা করছে তখন দলটির এই সিনিয়র নেতার পদত্যাগের খবর এল। ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াত নেতাদের আইনজীবী টিমের প্রধান ছিলেন। পদত্যাগের মধ্য দিয়ে আবদুর রাজ্জাক জামায়াতের সঙ্গে দীর্ঘ তিন দশকের সম্পর্ক ছিন্ন করলেন। পদত্যাগ করা যে কোনো সদস্যের স্বীকৃত অধিকার:জামায়াত ব্যারিস্টার রাজ্জাকের পদত্যাগের ব্যাপারে গণমাধ্যমে একটি বিবৃতি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বিবৃতিতে জানানো হয়, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক জামায়াত থেকে পদত্যাগ করেছেন। এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ডা:শফিকুর রহমান গতকাল শুক্রবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকসহ আমরা দীর্ঘদিন একই সাথে এই সংগঠনে কাজ করেছি। তিনি জামায়াতে ইসলামীর একজন সিনিয়র পর্যায়ের দায়িত্বশীল ছিলেন। তার অতীতের সকল অবদান আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। তিনি বলেন, তার পদত্যাগে আমরা ব্যথিত ও মর্মাহত। পদত্যাগ করা যে কোনো সদস্যের স্বীকৃত অধিকার। বিবৃতিতে শফিকুর রহমান বলেন, আমরা আশা করি তার সাথে আমাদের মহব্বতের সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে। পদত্যাগপত্রে যা আছে: যুক্তরাজ্যের এসেক্সের বারকিং থেকে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক জামায়াতের আমির মকবুল আহমদের কাছে পাঠানো চার পৃষ্ঠার দীর্ঘ চিঠিতে জামায়াতের রাজনীতি থেকে বিদায় নেয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে: একাত্তরের ভূমিকার জন্য দলটির ক্ষমা না চাওয়া, দলটির নাম পরিবর্তন না করার বিষয়ে শীর্ষ নেতাদের অনড় অবস্থান, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের সংস্কার করতে না পারা ইত্যাদি। পদত্যাগপত্রে ব্যারিস্টার রাজ্জাক লিখেছেন- জামায়াতে যোগ দেয়ার পর থেকে তিনি দলের ভেতর থেকে সংস্কারের চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিন দশক ধরে তিনি সে চেষ্টাই করে গেছেন। কিন্তু জামায়াত তার কথা শোনেনি। তাই তিনি হতাশ। এমতাবস্থায় পদত্যাগের পথ বেছে নিয়েছেন। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও দলের নেতারা ’৭১-এর ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইতে পারেননি। এমনকি মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ প্রসঙ্গে দলের অবস্থানও জাতির সামনে ব্যাখ্যা করতে পারেননি। পদত্যাগপত্রে তিনি লিখেছেন, গত প্রায় তিন দশক তিনি জামায়াতকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, ’৭১-এ দলের ভূমিকা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হওয়া উচিত এবং ওই সময়ে জামায়াতের ভূমিকা ও পাকিস্তান সমর্থনের কারণ উল্লেখ করে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। ব্যারিস্টার রাজ্জাক মনে করেন উপমহাদেশে জামায়াতের রাজনীতির ঐতিহ্য প্রশংসার দাবি রাখে। দলটি ৬০-এর দশকে সব সংগ্রামে যেমন অংশ নিয়েছে, তেমনি ৮০-র দশকে আট দল, সাত দল ও পাঁচ দলের সঙ্গে যুগপত্ভাবে গণতান্ত্রিক সংগ্রামে অংশ নিয়েছে। কিন্তু জামায়াতের এসব অবদান একটি ভুলের জন্য গণমানুষের কাছে স্বীকৃতি পায়নি। ’৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তখনকার নেতাদের ভুল রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে জামায়াত অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা পরবর্তীকালে জামায়াতের সব সাফল্য ও অর্জন ম্লান করে দিয়েছে বলে মনে করেন আবদুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন ৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জামায়াতের ক্ষতিকর ভূমিকা সম্পর্কে ভুল স্বীকার করে জাতির সঙ্গে সে সময়ের নেতাদের পক্ষ থেকে ক্ষমা চেয়ে পরিষ্কার অবস্থান নেয়া জরুরি। ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক চিঠিতে তিনি লেখেন- ‘২০০১ সালে জামায়াতের সেই সময়ের আমির (মতিউর রহমান নিজামী) এবং সেক্রেটারি জেনারেল (আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ) মন্ত্রী হওয়ার পর বিজয় দিবসের আগেই ১৯৭১ নিয়ে বক্তব্য দেয়ার জন্য তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন। তখন একটি কমিটি এবং বক্তব্যের খসড়াও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি। দলীয় ফোরামে এ বিষয়ে নিজের অবস্থান বারবার পরিষ্কার করেছেন জানিয়ে ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘২০০৫ সালে কর্মপরিষদের বৈঠকেও তিনি প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন এবং ২০০৭-০৮ সালে জরুরি অবস্থার সময়েও তিনি জামায়াতকে বোঝানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরে ২০১১ সালে মজলিসে শূরার সবশেষ প্রকাশ্য অধিবেশনেও তিনি বিষয়টি তুলে ধরেন। বর্তমান আমীরকেও একই ইস্যুতে বক্তব্য দেয়ার অনুরোধ করেন আবদুর রাজ্জাক। এমনকি মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে জাতির কাছে দলের পক্ষ থেকে ক্ষমা চেয়ে একটি খসড়া বক্তব্য লিখে আমিরে জামায়াতকে দেন তিনি।

[gs-fb-comments]