নবীনগর উপজেলার লহরি গ্রামে পিতার মৃত্যুর বিচার চেয়ে আদালতে মামলা করায়, আসামিরা ক্ষিপ্ত হয়ে মামলার বাদী মৃতের ছেলেকেও প্রাণনাশের হুমকী দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে পিতৃহীন ওই অসহায় ছেলে নিজের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে মামলার পর এবার নবীনগর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী (জিডি) করেছেন। মামলার এজাহার ও এলাকাবাসি সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার রসুল্লাবাদ ইউনিয়নের লহরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি নতুন ভবন নির্মাণের লক্ষ্যে ওই বিদ্যালয়ের একটি পুরাতন জরাজীর্ণ ভবন অপসারণরে জন্য সম্প্রতি সরকারিভাবে নিলাম ডাকে উপজেলা শিক্ষা অফিস। ওই নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে সেটি লাভ করে ওই বিদ্যালয়েরই পরিচালনা পরিষদের সভাপতি সুমন আহমেদের ভাই মনির হোসেন। সরকারি সেই নিলাম অনুযায়ি অবশেষে মনিরকেই ভবনটি অপসারণের জন্য কার্যাদেশ প্রদান করে উপজেলা শিক্ষা অফিস। কিন্তু অভিযোগ পাওয়া যায়, ওই নিলামে কেবল বিদ্যালয়ের পুরাতন ও জরাজীর্ণ ভবনটির নিলাম ডাকা হলেও, ওই বিদ্যালয়ের সভাপতি সুমন আহমেদ জালিয়াতির মাধ্যমে একই স্মারক নম্বরে ওই নিলামের অনুরূপ আরেকটি নতুন কাগজ (নিলামের) তৈরী করে সেখানে ভবন অপসারণের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের ছয়টি মূল্যবান প্রাচীন গাছ কাটারও অন্তর্ভূক্তি দেখায় ওই নিলামে। এলাকাবাসি জানান, শিক্ষা অফিসের ডাকা নিলামের কাগজপত্রে গাছ কাটার কোন কথা উল্লেখ না থাকলেও, সুচতুর সুমন আহমেদ জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে ভবন অপসারণের পাশাপাশি ছয়টি মূল্যবান গাছ কাটার কার্যাদেশও তারা পেয়েছে বলে এলাকাবাসিকে জানায়। লোকজন জানান, গত ৬ ফেব্রুয়ারি লক্ষাধিক টাকা মূল্যের ওই ছয়টি গাছ ওই গ্রামেরই দরিদ্র আবদুল জব্বার মিয়ার কাছে নগদ ৬৫ হাজার টাকায় বিক্রী করে দেয় সুমন। পরে সুমন মিয়ার নেতৃত্বে ওই গাছ কাটতে গেলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিলামে গাছ কাটার কোন উল্লেখ নেই বলে গাছগুলো কাটতে বাঁধা দিলে জালিয়াতির বিষয়টি তখন প্রকাশ পায়। সে সময়ে গাছ কাটতে না পেরে সুমন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে মারাত্মক দুর্বব্যহার ও অশোভন আচরণ করেন। এ ঘটনা এলাকার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে ও গাছগুলো কাটতে না পেরে গ্রামের দরিদ্র আবদুল জব্বার তার দেয়া নগদ ৬৫ হাজার টাকা বিদ্যালয়ের সভাপতি সুমন আহমেদের কাছে ফেরত চান। কিন্তু সুমন আহমেদ টাকা ফেরত না দিয়ে উল্টো আবদুল জব্বারের সঙ্গেও প্রচন্ড দুর্ব্যবহার করে টাকা ফেরত দেয়া হবেনা বলে সাফ জানিয়ে দেন। এ অবস্থায় আবদুল জব্বার বাড়িতে গিয়ে ওই রাতেই (৬ ফেব্রুয়ারি) অপমান সহ্য করতে না পেরে কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যা করেন। এদিকে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুস সামাদ জালিয়াতির বিষয়টি লিখিত আকারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানালে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মাসুম গত ৭ ফ্রেবুয়ারি বিদ্যালয়ের সভাপতি সুমন আহমেদকে তাঁর (ইউএনও) কার্যালয়ে তলব করে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হয়ে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে সুমনকে নগদ ২ লাখ টাকা জরিমানা করেন। এদিকে আত্মহত্যা করা আবদুল জব্বারের ছেলে আক্তার হোসেন বাদী হয়ে গত বৃহস্পতিবার (১৪/০২/১৯) ব্রাহ্মণবাড়িয়া সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ এনে সুমন আহমেদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। কিন্তু মামলাটি দায়ের করার পর সুমন আহমেদ সেটি প্রত্যাহারের জন্য মৃতের ছেলে মামলার বাদীকে হুমকী দেয়া হচ্ছে বলে সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন আক্তার । এ বিষয়ে নিজের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে আক্তার হোসেন নবীনগর থানায় শুক্রবার (১৫/০২/১৯) একটি সাধারণ ডায়েরীও (জিডি) করেন। এ বিষয়ে বাদী আক্তার হোসেন বলেন,‘আমার দরিদ্র বাবা সুদে টাকা এনে বিদ্যালয়ের সভাপতির কথামতে ৬৫ হাজার টাকায় গাছগুলো কিনে সুমন সাহেবের হাতে টাকাগুলো বুঝিয়ে দেন। কিন্তু গাছ কাটতে না পেরে প্রদেয় টাকা ফেরত চাইতে গেলে স্কুলের সভাপতি সুমন সাহেব বাবার সঙ্গেও প্রচন্ড দুর্বব্যহার করে আমার বাবাকে ‘আত্মহত্যা’ করতে প্ররোচনা দেন। তাই আমি এর বিচার চেয়ে আদালতে মামলা করেছি। এখন মামলা প্রত্যাহারের জন্য আমাকে প্রাণনাশের হুমকী দেয়ায় নবীনগর থানায় একটি জিডিও করেছি।’ এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের সভাপতি সুমন আহমেদ সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,‘এসব সাজানো নাটক। আমার বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্র। একটি মহল এসব অপপ্রচার করছে।’ তাহলে ২ লাখ টাকা জরিমানা দিলেন কেন? এ প্রশ্নের জবাবে নিজেকে স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা দাবি করে সুমন আহমেদ বলেন‘গ্রামের একটি রাজনৈতিক মহল আমার ইমেজকে নষ্ট করতে প্রশাসনকে দিয়ে আমার বিরুদ্ধে ২ লাখ টাকা জরিমানা করিয়েছে। আমি ইতিমধ্যে জরিমানার টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে দিয়েও দিয়েছি। এ নিয়ে এখন আর কোন ঝামেলা নেই।’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মাসুম বলেন,‘আত্মহত্যার ঘটনা আমার জানা নেই। তবে যেহেতু এটি আইনী প্রক্রিয়ায় আছে, আইনেই তার সমাধান হবে। তবে গাছ কাটা নিয়ে জ্বালিয়াতির সত্যতা পাওয়ায় বিদ্যালয়ের সভাপতি সুমন মিয়াকে ২ লাখ টাকাy জরিমানা করেছি।’ মামলার বাদী আক্তারের আইনজীবি কাজী আজিজুর রহমান বলেন,‘বিজ্ঞ আদালত মামলাটি তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলে ইউডি মামলার সঙ্গে এ মামলাটিকেও সম্পৃক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নবীনগর থানাকে নির্দেশ দিয়েছেন। যার কপি রোববার (১৭/০২/১৯) নবীনগর থানায় যাবে।’ নবীনগর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) রাজু আহমেদ এ প্রতিবেদককে বলেন,‘আদালতের কাগজপত্র এখনও পাইনি। তবে পেলে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ি অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আক্তারের জিডির বিষয়টিও পুলিশ তদন্ত করে দেখছে।