বাংলাদেশের বর্তমান নারী-আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী সুতপা বেদজ্ঞ । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করেছেন বাংলায় মাস্টার্স । খুব আন্তরিক ও উন্নত মনের অধিকারী । ‘কোন্ পথে নারীমুক্তি’ এ-বিষয়ে লিখেছেন সময়োপযোগী একটি লেখা । বর্তমান সময়ে তাঁর এ-চমৎকার লেখাটি নারীদের দেখাবে পথের দিশা ।

নারীমুক্তি আন্দোলনের ইতিহাস খুব বেশিদিনের নয়। কয়েক হাজার বছর পূর্ব থেকেই নারীর বন্দিদশা শুরু হয়েছে যা এখনও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিদ্যমান । আজও নারী বিশ্ব দেখে পুরুষের চোখে । নারী বেড়ে ওঠে পুরুষের স্বপ্ন পূরণে । নারী নিজেকে প্রস্তুত করে পুরুষের কাছে উপস্থাপনার জন্য । হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা ও ব্যবস্থার শেকড় এতই গভীরে প্রোথিত যা থেকে সহজে বেরিয়ে আসা সম্ভবপর নয়। এ-অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রথম এগিয়ে আসতে হবে নারীকেই ।

কীভাবে এ-ব্যবস্থার পরিবর্তন সম্ভব? যে কোনো পরিবর্তনের কাজ শুরু করার পূর্বে কিছু সুনির্দিষ্ট সূচক ঠিক করে নেওয়া অত্যাবশ্যক । তা না-হলে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো কখনোই সম্ভবপর হয় না । সূচকগুলি হতে পারে – ১. নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সমানাধিকারের বাস্তবায়ন। ২. নারীর সাংস্কৃতিক মুক্তি – যেমন পুরুষতান্ত্রিক প্রথাগত সংস্কৃতি থেকে মুক্তি; পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক মনস্তত্ব থেকে মুক্তি; আত্মপরিচয় সংকট থেকে মুক্তি; প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন থেকে মুক্তি; ধর্মীয় অনুশাসন থেকে মুক্তি ইত্যাদি ।

এই সূচকগুলি অর্জনের উপায় কী? নারী কি সত্যিই পুরুষের অধস্তন এবং এসব থেকে তার ভেতরে কী মুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা জাগে? যখন একজন নারীর মনে এ-ধরনের প্রশ্নের উদয় হবে, তখনই সে তার উত্তর খুঁজতে শুরু করবে, সমাধানের পথও তার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে । মানুষের মধ্যে প্রশ্ন করার ও উত্তর খোঁজার প্রবণতা সহজাত। কিন্তু গতানুগতিকতা মানুষকে করে ফেলে গতিহীন । এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ আমরা দেখতে পাই ভারতীয় উপমহাদেশের নারীচরিত্রের মধ্যে । অনেক নারী আছেন যারা তার ব্যক্তিসত্তাকে বিকশিত করতে চায় না। অনেক প্রতিভার অধিকারী হয়েও মাতৃত্বের বা তথাকথিত নারীত্বের পরিচয় নিয়েই আত্মতৃপ্তিতে থাকেন । দীর্ঘদিন পুরুষতান্ত্রিক প্রথাগত সংস্কৃতিচর্চার ফলে অধিকাংশ নারী এতই গতিহীন হয়ে পড়েছে যে নিজের কাছে প্রশ্ন করার সামর্থ্য পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছে।
নৃ-তত্ত্ব থেকে আমরা কি জানি ? পৃথিবীতে একটা সময় জীবনযাত্রার চাবিকাঠি নারীর হাতেই ছিলো । নারীকে তার এই গৌরবময় ইতিহাস থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে । প্রায় সাত হাজার বছর আগে যখন কৃষিব্যবস্থা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে প্রবর্তিত হলো, তখন থেকে এই জাগতিক অগ্রগতির পরিবেশে মানুষের ধর্মীয় কল্পনারও অনেক পরিবর্তন আরম্ভ হলো । নারী ও ভূমির উৎপাদন-ক্ষমতা লক্ষ করে নারী এবং পৃথিবীকে অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন দেবীরূপে কল্পনা করা হলো (প্রাচীন মিশরে অবশ্য প্রথমে আকাশকে নারীরূপে কল্পনা করা হয়েছিলো) । নারী ও দেবীদের ধর্মীয় গুরুত্ব মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও কৃষির উদ্ভবের সঙ্গে জড়িত ছিলো । নারীর এই পারিবারিক সামাজিক প্রাধান্যের মূলে তার জন্মদানের ক্ষমতা ছাড়াও ছিলো আদিম কৃষিব্যবস্থায় তার অবদান, বাড়ি তৈরিসহ মেরামত, শিশু রক্ষণাবেক্ষণ, এমনকি অনেক সময় আত্মরক্ষার জন্য নারীর যুদ্ধ করতে হতো তার সামর্থ্যের মধ্যে । মাতৃ-অধিকারের এই যুগে সন্তান-ধারণ, প্রতিপালন ইত্যাদি নারী-অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেনি ।

কীভাবে নারী-অধীনতার শুরু? পুরুষের সাথে নারীর অধীনতার সম্পর্ক শুরু হয় দাসব্যবস্থার আগে আগে । ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব ও পুরুষের মালিকানাধীন এই ব্যক্তিগত সম্পত্তির উপর গড়ে ওঠা পরিবারই নারীর পরাধীনতা সূচিত করে । আর পুরুষতান্ত্রিক আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা নারীর এই অধঃস্তনতাকে পাকাপোক্ত করে স্থায়ী রূপ দেয় । ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভবের পরেই নারী পুরুষের সম্পর্কের মধ্যে এক বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয় । সন্তানদের পরিচয় মায়ের দিক থেকে না-হয়ে পিতার দিক থেকে হওয়া শুরু হয় । এঙ্গেলস এটাকে বলেছেন, মাতৃ-অধিকার উচ্ছেদ । এর ফলে পরিবারে নারীর অবস্থানের এক মৌলিক পরিবর্তন হয় । নারী পরিণত হয় এক দাসে যার কাজ হয়ে দাঁড়ায় সন্তান-উৎপাদন ও সংসার দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করা । অনেককেই নারী পুরুষের অসমতার প্রাকৃতিক ভিত্তি হিসেবে নারীর গর্ভকালীন ও সন্তান জন্মের পর তার শারীরিক সীমাবদ্ধতার কথা বলেন । কিন্তু মাতৃ-অধিকার উচ্ছেদ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তো শারীরিক ও জৈবিক পার্থক্য নারী পুরুষের মধ্যে বৈষম্যের সৃষ্টি করেনি । আসলে শারীরিক পার্থক্য থেকে বৈষম্যের উদ্ভব হয়নি, সামাজিক কারণেই শারীরিক পার্থক্যকে বৈষ্যম্যরূপে দেখা হয়েছে। তাই বৈষম্যের সামাজিক ভিত্তি ভেঙে ফেলতে পারলে মানুষ বিজ্ঞান-প্রযুক্তির ব্যবহার এমনভাবে করতে সক্ষম হবে যখন জৈবিক পার্থক্য কোনো সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারবে না ।
নারী পুরুষের সামাজিক বৈষম্যের ভিত্তিগুলি তাহলে কী ? নারী পুরুষের সামাজিক বৈষম্যের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হচ্ছে অর্থনীতি । প্রথমদিকে অর্থনীতি নারী-পুরুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেনিশ। কিন্তু পরবর্তী ঐতিহাসিক পর্বে তার ভূমিকা বাড়তে থাকে । একমাত্র না-হলেও বর্তমানে অর্থনৈতিক অসমতাই নারী পুরুষ বৈষম্যের মূল ভিত্তি । নারী সামাজিক শ্রমে অর্থাৎ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিলে তার স্বাবলম্বিতা অর্জিত হয় যা তাকে সমাজে ও পরিবারের অভ্যন্তরে বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অধিক শক্তি জোগায় । কিন্তু নারী সামাজিক উৎপাদনের জগতে চলে এলেই নারীমুক্তি হয়ে যায় না । যেমন- উন্নত পুঁজিবাদী সমাজে অধিকাংশ নারীর একটি স্বাধীন অর্থনৈতিক জীবন নিশ্চিত হওয়ার পরেও নারী পুরুষ সম্পর্কের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য দূর হয়নি । এ থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, অর্থনৈতিক অবস্থা নারীকে পুরুষের উপর নির্ভর করে রাখলেও অর্থনীতির বাইরেও এমন কিছু ভিত্তি আছে যা নারী-পুরুষ সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভূমিকা রাখে । ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতি দূর করতে না-পারলে অর্থনৈতিক সমতা আনার পরেও নারী পুরুষ বৈষম্যের অবসান ঘটে না । এমনকী পুরুষ-শাসিত সমাজে সাধারণভাবে সংসার ধর্ম সম্বন্ধে যে সকল সামাজিক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ গড়ে ওঠে, পুঁজিবাদী ব্যক্তিগত সম্পত্তি উচ্ছেদের পরে সমাজতন্ত্রের প্রাথমিক পর্বেও সেসব মূল্যবোধ কিছুটা হলেও টিকে থাকে । কারণ পুঁজিবাদ যখন সমাজতন্ত্র দ্বারা বাতিল হয় তখন পুঁজিবাদের কিছু নেতিবাচক সাংস্কৃতিক জেরও সমাজতন্ত্রে স্থানান্তর হয় । সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও অর্থনৈতিক শোষণ উচ্ছেদের সাথে সাথে সমাজতন্ত্রের উচ্চতর মানবিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় না । কারণ ইতিহাসে অর্থনৈতিক ভিত্তিকাঠামো পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে উপরি কাঠামোর সংস্কৃতিগত বিষয়গুলি পরিবর্তিত হয় না, বিশেষ করে আচরণগত সংস্কৃতি পরিবর্তিত হয় ধীরে ধীরে।

উপরের আলোচনা থেকে এ-বিষয়গুলি স্পষ্ট যে, ১. সন্তানের পরিচয় যখন মায়ের দিক থেকে হতো তখন শারীরিক ও জৈবিক পার্থক্য নারী পুরুষে কোনো সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টি করেনি । ২. ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব ও পুরুষের মালিকানাধীন ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপর গড়ে ওঠা পরিবারই নারীর পরাধীনতা সূচিত করে । ৩. নারী পুরুষের সামাজিক বৈষম্যের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হচ্ছে অর্থনৈতিক অসমতা । ৪. ব্যক্তিগত সম্পত্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকা উন্নত পুঁজিবাদী দেশে অধিকাংশ নারীর একটি স্বাধীন অর্থনৈতিক জীবন নিশ্চিত হওয়ার পরেও নারী পুরুষ সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্য দূর হয়নি। ৫. ব্যক্তিগত সম্পদের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা পুঁজিবাদী সমাজ ভেঙে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেই রাতারাতি নারী পুরুষের বৈষম্য দূর হয়ে যায় না। নারীর সামগ্রিক মুক্তির ভিত্তি তৈরি হয় মাত্র । ৬. সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও অর্থনৈতিক শোষণ উচ্ছেদের পর সমাজতন্ত্রের উচ্চতর মানবিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার জন্য হাজার বছরের পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে মতাদর্শিত ও সাংস্কৃতিক সংগ্রাম করতে হয়ষ।

কেবল কতগুলো উদারনৈতিক দাবি-দাওয়া নারীমুক্তির গ্যারান্টি প্রদান করে না । আপনা আপনি নারীমুক্তি অর্জিত হয় না । দরকার হয় নিজস্ব সংগঠনের । বিপ্লবী ধারার নারী-সংগঠন গড়ে তোলা ও আন্দোলনের দায় এড়িয়ে মুক্তি আসবে না । প্রথমত এসব অর্জনের জন্য পুরুষের পাশাপাশি নারীকেই এগিয়ে আসতে হবে । চাপিয়ে দেওয়া পুরুষতান্ত্রিক মনস্তত্ব, প্রথা, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, শোষণ, নিপীড়ন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাই কি না সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবেষ। দ্বিতীয়ত নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্ববালম্বী হওয়ার সংগ্রাম করতে হবে । এটাই তাকে পুঁজিবাদী সমাজে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সমানাধিকারের বাস্তবায়নের সংগ্রামে আত্মপ্রত্যয়ী করে তুলবে । তৃতীয়ত এই শোষণমূলক ও পুরুষতান্তিক সমাজের মধ্যে এখনই তাকে শুরু করতে হবে সাংস্কৃতিক মুক্তির সংগ্রাম । চতুর্থত নারীমুক্তির নিজস্ব গতিশীলতা ও এজেন্ডা বাস্তবায়নের সংগ্রামের পাশাপাশি নারীকে তার সব সংগ্রামকে নিয়ে যেতে হবে নারী পুরুষের বৈষম্যের ভিত্তিমূল পুরুষতান্ত্রিক পুঁজিবাদী শোষণমূলক সমাজব্যবস্থা পরিবর্তনের দিকে । কারণ বৈষম্যের ভিত্তি রয়েছে এই পুরুষতান্ত্রিক পুঁজিবাদী শোষণমূলক সমাজের মধ্যেই । এই শোষণমূলক সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন ছাড়া নারীর পূর্ণ মুক্তি আসবে না । সমাজের অন্যান্য শোষিত ও নিপীড়িত অংশের মুক্তির সংগামের সাথে তার সংগ্রামের যোগসূত্র স্থাপন করে একসাথে এগুতে হবে । একইসাথে অন্যান্য শোষিত, নিপীড়িত অংশকে মুক্ত করা ছাড়া নারী এককভাবে নিজের পূর্ণ মুক্তি অর্জন করতে পারবে না । নারীমুক্তিকে সমগ্র মানবসমাজের মুক্তির অংশ হিসেবে দেখতে হবে । নারীমুক্তির বিষয়টিকে শুধুমাত্র অর্থনীতির মধ্যে নয়, সামগ্রিকভাবে সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মসূচির মধ্যে নিয়ে আসতে হবে এবং সমাজের আমূল বিপ্লবী রূপান্তরের অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে । সমাজতন্ত্রেই নারীমুক্তির প্রকৃত ভিত্তি রচিত হবে। কেবল সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়েই নারীর পূর্ণমুক্তি সম্ভবপর হবে ।