বাংলাদেশ–নিউজিল্যান্ড টেস্ট সিরিজ বাতিল করে দেশে ফিরছেন ক্রিকেটাররা

16 March, 2019 : 5:22 am ৮৬

ঢাকা ঃ

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার পর বাংলাদেশ–নিউজিল্যান্ড টেস্ট সিরিজ বাতিল করা হয়েছে আগেই। সিরিজ বাতিল করে দেশে ফিরছেন ক্রিকেটাররা। বাংলাদেশ সময় শুক্রবার দিবাগত রাত তিনটার পর ক্রিকেটাররা ক্রাইস্টচার্চ বিমানবন্দরে পৌঁছান। বাংলাদেশ সময় আজ শনিবার ভোর পাঁচটায় সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসে করে বাংলাদেশ দলের ১৯ সদস্যের দেশের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। ওই হামলার পরপরই ক্রিকেটারদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

বাংলাদেশ দল দেশে ফিরছে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসে। দেশে ফেরা নিয়ে দলের ম্যানেজার খালেদ মাসুদ সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘(স্থানীয় সময়) শনিবার দুপুর ১২টায় (বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টা) আমরা রওনা দেব। আশা করি, ঢাকায় পৌঁছাব রাত ১০টা ৪০ মিনিটে।’ কোচিং স্টাফদের কেউ কেউ যে দলের সঙ্গে ফিরছেন না, সেটি অবশ্য ম্যানেজার আগেই বলেছেন, ‘আমরা ১৯ জন ফিরব। কোচিং স্টাফের কেউ ওয়েস্ট ইন্ডিজ যাবে, কেউ হয়তো দক্ষিণ আফ্রিকায়। তারা দ্রুতই টিকিট পেয়ে যাবে।

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় ভীষণ হতবাক বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। এ ঘটনার পর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উপলব্ধি হয়েছে বিসিবির। এখন থেকে যত উন্নত দেশেই খেলতে যাক বাংলাদেশ, সর্বোচ্চ নিরাপত্তার আশ্বাস না পেলে সেখানে দল পাঠাবেন না, স্পষ্ট করেই জানিয়েছেন বিসিবির সভাপতি নাজমুল হাসান।

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ক্রিকেটারদের সংগঠন ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব)। এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে নিরাপত্তার বিষয়টিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক দেবব্রত পাল, ‘এটি এখন কোনো দেশের একক সমস্যা নয়। এটি নির্মূলে সব দেশকে একযোগে কাজ করতে হবে। আমরা চাই, এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি ভবিষ্যতে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ অথবা বৈশ্বিক কোনো ক্রিকেট টুর্নামেন্টে ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। আশা করি, আইসিসি ক্রিকেটারদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ফেডারেশন অব ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশনকে (ফিকা) নিয়ে নিরাপত্তাবিষয়ক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। খেলার মাঠে ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা ও নিরাপদ রাখার নিশ্চয়তা সবার আগে পেতে হবে।

হামলায় এখন পর্যন্ত ৪৯ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজন বাংলাদেশি। অল্পের জন্য বেঁচে গেছেন নিউজিল্যান্ডে সফররত বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা। ক্রাইস্টচার্চে হ্যাগলি ওভাল মাঠের কাছেই যে মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে যাচ্ছিলেন তাঁরা, সেই মসজিদেই সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। হামলায় আহত হয়েছেন ৯০ জন। এঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

যা হয়েছিল শুক্রবার দুপুরে

বাংলাদেশ দলের বাস তখন মসজিদের সামনে। ক্রিকেটাররা বাস থেকে নেমে মসজিদে ঢুকবেন, এমন সময় রক্তাক্ত শরীরের একজন নারী ভেতর থেকে টলোমলো পায়ে বেরিয়ে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যান। ক্রিকেটাররা তখনো বুঝতে পারেননি ঘটনা কী। তাঁরা হয়তো মসজিদে ঢুকেই যেতেন, যদি না বাসের পাশের একটা গাড়ি থেকে এক ভদ্রমহিলা বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের বলতেন, ‘ভেতরে গোলাগুলি হয়েছে। আমার গাড়িতেও গুলি লেগেছে। তোমরা ভেতরে ঢুকো না।

ক্রিকেটাররা তখন বাসেই অবরুদ্ধ হয়ে থাকেন বেশ কিছুক্ষণ। কারণ, পুলিশ ততক্ষণে রাস্তায় গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। বাসে বসেই তাঁরা দেখতে পান, মসজিদের সামনে অনেকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন। অনেকে রক্তাক্ত শরীর নিয়ে বেরিয়ে আসছেন মসজিদ থেকে, যা দেখে আতঙ্কে অস্থির হয়ে পড়েন ক্রিকেটাররা। কারণ, বাসে কোনো নিরাপত্তাকর্মী দূরে থাক, স্থানীয় লিয়াজোঁ অফিসারও ছিলেন না।

রাস্তায় তখন অনেক পুলিশ। সাইরেন বাজিয়ে ছুটে চলেছে পুলিশের গাড়ি। অনেকক্ষণ বাসে বসে থাকার পর ক্রিকেটাররা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে বাস থেকে নেমে মাঠের দিকে হাঁটতে শুরু করেন। সবার চোখে–মুখে তখন আতঙ্ক। কারণ, দূরত্বটা একেবারে কম নয়। সেটি কমাতে রাস্তা ছেড়ে সবাই নেমে পড়েন হ্যাগলি পার্কে। পার্কের মধ্য দিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে সবাই মাঠে ফেরেন।

মাঠে ফিরে সবাই ড্রেসিংরুমে ঢুকে একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। হাঁটতে হাঁটতে ক্রিকেটাররা বলছিলেন, তৃতীয় টেস্টের আগের দিনে অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহর সংবাদ সম্মেলন একটু দেরিতে শেষ না হলেই সর্বনাশ হয়ে যেত।বিমানবন্দরে পৌঁছে নিজের ফেসবুক পেজে ছবি আপলোড করেন মুশফিকুর রহিম। লেখেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ…ইনশাল্লাহ শেষ পর্যন্ত বাড়ি যাওয়ার সময় হয়েছে।’

বাংলাদেশ দলের মসজিদে ঢোকার কথা ছিল বেলা দেড়টায়। সংবাদ সম্মেলন শেষ করে যেতে যেতে ১টা ৪০ বেজে যায়। বাংলাদেশ দলের বাস আর পাঁচ মিনিট আগে মসজিদে পৌঁছে গেলে ক্রিকেটাররা সন্ত্রাসী হামলার সময় মসজিদের ভেতরেই থাকতেন। তাহলে কী হতে পারত, আর যা দেখেছেন—দুটি মিলিয়ে মুশফিকুর রহিম হাঁটতে হাঁটতেই অঝোরে কাঁদতে শুরু করেন। তামিম ইকবাল বলতে থাকেন, ‘যা দেখেছি, এরপর আমি আর একমুহূর্ত এখানে থাকতে চাই না। এই টেস্ট খেলার প্রশ্নই আসে না। আমি দেশে ফিরে যাব।’

বাসে ক্রিকেটারদের সঙ্গে ছিলেন ম্যানেজার খালেদ মাসুদ ও বাংলাদেশ দলের অ্যানালিস্ট শ্রীনিবাসন আইয়ারও। কোচিং স্টাফরা ছিলেন মাঠে। নামাজ শেষে মাঠে ফেরার পর বাংলাদেশ দলের অনুশীলনে নামার কথা ছিল বাংলাদেশ দলের। ড্রেসিংরুমে ফেরার পর খোঁজ পড়ে বাংলাদেশ দলের দুই ক্রিকেটার লিটন কুমার দাস ও নাঈম হাসানের। তাঁরা দুজন ছিলেন হোটেলে। ফোনে তাঁদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিন্ত হন ম্যানেজার খালেদ মাসুদ।

[gs-fb-comments]