ঢাকা।।
কাউন্সিলের তোড়জোড় শুরু করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ইতোমধ্যেই আট বিভাগের জন্য আটটি খসড়া কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ৫ এপ্রিল সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে এসব কমিটি চূড়ান্ত করা হবে। ওই বৈঠক থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ সাংগঠনিক জেলাগুলোর কাউন্সিল শেষ করার তাগিদসহ সার্বিক প্রস্তুতির জন্য দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দেবেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এর আগে গত শুক্রবার অনুষ্ঠিত দলের সভাপতিমণ্ডলীর সভা থেকে চলতি বছর অক্টোবর মাসে আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত হয়। ওই মাসেই আওয়ামী লীগের বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হবে। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ২৩ ও ২৪ অক্টোবর আওয়ামী লীগের ২০তম কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণীপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানায়, সভাপতিমণ্ডলীর বৈঠকে ২১তম কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের পর তা বাস্তবায়নে বেশ তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। তার ধারাবাহিকতায় গতকাল রোববার সম্পদকমণ্ডলীর সভা হয়। দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফের সভাপতিত্বে এ সভায় জাতীয় কাউন্সিল নিয়ে নানা আলোচনা হয়। সভা থেকে কেন্দ্রীয় সম্মেলনের প্রস্তুতি হিসেবে জেলা সম্মেলন শেষ করার প্রস্তুতি নিতে বলা হয়। জেলা-উপজেলা সম্মেলনের পাশাপাশি দলের নিষ্ক্রিয় ও মেয়াদোত্তীর্ণ সহযোগী সংগঠনের কমিটির ব্যাপারেও আলোচনা হয় বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা। এ ছাড়াও সাংগঠনিক সফর, সদস্য সংগ্রহ অভিযান সম্পন্ন করা ও দলীয় কোন্দল নিরসনের ওপর জোর দেয়া হয় বৈঠকে। আওয়ামী লীগের উপদফতর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়–য়া গতকাল সন্ধ্যায় নয়া দিগন্তকে জানান, ৭৭টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে প্রায় বেশির ভাগেরই মেয়াদ উত্তীর্ণ। তাই জাতীয় কাউন্সিলের আগে এসব জেলার সম্মেলন শেষ করার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।

দলের একাধিক সূত্র জানায়, আগামী জুলাই মাসের মধ্যেই বেশির ভাগ জেলা সম্মেলন শেষ করা হবে। আগস্ট মাসজুড়ে শোকের কর্মসূচি থাকায় ওই মাসে কোনো সম্মেলন হবে না। এ ছাড়া আগামী মাসেই রমজান শুরু হবে। রমজানে সাংগঠনিক সফর হলেও জেলা সম্মেলন না-ও হতে পারে। তবে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা সিদ্ধান্ত দিলে রমজানেও সম্মেলন হতে পারে।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণীপর্যায়ের তিনজন নেতা আলাপকালে বলেন, দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা যথাসময়ে জাতীয় কাউন্সিলের ব্যাপারে অনড়। তবে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গুরুতর অসুস্থ হওয়ায় এ কাউন্সিল আরো গুরুত্ব পেয়েছে। সে জন্য সার্বিক প্রস্তুতিও শুরু হয়ে গেছে। দলের সিনিয়র নেতাদের প্রধান এবং বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত সম্পাদকদের সমন্বয়ক করে বিভিন্ন কমিটি গঠন করা হবে। ওই সব কমিটি সারা দেশে সফর ও জেলা সম্মেলনের নেতৃত্ব দেবে। বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকরা জেলা নেতাদের সাথে সমন্বয় করে জেলা সম্মেলনের তারিখ ঠিক করবেন। সব ঠিক থাকলে রমজানের আগেই এ সফর শুরু হতে পারে বলেও জানান তারা।

দলের দফতর সূত্র জানায়, রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী রোজ গার্ডেনে জন্মলাভের পর ১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন অনুষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিল। এতে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি, শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৫৩ সালে ময়মনসিংহে দলের দ্বিতীয় কাউন্সিলে মওলানা ভাসানী সভাপতি পুনর্নির্বাচিত ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ৫৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত তৃতীয় কাউন্সিলে একই কমিটি বহাল থাকে। ৫৭ সালে কাগমারি সম্মেলনকে ঘিরে মওলানা ভাসানী দল ভেঙে ন্যাপ করলে আওয়ামী লীগের মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগিশ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অপরিবর্তিত থাকেন।

৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হলে আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড স্থগিত করা হয়। দীর্ঘ ছয় বছর পর ৬৪ সালে দলকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়। এতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে তর্কবাগিশ-মুজিব অপরিবর্তিত থাকেন। ৬৬ সালের কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তাজউদ্দীন আহমদ। এরপর ৬৮ ও ৭০ সালের কাউন্সিলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অপরিবর্তিত থাকেন। এই কমিটির মাধ্যমেই পরিচালিত হয় বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২, ৭৪, ৭৬, ৭৮, ৮১, ৮৩, ৮৭, ৯২, ৯৭, ২০০০, ২০০২, ২০০৯, ২০১২ এবং ২০১৬ সালে সর্বশেষ ২০তম কাউন্সিল অনষ্ঠিত হয়। এতে অষ্টমবারের মতো সভাপতি পদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচিত হন। সাধারণ সম্পাদক পদে আসেন ওবায়দুল কাদের।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, আগামী অক্টোবরে দলের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে। এর জন্য আট বিভাগের আটটি খসড়া টিম গঠন করা হয়েছে। ৫ এপ্রিল কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় এ টিমগুলো যাচাই-বাছাই, সংযোজন-বিয়োজন করে চূড়ান্ত করা হবে। এরপর মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা কমিটিগুলোর সম্মেলনের কাজ শুরু হবে। যুগ্ম সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকরা ইতোমধ্যেই প্রস্ততিমূলক কাজ শুরু করে দিয়েছেন।