দেশের প্রথম শহীদদের মনে রাখিনি: শেখ রফিক

24 February, 2019 : 6:26 pm ১০০

একুশের ইতিহাস যেমন আমাদের গর্ব ও অহংকারের ইতিহাস, তেমনি প্রাক-বায়ান্ন রাজনৈতিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক হত্যাকা-ও একই ধরনের ইতিহাস, যা একুশের পূর্বচেতনার প্রতীক। একুশের মাসে, একুশের বর্ণাঢ্য উদযাপনের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা গণতান্ত্রিক-প্রগতিবাদী পূর্বসংগ্রামের বিশেষ ঘটনা স্মরণ করতে চাই, তাতে একুশের মর্যাদা বাড়বে বই কমবে না’…. আহমদ রফিক, ভাষাসৈনিক, গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কবি। ১৯৪৮-৫০ সাল। দেশব্যাপী চলেছিল পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর সন্ত্রাসের রাজত্ব। জনতার অন্ন, বস্ত্র এবং গণতান্ত্রিক অধিকার বুলেটের মাধ্যমে স্তব্ধ করা হয়েছিল। এই জুলুম, নির্যাতনে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল এদেশের শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, মধ্যবিত্ত এবং সাধারণ মানুষ। জনগণের দাবী-দাওয়া ও গণতান্ত্রিক অধিকার সংরক্ষণের সংগ্রামকে সার্থক করে তোলার জন্য যে সমস্ত দেশপ্রেমিক কমিউনিস্ট নেতা-কর্মী এগিয়ে এসেছিলেন তাদের বিরুদ্ধে গৃহীত হয়েছিল চরম নির্যাতন মূলক ব্যবস্থা। ফলে তাঁদের ওপর নির্যাতন বাড়তে থাকে, ধরে ধরে জেলে ভরা হয় কমিউনিস্ট নেতা-কর্মীদের। ভরে যায় পূর্ববাংলার কারাগারগুলো। ব্রিটিশ সরকার রাজবন্দীদের বিশেষ মর্যাদা দিতে বাধ্য হলেও, মুসলিম লীগ সরকার সেই মর্যাদা তুলে নেয় এবং রাজবন্দীদের ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ বলে বিবেচনা করে। জেলের সাধারণ কয়েদীদের সাথে পশুর মতো আচরণ করা হতো। তাদেরকেও দিয়ে জেলের ঘানিও টানানো হতো। অত্যাচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে জেলের মধ্যেই আন্দোলন শুরু করেন কমিউনিস্ট বন্দীরা। এই নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা রাজবন্দীরা মাথা পেতে গ্রহণ করেননি। এর বিরুদ্ধে তাঁরা আন্দোলন করছেন। ঢাকা ও রাজশাহী জেলে আটক রাজবন্দীরা ১৯৪৯ সালে চারবার প্রথম ৩০ দিন, দ্বিতীয়বার ৪১ দিন, তৃতীয়বার ৪৯ দিন এবং পরিশেষে ৬১ দিন অনশন ধর্মঘট করেছিলেন। অনশন ধর্মঘটের মুখে সরকার রাজবন্দীদের দাবী মেনে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও বার বার তা ভঙ্গ করেছে। ১৯৪৮-৫০ সালে রংপুরের কালিপদ দে, গাইবান্ধার খালেক, চট্টগ্রামের ধীরেন শীল, যশোরের ফরিদদ্দার পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। পাগল অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন যশোরের লুৎফর রহমান। পাকিস্তানী শাসকবর্গের এসকল অত্যাচার রাজবন্দীদের স্তব্ধ করতে পারেনি। ১৯৪৯ সালে রাজবন্দীরা আমরণ অনশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। জেল কর্তৃপক্ষ বলপূর্বক রাজবন্দীদের খাওয়ানোর চেষ্টা করত। ১০ই ডিসেম্বর ঢাকা জেলে অনশনরত রাজবন্দী শিবেন রায়কে জোর করে দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু দুধ শিবেন রায়ের পাকস্থলীতে না গিয়ে ফুসফুসে প্রবেশ করে। জেল কর্তৃপক্ষ এদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে তাঁকে ৬নং সেলে তালাবদ্ধ করে রেখেছিল। রাত্রে শিবেন রায় মৃত্যুবরণ করেন। শিবেন রায়ের মৃত্যুর পর ১৯৫০ সালে রাজবন্দীদের আংশিক দাবী পূরণ হয়। ১৯৫০ সালের এপ্রিল মাসে রাজশাহী জেলের সাধারণ কয়েদীরা অনশন শুরু করলে, কমিউনিস্ট বন্দীরাও যোগ দেন। ঘানি টানানো হবে না, ভালো খাবার দেওয়া হবে- এই আশ্বাসের ভিত্তিতে ১৪ এপ্রিল অনশন প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু এরপর থেকে কমিউনিস্ট বন্দীদের ওপর জুলুম বাড়তে থাকে। ২১ এপ্রিল রাজবন্দীদের প্রতিনিধি কমরেড আব্দুল হক আর কমরেড বিজন সেনকে ধমক দিয়ে জানিয়ে দেয়া হয়, শাস্তি হিসেবে ১০ জন বন্দীকে কনডেমনড্ সেলে স্থানান্তর করা হবে। এই শাস্তিমূলক আদেশ প্রত্যাখ্যান করেন খাপড়া ওয়ার্ডের কমিউনিস্ট বন্দীরা। এরপর ২২ ও ২৩ এপ্রিল রাজবন্দীরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন কয়েক দফা। ২৪ এপ্রিল সকালে কমরেড কম্পরাম সিং তেজদীপ্তভাবেই বলেন, ‘শাস্তি আমরা মানবো না- সেলে আমরা যাবো না, নিতে এলে বাধা দেবো।’ তাঁর এই বক্তব্য সিদ্ধান্ত হিসেবে গৃহীত হয়। ২৪ এপ্রিল সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে, রাজশাহী জেল সুপারিন্টেনডেন্ট এডওয়ার্ড বিল দলবল নিয়ে হঠাৎ করেই খাপড়া ওয়ার্ডে ঢুকে পড়েন এবং কমরেড আব্দুল হকের সঙ্গে কথা বলতে থাকেন। বিল সাহেব যে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়েই ওয়ার্ডে ঢুকেছেন, সেটা কারো বুঝতে অসুবিধা হয় না। এক পর্যায়ে ‘কমিউনিস্টরা ক্রিমিনাল’ বলে গালি দিতে দিতে বিল ওয়ার্ড থেকে বের হয়েই দরজা বন্ধ করার নির্দেশ দেন। বিল বাঁশি বাজানোর সঙ্গে সঙ্গেই পাগলা ঘণ্টা বাজতে শুরু করে। বিল এবার গুলি চালাতে নির্দেশ দেন। বাঁশ দিয়ে জানালার কাঁচ ভেঙে, জানালার ফাঁকের মধ্যে বন্দুকের নল ঢুকিয়ে গুলি করতে থাকে সিপাহীরা। রক্তে ভেসে যায় খাপড়া ওয়ার্ড। রাজবন্দীরা চিৎকার করে দরজা খুলে দিতে বলেন। দরজা খুলতেই সিপাহী ও কয়েদী পাহারা মেটরা, আহত-নিহত নির্বিশেষে সবাইকে পেটাতে শুরু করে। ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজশাহী জেলের ‘খাপড়াওয়ার্ডের রাজবন্দীদের ওপর গুলি চালানো হয়েছিল তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকারের মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনের নির্দেশ মতো। শুধু গুলি নয়, বন্দীদের ওপর লাঠিচার্জও করা হয়েছিল। আহতদের মধ্যে যারা পানি পানি বলে চিৎকার করেছিলেন, পানির বদলে তাঁদের মুখে প্রস্রাব করে দেয়া হয়েছিল। সেদিন সর্বমোট ষাট রাউন্ড গুলি চালানো হয়েছিল এবং ঘটনাস্থলে যাঁরা শহীদ হয়েছিলেন তাঁরা হলেন হানিফ শেখ, আনোয়ার হোসেন, সুখেন ভট্টাচার্য, দেলোয়ার হোসেন, সুধীন ধর, কম্পরাম সিং ও বিজন সেনসহ মোট ৭ জন; বাকিরা সবাই আহত হয়েছিলেন। বীর শহীদদের পরিচিতি কম্পরাম সিং দিনাজপুরের সর্বজন প্রিয় কৃষক নেতা, ঠাকুরগাঁও মহকুমার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামে তার বাড়ী। ১৯২১-২২ সনে যুবক বয়স থেকেই রাজনৈতিক জীবন শুরু। ১৯৩০-৩২ সনে প্রথমবারের মত কারা বরণ করেন। ১৯৪৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য হন। পাকিস্তান সৃষ্টির পর কৃষক আন্দোলন করার অপরাধে ১৯৪৮ সালের শেষভাগে গ্রেফতার হন। আনোয়ার হোসেন ছাত্রনেতা আনোয়ার হোসেন কলেজ জীবনেই কমিউনিস্ট পার্টির সভ্যপদ লাভ করেন। আনোয়ার ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। বাল্যকালেই তিনি পিতাকে হারান। স্কুল জীবন থেকেই তিনি ছাত্র ফেডারেশনের সাথে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫০ সনে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তখন তিনি দৌলতপুর কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। সুধীন ধর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের বীর সেনানী সুধীন ধর। ১৯৩০ সালেই তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগদান করেন। সে অপরাধে একটানা দীর্ঘদিন কারাগারে বন্দী থাকেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়র পরে ত

[gs-fb-comments]