২০১৭ সালের আগস্টে নিরাপত্তা বাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে হামলার পর রাখাইনে পূর্ব পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। নিপীড়নের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ওই অভিযানে জাতিগত নিধনযজ্ঞের আলামত পেয়েছে। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফেরাতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার চুক্তি করলেও এখনও শুরু হয়নি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া।‍

সুন গোজিয়াংয়ের নেতৃত্বে গত ২ মার্চ রাতে ঢাকায় আসে প্রতিনিধিদলটি। কক্সবাজার রোহিঙ্গা ও অন্যান্যদের সাথে সভা করে মঙ্গলবার ঢাকা ত্যাগ করে। সেসময় কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে রবিবার ২৯ জন রোহিঙ্গা নারী-পুরুষের সাথে বৈঠক করেন তিনি।

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের ব্যানারে তারা এ বৈঠকে অংশ নেয়। সংগঠনটির চেয়ারম্যান মুহিব উল্লাহ বেনারকে বলেন, “চীনা প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে আমরা বিভিন্ন ক্যাম্পের ২৯জন নারী পুরুষ উপস্থিত ছিলাম।”  রোহিঙ্গারা বলেছেন, রোহিঙ্গা হিসাবে নাগরিকত্ব না দিলে এবং প্রত্যাবাসনের আগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা হলে তারা রাখাইনে ফিরে যেতে রাজি নন।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অনুবিভাগের মহাপরিচালক দেলোয়ার হোসেন বেনারকে বলেন, ‘চীনা সরকারের প্রতিনিধির সাথে রোহিঙ্গাদের সভা সম্পর্কে আমরা অবগত। আমরাই সভাটি করার ব্যবস্থা করে দিয়েছি।’ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অনুবিভাগের পরিচালক আলাউদ্দীন ভূঁইয়া সংবাদমাধ্যম বেনারকে জানান, সুনের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের চীনা প্রতিনিধিদলের মধ্যে ছিলেন চীনের মিয়ানমার দূতাবাসের দুই কর্মকর্তা, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুই কর্মকর্তা এবং ঢাকা দূতাবাসের এক কর্মকর্তা।

চীনের যত আশ্বাস

মুহিব বলেন, ‘প্রতিনিধিদলের প্রধান আমাদের বলেছেন- তারা আমাদের ভিটে দেবেন, রাখাইনে বসবাসের জন্য বাড়ি-ঘর তৈরি করে দেবেন এবং ফিরে যেতে রাজি হলে প্রতি পরিবারকে পাঁচ থেকে ছয় হাজার ডলার অর্থ সহায়তাও দিবেন।’

একই সংগঠনের সেক্রেটারি ছৈয়দ উল্লাহ বেনারকে বলেন, “তারা প্রথমেই এসে আমাদের কাছে জানতে চান, প্রতি পরিবারকে পাঁচ-ছয় হাজার ডলার দিলে মিয়ানমারে ফিরে যাব কিনা। তাদের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে আমরা বলেছি, আমাদের স্বীকৃতি এবং নাগরিকত্ব দেওয়াসহ সকল দাবি পূরণ না হলে আমরা কোনোভাবেই ফিরে যাব না। টাকা দিয়ে আমাদের কেনা যাবে না।’ তিনি আরও বলেন, “মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের উপর ধারাবাহিকভাবে নির্যাতন চালিয়ে আসছে। আমরা এখন তাদের আর বিশ্বাস করতে পারি না। তাই আমরা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার কথা বলেছি। প্রয়োজনে চীনও সেখানে থাকতে পারে।”

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশি এক কর্মকর্তা বেনারকে জানান, বাংলাদেশে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের জন্য রাখাইনে দুই লাখ ঘরবাড়ি তৈরি করতে হবে। তবে খুব দ্রুত এত ঘরবাড়ি নির্মাণ করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘মূলত এ কারণে চীনা প্রতিনিধি অর্থ দেওয়ার কথা বলেছেন যাতে রোহিঙ্গারা নিজেরা তাদের ঘরবাড়ি তৈরি করে নেয়।’ বাংলাদেশে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের শতকরা ৫০ ভাগ পরিবারে কোনো পুরুষ নেই বলে উল্লেখ করেন বাংলাদেশি ওই কর্মকর্তা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক দেলোয়ার হোসেন বলেন, “আমরা আশা করি আঞ্চলিক শক্তিশালী দেশ হিসাবে এবং মিয়ানমারের সাথে বিশেষ সম্পর্কের কারণে রাখাইনের পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে মিয়ানমারকে রাজি করাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে চীন।

বিশ্লেষকেরা যা বলছেন

চীনে দায়িত্ব পালন করা বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফায়েজ বেনারকে বলেন, “রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিকভাবে সুরক্ষা দিচ্ছে চীন। কিন্তু মিয়ানমার যে অবস্থা সৃষ্টি করেছে তাতে চীন হয়তো ভবিষ্যতে মিয়ানমারকে আর আন্তর্জাতিক চাপ থেকে রক্ষা করতে পারবে না। সে কারণে চীন সরকার তাদের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে ভূমিকা রাখতে চাইছে।’ চীন রাখাইনে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করার উদ্যোগ নিয়েছে উল্লেখ করে এই কূটনীতিক বলেন, “যদি রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান না হয় তাহলে তারা তাদের পরিকল্পিত অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করতে পারবে না।”

তার মতে, রোহিঙ্গাদের বের করে দেয়ার পর রাখাইনের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষরাও ভালো নেই। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য চীনকে রাখাইনে তাদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের ধারণা, চীন রাখাইন ইস্যুতে সমঝোতার কথা বললেও কখনোই মিয়ানমারকে চাপ দেবে না। কারণ বাংলাদেশের চেয়ে মিয়ানমারের সাথে চীনের স্বার্থটা অনেক বেশি।

বেনার নিউজকে দেওয়া সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, ‘এটা নিশ্চয় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির ব্যর্থতা যে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনকে আমরা এখনও পক্ষে আনতে পারিনি।

এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেনও বেনারকে বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে এখন অবধি চীন তাদের মূল অবস্থানটা পরিবর্তন করছে না। কারণ তারা মনে করছে যে, মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি হলে সেখানে চীনের যে বিশাল স্বার্থ আছে তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের ঘটনাকে জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র  জাতিগত নিধনযজ্ঞ বলে আখ্যা দিলেও মিয়ানমারকে সমর্থন দিয়ে আসছে চীন। সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ওই অভিযান চালানো হয়েছে বলে করা মিয়ানমারের দাবিকে সমর্থন করছে এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি চীন। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এ নিয়ে যে পদক্ষেপই নিতে চেষ্টা করুক না কেন, তাতে বাধ সাধে স্থায়ী সদস্য চীন, তার সাথে রাশিয়াও।