ডেস্ক রিপোর্ট//

বেটি, এটা তো কিছুই না। এর চাইতে আরও কঠিন তপস্যা আছে। শুনলে তোর মাথাটা খারাপ হয়ে যাবে। তপস্যাটা কেমন জানিস? ভোরবেলায় সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে কোন নদী বা গঙ্গায় নেমে তপস্বী দাঁড়িয়ে থাকবে গলাজল পর্যন্ত। অন্তরে জপতে থাকবে ইষ্টনাম জপ। সারাদিন এইভাবে চলতে থাকবে তপস্যা। সন্ধ্যায় সূর্য অস্ত গেলে উঠে আসবে জল থেকে। তারপর গ্রহণ করবে ভগবানের প্রসাদ। প্রতিদিন তাও একবেলা মাত্র। এটা একদিনের ব্রত নয়। নির্দিষ্ট একটা সংকল্প করে এই ব্রত পালন চলে মাসের পর মাস ধরে। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা কোনও ঋতুতেই বন্ধ করা চলবে না সংকল্প করলে। এই তপস্যাকে জলশয্যায় তপস্যা বলে। যারা করেন তাঁদের জলশয্যি তপস্বী বলে।জলশয্যি তপস্বীর কথা শোনামাত্রই মনে পড়ে গেল ২০০০ সালের নভেম্বর মাসের কথা। তখন বয়েস কম ছিল তাই বুঝিনি অত, ভাবিনিও। হরিদ্বারে গিয়ে বেশ কয়েকদিন ছিলাম। একদিন বেলা দশটা নাগাদ গেলাম আনন্দময়ী মায়ের আশ্রমে। পাশে দক্ষরাজ মন্দির। ঘুরতে ঘুরতে গেলাম মন্দিরের পেছনে। জায়গাটা বেশ নিরিবিলি। এক-আধজন লোক রয়েছে নিজের কাজে। পাশে বয়ে চলেছে মা গঙ্গার নীলধারা। ছোট্ট একটা ঘাট। দেখলাম একজন জটাধারী সাধুবাবা চোখবুজে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন গলাজলে। নভেম্বর মাস। বেশ ঠান্ডা। গোটা হরিদ্বার কাঁপছে ঠান্ডায়। ভাবলাম সাধুবাবা স্নান করতে নেমে হয়ত জপ করছেন। আমি ঘাটের কাছে এমনিই বসে রইলাম। দেখতে লাগলাম মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ আর তরতর করে বয়ে যাওয়া গঙ্গার নীলধারা।

এইভাবে কেটে গেল বেশ কিছুক্ষণ। বসে ছিলাম অন্যমনস্ক হয়ে। যখন ঘাট থেকে উঠে আসি তখনও দেখেছিলাম চোখবুজে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন গঙ্গাজলে। তখন তো অত বুঝিনি। মন্দিরের একজনকে সাধুবাবার জলে দাঁড়িয়ে থাকার কথা জিজ্ঞাসা করাতে তিনি বলেছিলেন, উনি জলশয্যি তপস্বী। বহুদিন ধরে আছেন এখানে। ব্যস, এটুকুই। এসব নিয়ে আর কিছু ভাবিনি। ভাববার মতো মনটা তখন আমার ছিল না। শুধু দর্শন হয়েছে মাত্র। আজ সাধুবাবার কথায় জানতে পারলাম কি কঠিন তপস্যারত ছিলেন সেই সাধুবাবা। মুহুর্তে সেদিনের ছবিটা ভেসে উঠল চোখের সামনে। আবার মন ফিরে এল কনখল থেকে বৃন্দাবনে। তিনি বললেন,

– বেটি, এপথে মনটা যখন আছে তখন অনেকেরই সন্ধান তুই পেয়ে যাবি। আরও কিছু তপস্বীর কথা বলি শোন। এক ধরণের তপস্বী আছেন যারা আকাশের দিকে মুখ করে তপস্যা করেন। এটাও একশ্রেণীর সাধুসন্ন্যাসীদের ব্রত। এদের উর্দ্ধমুখী বা আকাশমুখী তপস্বী বলে। এদের মধ্যে অনেকে আবার সূর্যের দিকে তাকিয়ে তপস্যা করেন। এটা খুব খু-উ-ব কঠিন তপস্যা।

সাধুবাবা থামলেন। আমার কি ভাগ্য আজ জানতে পারছি কত ধরণের, কত কঠিনভাবে তপস্যারত সাধুসন্ন্যাসী রয়েছেন তপোবন ভারতবর্ষে। অথচ যাঁদের সচরাচর দেখতে পাই না, দেখতে পেলেও বিষয়ীমন ঐ সব ত্যাগব্রতীদের বিষয়ে মনে কোন রেখাপাত ঘটায় না। অদ্ভুত মন আমাদের। সাধুবাবা বললেন,

– বেটি, এক শ্রেণির সাধুদের ব্রত আছে যারা কখনও নখ কাটেন না। মনে মনে কোন সংকল্প করে তাঁরা এই ব্রতপালন করেন। এদের নখী তপস্বী বলে। একটা শ্রেণি আছে, যারা দিবারাত্র দাঁড়িয়ে থাকেন, বসেন না কখনও। এরা চলাফেরা করেন কথাবার্তা বলেন, সবই করেন সাধন জীবনে, কিন্তু বছরের পর বছর কখনও বসেন না। এটাও একটা ব্রত। এদের সঙ্গে বাঁশ বা লাঠি থাকে নিজের মাপ মতো। একটা ছোট আর দুটো বড়। ছোট টুকরোটা দুটো বাঁশের বা লাঠির মাথায় বেঁধে নিয়ে তার উপরে মাথা রেখে ঘুমোন। বিশ্রামের প্রয়োজন হলে ওইভাবে বিশ্রাম করেন। এই ব্রতে শোয়া বা বসার কোনও উপায় নেই।

কোন কথা বলে ছেদ টানলাম না সাধুবাবার কথায়। একবার কথার তার কেটে গেলে অনেক সময় জোড়া লাগে না, আবার কখনও জোড়া লাগতে সময় লাগে অনেক। সাধুবাবার পায়ে ধরার ফলটা দেখছি বেশ ভালই হয়েছে। প্রশান্ত চিত্তে তিনি বলে চলেছেন,

– বেটি মৌনব্রতী সাধুদের কথা তো তোর জানাই আছে। এরা সাধারণত নির্দিষ্ট একটা সংকল্প করে কেউ তিন, কেউ ছয়, কেউ বা একযুগ বারোবছর পর্যন্ত মৌনব্রত অবলম্বন করেন। এ ধরণের তপস্বীদের অনেকে মৌনীবাবা বা মৌনব্রতী তপস্বী বলে। একান্ত প্রয়োজনে এরা ইশারায় অথবা লিখে মনের ভাবটুকু প্রকাশ করে মিটিয়ে নেন প্রয়োজনীয় কাজটুকু।

সৌভাগ্যক্রমে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ভ্রমণকালীন যেমন কেদারনাথ, বদরীনারায়ণ, গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রী, জ্বালামুখী, জম্মুতে বৈষ্ণোদেবী, অমরনাথের পথে পহেলগাঁও, হরিদ্বার, নেপালে পশুপতিনাথ, এমন আরও অসংখ্য তীর্থে বহু মৌনী সাধুর দর্শন পেয়েছি, তবে কোথাও কারও সঙ্গে লিখে বা ইশারায় কোন কথা হয়নি আমার। বহু বছর আগে একবার পুরীতে আর একবার উত্তরাখণ্ডে উত্তর কাশীর আশ্রমে দর্শন করেছিলাম শ্রীশ্রী ঠাকুর সীতারামদাস ওঙ্কারনাথজিকে। তখন তিনি ছিলেন মৌনী অবস্থায়।অনেকক্ষণ কথা বলতে না পেরে একটু হাঁপিয়ে উঠেছি ভেতরে ভেতরে। তাই মৌনব্রত প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করলাম,

– বাবা, এই ব্রতপালনে সাধুসন্ন্যাসীরা কি ফল পেয়ে থাকেন তা কি আপনার জানা আছে?

প্রথমে ঘাড় নেড়ে পরে মুখে বললেন,

– হ্যাঁ বেটি, আছে। যত কথা কম বলবি তত সত্য বজায় থাকবে, কথা বা বাক্যের শক্তি বাড়বে। জগতে যত শক্তি আছে তার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও তীব্র শক্তি হচ্ছে বাক্যের। তাই সাধুসন্ন্যাসীরা মৌন থেকে বাক সংযম করেন। বাক সংযমে দেহের শক্তি বাড়ে, মনের শক্তি বাড়ে, বাড়ে বাক্যের শক্তি। ফলে অস্থিরতা কমে। সাধনে মন একাগ্র হয়। যত বেশি কথা, তত বেশি মিথ্যা কথা, তত বেশি বাক্যের অপচয়, শক্তিরও। বেটা, হার আর নূপুরের পার্থক্য যেমন, অল্পেতেই মুখরিত হয়ে ওঠে নূপুর, শব্দ করে। তাই তো তার স্থান মানুষের পায়ে। হার একেবারেই নিস্তব্ধ মৌন। সেইজন্য তো সে স্থান পেয়েছে মানুষের গলায়। সাধনজীবনে মৌনতা তাই হারের মতোই আদরণীয়।

এই পর্যন্ত বলে থামলেন। আমি সাধুবাবার কথাগুলো শুনছি কিন্তু লক্ষ্য করছি তাঁর দেহটাকে। সারাদেহের কোন অংশ এতটুকুও নড়ছে না শুধু কথার সময় মুখটুকু ছাড়া। কি অদ্ভুত সংযম! মৌনতা প্রসঙ্গে আরও বললেন,

– বেটি, যখন ইচ্ছা হবে তখনই কথা বলতে নেই। অকারণে বাক্য ব্যয় করতে নেই। সবসময় জানবি বাক্য তোর শক্তি। যত ব্যয় তত শক্তির ক্ষয়। কেউ কিছু জিজ্ঞাসা না করলে বাক্য ব্যয় করতে নেই। বাক্য সংযত করা অত্যন্ত কঠিন। তবুও সংযত করতে আপ্রাণ চেষ্টা করা উচিত।