ঢাকা।।

এক সাগর রক্তের বিনিময়ে মুক্তিযুদ্ধের-অর্থনীতির ‘সমাজতন্ত্র’ অভিমুখিন এই ভিশন’ রচিত হয়েছিল। এটিই ছিল জাতির ‘ভিশন-মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১’। এই ‘ভিশন’ পরিত্যাগ করাটি হবে তিরিশ লাখ শহীদের রক্ত ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা।

‘সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা ছিল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য। তা ছিল ঐক্যবদ্ধ দেশবাসীর সম্মিলিত ইচ্ছা ও স্বপ্ন। তা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ‘ভিশন’। সে কারণেই দেশের সংবিধানে স্পষ্টভাবে ‘সমাজতন্ত্রের’ লক্ষ্যের কথা লেখা হয়েছিল। সংবিধানে এখনো তা লেখা রয়েছে। অথচ বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, প্রায় সাড়ে চার দশক ধরে দেশ পরিচালিত হচ্ছে ‘সমাজতন্ত্রের’ বিপরীতধর্মী ‘পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতির’ পথে। বর্তমান সরকারসহ এ সময়কালের পর্যায়ক্রমিক সব সরকারই সচেতনভাবে সেই বিপরীতমুখী নীতির পথ ধরেই রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে।

‘সমাজতন্ত্র’ অভিমুখিনতার প্রসঙ্গটি বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বিশেষ দুটি কারণে। প্রথমটি হলো- দেশে ‘বাজার-অর্থনীতির’ পথ ধরে ‘উন্নয়নের জোয়ার’ চলছে বলে প্রচার করে সরকার জনগণকে ‘সমাজতন্ত্রের’ লক্ষ্যের কথা ভুলিয়ে রাখতে চাচ্ছে। ‘উন্নয়নের’ প্রমাণ দেখানোর জন্য সে প্রবৃদ্ধির হার, বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ, বাজেটের পরিমাণ, মাথাপিছু আয় ইত্যাদি নানা বিষয়ে পরিসংখ্যান হাজির করে তুমুল প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে। অথচ অভাবনীয় মাত্রার লুটপাট, কিছু মানুষের হাতে লাখো কোটি টাকার সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়া, বৈষম্যের ক্রমাগত বৃদ্ধি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সরকারের কোনো কথা নেই। এসব বিষয়ে প্রশ্ন তুললে এক কথায় বলে দেওয়া হচ্ছে যে, এগুলো হলো ‘উন্নয়নের প্রসববেদনা’, যা নীরবে সহ্য করতে হবে। এমতাবস্থায় স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে- মুক্তিযুদ্ধের ‘ভিশন’ কী ছিল? ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি’ নাকি ‘সমাজতন্ত্র’?

আর দ্বিতীয় কারণটি হলো- কোনো কোনো মহল থেকে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে যে, দেশের চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে ‘সমাজতন্ত্র’ অন্তর্ভুক্ত থাকলেও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ফলে সৃষ্ট ‘পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতির’ কারণে সেই পথ এখন পরিত্যাগ করাটিই উচিত কাজ হয়েছে। লক্ষণীয় যে, ‘পরিবর্তিত বাস্তবতার’ কারণ দেখিয়ে যেভাবে ‘সমাজতন্ত্রের’ লক্ষ্য বহাল রাখা ঠিক হবে না বলে বলার চেষ্টা হচ্ছে, ঠিক তেমনই ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ বিধানাবলি পূর্ববৎ বহাল রাখা, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার বিধান বহাল রাখা, ‘বিস্মিল্লাহ’ ও ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’-এর বিধান বাতিল করা ইত্যাদি ঠিক হবে না বলে আজ একইভাবে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে। ’৭২-এর মূল সংবিধান ও চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতির সবগুলো স্তম্ভকেই এরূপ নানাভাবে আজ ক্ষতবিক্ষত ও বিনষ্ট করা হয়েছে। এ কথা ভালোভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন যে, বাঙালি জাতির এযাবৎকালের শ্রেষ্ঠ অর্জন, তার সুমহান মুক্তিযুদ্ধ, কোনোমতেই একটি প্রশ্নবিদ্ধ ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ তৎপরতা ছিল না। তা ছিল অনেক বছরের অসংখ্য সংগ্রাম-আন্দোলনের প্রক্রিয়ায় তিল-তিল করে গড়ে ওঠা একটি প্রগতিশীল বিপ্লবী ধারার জাতীয় মুক্তির লড়াই। পাকিস্তানকে দ্বিখন্ডিত করে তার পূর্বাংশে, অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানে, একই চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন নতুন নামের (বাংলাস্থান নামও তো হতে পারত!) একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের ছিল ‘পাকিস্তান আন্দোলন’ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিপরীতধর্মী রাজনৈতিক, মতাদর্শিক, সামাজিক মাত্রিকতা ও অর্থনৈতিক নীতি-লক্ষ্য-উপাদান। চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ‘জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা’র মাঝেই ঘটেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ধারার মূর্ত প্রকাশ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ধারা হলো এই সবগুলো উপাদানের সম্মিলিত প্রকাশ। রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে চার নীতির কোনো একটি বা দুটি নীতিকে বাদ দিয়ে দেশে মুক্তিযুদ্ধের ধারা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তাই ‘সমাজতন্ত্র’কে বাদ দেওয়ার চেষ্টা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অথবা কাগজে-কলমে ‘সমাজতন্ত্র’ লিখে রেখে, বাস্তবে তার বিপরীতমুখী ‘পুঁজিবাদের’ পথ ধরে চলাকে প্রতারণা ছাড়া অন্যকিছু বলে আখ্যায়িত করা যায় না। তাই বলতে হয়, পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতির কথা অথবা অন্য যে কোনো অজুহাতের কথা তুলে ‘সমাজতন্ত্র’ বাদ দেওয়ার অর্থ দাঁড়াবে মুক্তিযুদ্ধের ‘ভিশন’কে কার্যত পরিত্যাগ করা।

বলার চেষ্টা হয় যে, এখন যেহেতু সোভিয়েত ইউনিয়ন আর নেই, তাই সমাজতন্ত্রও এখন অচল হয়ে পড়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন থাকা বা না-থাকার ওপর রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে ‘সমাজতন্ত্র’ থাকবে কী থাকবে না তা নির্ধারিত হওয়া উচিত বলে যদি যুক্তি তোলা হয়, তা হলে একই যুক্তিতে দেশের স্বাধীনতা অর্জনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা থেকে কাউকে বিরত রাখার কারণ থাকে কি? সোভিয়েতের উপস্থিতির বিশ্ব বাস্তবতায় যেভাবে আমরা নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রামে দেশ স্বাধীন করতে পেরেছিলাম, বর্তমানে সোভিয়েতের অনুপস্থিতিতে সে বিজয় কি সেভাবে সম্ভব হতো? পরিবর্তিত বিশ্ব বাস্তবতার কথা বলে কি তা হলে মুক্তিযুদ্ধের প্রগতিশীল বিজয়কে আমাদের পরিত্যাগ করতে হবে?

পরিবর্তিত বিশ্ব বাস্তবতায় সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের মধ্যে শক্তির ভারসাম্য যে বদলে গেছে, সে কথা ঠিক। কিন্তু তাতে করে সমাজতন্ত্র তো নিঃশেষ হয়নি। চীন, কিউবা, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশ বিশ্বপরিস্থিতির পরিবর্তিত শক্তি-ভারসাম্যের মাঝে নানা ম্যানুভার করে ‘সমাজতন্ত্রের’ লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে। এসব দেশের বিরুদ্ধে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার প্রবল হামলার কারণ এটিই। ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশ, পার্শ¦বর্তী দেশ নেপাল প্রভৃতি রাষ্ট্রে সমাজতন্ত্রের পক্ষের দল ক্ষমতাসীন। তা ছাড়া প্রবল প্রতিকূলতার মুখেও বিশ্বের প্রায় সব দেশে সমাজতন্ত্রের পক্ষে কমিউনিস্ট, বামপন্থি ও প্রগতিবাদী শক্তি মানবমুক্তির লক্ষ্যে বহুমুখী ধারায় তাদের সংগ্রাম জোরদার করছে। আগপিছ করে, আঁকাবাঁকা পথে সমাজতন্ত্রের শক্তি ও আন্দোলন আবার উজ্জীবিত হয়ে উঠছে। তারা কেউ পরিবর্তিত বিশ্ব বাস্তবতার কারণ দেখিয়ে সমাজতন্ত্রের আদর্শ ও লক্ষ্য ত্যাগ করেনি। তা হলে বাংলাদেশ কেন সমাজতন্ত্রের নীতি ও লক্ষ্য ত্যাগ করবে?

এ ক্ষেত্রে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক প্রশ্ন হলো, মুক্তিযুদ্ধের সময় শুধু শক্তিশালী সোভিয়েত সমর্থন পাওয়ার জন্যই কি আমরা সমাজতন্ত্রের নীতি ঘোষণা করেছিলাম? সমাজতন্ত্রের নীতি গ্রহণ করাটা কি নিছক একটা উপযোগিতার (বীঢ়বফরধহপু) ব্যাপার ছিল? নাকি তা ছিল এ দেশের গণমানুষের ধারাবাহিক গণসংগ্রামের প্রতিফলন, সমাজের নিজস্ব অভিজ্ঞতালব্ধ আদর্শিক উপলব্ধি? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, সমাজতন্ত্রের নীতি সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার পথ হিসেবে দীর্ঘদিনের সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় তৃণমূল থেকে উত্থিত হয়েছে। সমাজতন্ত্রের নীতি পরিত্যাগ করাটি তাই হবে জাতির ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা।

সব মানুষের জন্য অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান এই মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা এবং তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সমাজের এবং সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব- এই দাবি বহু পুরনো। সেই চল্লিশের দশক-পঞ্চাশের দশকের গোড়া থেকে এই দাবি ব্যাপকভাবে উত্থাপিত ও উচ্চারিত হয়েছে। ’৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের ২১-দফায় এসব দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ব্যাংক-বীমা-বৃহৎ শিল্প জাতীয়করণের দাবি। পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, পরিকল্পিত অর্থনীতি, সমবায়, ভূমিসংস্কার দাবিগুলোতে জাতীয়ভাবে পরিচালিত গণসংগ্রামগুলো ক্রমান্বয়ে যুক্ত হয়েছে। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের ভিত্তি ঐতিহাসিক ১১-দফাতেও এসব কর্মসূচি ও দাবি স্পষ্ট ও বলিষ্ঠভাবে লিপিবদ্ধ ছিল। ’৭০-এর নির্বাচনে বিজয়ী দল আওয়ামী লীগের ইশতেহারেও সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যসহ এসব কর্মসূচির কথা ছিল। গণসংগ্রামের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় যে কর্মসূচি, নীতি ও লক্ষ্য প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে, ‘পরিবর্তিত বিশ্ব বাস্তবতার’ একটি একপেশে ও মনগড়া ব্যাখ্যাকে যুক্তি হিসেবে দেখিয়ে তা থেকে সরে আসার চেষ্টা তাই হবে একটি দুরভিসন্ধিমূলক ও বিশ্বাসঘাতকতার ষড়যন্ত্র।

অনেকে ভাবতে পারেন, ’৭২-এর সংবিধানে ‘সমাজতন্ত্রের’ লক্ষ্য ঘোষিত হলেও তা আসলে ছিল নিছক একটি কথার-কথা মাত্র। অনেকে আবার বলার চেষ্টা করেন, সাধারণভাবে ‘সমাজতন্ত্র’ অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে ঘোষিত হলেও অর্থনৈতিক নীতি ও ব্যবস্থা সম্পর্কে সংবিধানে সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট কোনো কথা নেই। এই ধারণা যে কত ভুল তা প্রমাণ করতে ’৭২-এর সংবিধান থেকে নিম্নোক্ত উদ্ধৃতিগুলো তুলে দেওয়াই হবে যথেষ্ট।

খসড়া সংবিধান-প্রণয়ন কমিটির রিপোর্টের ১২নং প্যারাগ্রাফে বলা হয়েছে, ‘সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণের কাছে আমাদের যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, সম্পত্তির অধিকার সম্পর্কিত বিধানগুলোতে তার প্রতিফলন ঘটেছে।… সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাকল্পে যেসব আইন প্রণীত হবে, সেগুলো বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার আওতায় পড়বে না।’ সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ‘যে সকল মহান আদর্শ… প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল জাতীয়তাবাদ- সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে।’ আরও বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হইবে… এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা- যেখানে … রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।’ সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি প্রসঙ্গে একেবারে শুরুতেই বলা হয়েছে, ‘জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা- এই নীতিসমূহ… রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি বলিয়া পরিগণিত হইবে।’ তার পর বলা হয়েছে, ‘মানুষের উপর মানুষের শোষণ হইতে মুক্ত, ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজলাভ নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হইবে।’ মালিকানা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘উৎপাদনযন্ত্র, উৎপাদন ব্যবস্থা ও বণ্টনপ্রণালিসমূহের মালিক বা নিয়ন্ত্রক হইবেন জনগণ এবং এই উদ্দেশ্যে মালিকানা-ব্যবস্থা নিম্নরূপ হইবে : (ক) রাষ্ট্রীয় মালিকানা, অর্থাৎ অর্থনৈতিক জীবনের প্রধান প্রধান ক্ষেত্র লইয়া সুষ্ঠু ও গতিশীল রাষ্ট্রায়ত্ত সরকারি খাত সৃষ্টির মাধ্যমে জনগণের পক্ষে রাষ্ট্রের মালিকানা; (খ) সমবায়ী মালিকানা, অর্থাৎ আইনের দ্বারা নির্ধারিত সীমার মধ্যে সমবায়সমূহের সদস্যদের পক্ষে সমবায়সমূহের মালিকানা এবং (গ) ব্যক্তিগত মালিকানা, অর্থাৎ আইনের দ্বারা নির্ধারিত সীমার মধ্যে ব্যক্তির মালিকানা।’ লক্ষণীয় যে, সংবিধানে রাষ্ট্রীয় মালিকানাকে প্রাধান্য দিয়ে সমবায়ী ও ব্যক্তিমালিকানাকে আইনের দ্বারা সীমাবদ্ধকৃত অবশিষ্টাংশ (ৎবংরফঁধষ) হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

তার পর পরই বলা হয়েছে যে, ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে মেহনতি মানুষকে- কৃষক ও শ্রমিককে- এবং জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তি প্রদান করা।’ কর্মসংস্থান ও কর্ম সম্পর্কে বলা হয়েছে, “কর্ম হইতেছে কর্মক্ষম প্রত্যেক নাগরিকের পক্ষে অধিকার, কর্তব্য ও সম্মানের বিষয় এবং ‘প্রত্যেকের নিকট হইতে যোগ্যতানুসারে ও প্রত্যেককে কর্মানুযায়ী’- এই নীতির ভিত্তিতে প্রত্যেকে স্বীয় কর্মের জন্য পারিশ্রমিক লাভ করিবেন।” উল্লেখ্য, এখানে ‘প্রত্যেকের নিকট হইতে…কর্মানুযায়ী’ কোটেশনে উদ্ধৃত অংশটি মার্কস-এঙ্গেলস রচিত ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’ থেকে কোটেশনসহ হুবহু উদ্ধৃত করা হয়েছে। এই সংবিধানে আরও বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদন-শক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন এবং…নাগরিকদের জন্য…(ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা।’ ’৭২-এর মূল সংবিধান থেকে এ ধরনের আরও উদ্ধৃতি দিয়ে স্পষ্টভাবে দেখানো যায়, কোন ধরনের অর্থনৈতিক নীতি ও লক্ষ্য অনুসরণের সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট দিকনির্দেশনা বিজয়ী মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের অর্থনৈতিক নীতি ও লক্ষ্যের চরিত্র, বৈশিষ্ট্য, অভিমুখিনতা ইত্যাদি যে কী, সে বিষয়ে কোনোরকম সন্দেহের অবকাশ কি এর পরও থাকতে পারে?

’৭২-এর সংবিধানে মুক্তিযুদ্ধের ‘ভিশন’ সম্পর্কে বিন্দুমাত্র অস্পষ্টতা রাখা হয়নি। পরিকল্পিত অর্থনীতি, অর্থনীতির প্রধান প্রধান ক্ষেত্রগুলোতে রাষ্ট্রীয় মালিকানা, নাগরিকদের জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব, মেহনতি মানুষ তথা কৃষক-শ্রমিকের ওপর শোষণের অবসান, অনুপার্জিত আয় ভোগ করার সুযোগ বন্ধ, কর্মক্ষম মানুষের জন্য কাজের অধিকার নিশ্চিতকরণ, সবার জন্য কাজের গুণ ও পরিমাণ অনুযায়ী পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা, সুযোগের সমতা, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি, ‘ভিশন’ ও তার সাম্যের সমাজ- এসব অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা স্পষ্টভাবে সংবিধানে উল্লেখিত আছে। এগুলোই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের অর্থনৈতিক নীতি ও লক্ষ্যের রূপরেখা।

এক সাগর রক্তের বিনিময়ে মুক্তিযুদ্ধের-অর্থনীতির ‘সমাজতন্ত্র’ অভিমুখিন এই ‘ভিশন’ রচিত হয়েছিল। এটিই ছিল জাতির ‘ভিশন-মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১’। এই ‘ভিশন’ পরিত্যাগ করাটি হবে তিরিশ লাখ শহীদের রক্ত ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা। দেশি-বিদেশি শোষকদের ষড়যন্ত্র ও আঘাতে সেই ‘ভিশনের’ বাস্তবায়ন হোঁচট খেতে পারে, অল্প-বেশি কাল তা রহিত হয়ে বিপথগামী হতে পারে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ‘ভিশন’ বাস্তবায়নের পথকে চিরদিন রোধ করে রাখার ক্ষমতা কারো নেই। কারণ মুক্তিযুদ্ধ তো আজও শেষ হয়নি!