ডেস্ক রিপোর্ট।।

গত শতকে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়েছে মাত্র ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। প্রাণিজগতে এর প্রভাব পড়েছে অপরিসীম। বিভিন্ন জৈব পরিবেশের জলবায়ু এতটাই বদলে যাচ্ছে যে, বিভিন্ন প্রজাতির বাসযোগ্য অঞ্চলের বিস্তার খুব দ্রুত কমে আসছে। বাড়বে নানা রোগ সৃষ্টিকারী ছত্রাক ও পরজীবী। এসব ঘটনা কোনো বিশেষ অঞ্চলের নয়, গোটা বিশ্বের

মাত্র বছর কয়েক আগে ইন্দোনেশিয়ায় আছড়ে পড়ে সুনামি। সমুদ্রের তলায় তীব্র ভূমিকম্পের জেরে পানির ঢেউ প্রায় ২০-৩০ ফুট ওপরে উঠেছিল। মাত্র কয় মিনিটের তা-বে উপকূলবর্তী শহরের অসংখ্য বাড়িঘর পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। প্রাণ হারায় অসংখ্য মানুষ, পশুপাখি। ক্ষতি হয় কোটি কোটি ডলার, ধ্বংসের মুখোমুখি হয় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প।
আমাদের মনে পড়ে, ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বরের কথা। মনে পড়ে সে মেয়েটির কথা, যে সমুদ্র সম্পর্কে জানিয়েছিল : ‘ও যধঃব ঃযধঃ হধসব, নবপধঁংব রঃ সবধহং ধিাবং ধহফ ও যধঃব ধিাবং.’ কেন সে ঢেউকে ঘৃণা করে? কারণ এটা কেড়ে নিয়েছে তার মাকে। দুই মিনিটের কিছু বেশি সময়ের মধ্যেই এ ঢেউ কেড়ে নিয়েছিল হাজার হাজার মানুষের জীবন। ষাট ফুট উঁচু দেওয়াল ভেঙে পড়েছিল সমুদ্রসংলগ্ন লোকালয়ে, তার কাছে শিশুর খেলনার মতো তুচ্ছ হয়ে ভেসে গিয়েছিল উপকূলবর্তী সবকিছু। প্রকৃতির কাছে আমরা যে কত অসহায়, আমাদের ভবিষ্যৎ সুখ-কল্পনা যে প্রকৃতির এক মিনিটের ছোবলেই শেষ হয়ে যেতে পারে, তা নিয়ে আমরা তো ভাবতেই পারি না।
তবে কোনো ধ্বংসই শেষ কথা নয়। মানুষ তার সব সীমাবদ্ধতা নিয়েও মানুষের পাশে দাঁড়ায়, আর ক্রমাগত হাত বাড়িয়ে দেয়। যেমন বলা যায় বয়স্ক দম্পতি পুরুষোত্তম ও চূড়ামণির কথা। সুনামি কেড়ে নিয়েছিল তাদের দুই সন্তানকে। কিন্তু তারা দমেননি। দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেছেন ১৬ জন সুনামি অনাথকে। তারা প্রমাণ করে দিলেন, মানুষের এ ভালোবাসার সংসারে কেউই আসলে অনাথ নয়। এ রকম কিছু মানুষ শব্দহীন পায়ে আমাদের চারপাশে থাকেন। স্বপ্নকে কাজের খাঁচায় বন্দি করে ইতিহাস রচনার কারিগর হয়ে যান তারা। তাদের কর্মকা- সবাইকে বিস্ময়ে হতবাক, শ্রদ্ধায় নত আর আবেগে আপ্লুত করে দেয়। তাদের জন্যই আমরা বলতে পারি, এ পৃথিবী মধুময় হোক।
অ্যাডাপ্ট রিভারক্রুস্ট অদ্ভুত শোনালেও এ অভিনব ব্যাপারটি বাস্তবায়িত করতে চান ভারতীয় পরিবেশবিদ সুভাস দত্ত। তার মতে, লন্ডনে এমনটাই হয়েছে। টেমস ছিল পৃথিবীর অন্যতম দূষিত নদীগুলোর একটি। এর অবস্থা আমাদের শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা বা ভারতের গঙ্গার চেয়েও খারাপ ছিল। দুই বছর আগে লন্ডন ভ্রমণকালে আমার পরিচয় হয় টেমস-২১ নামে এক সংস্থার সঙ্গে। কী করে তারা? তারা সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে লন্ডন পোর্ট অথরিটি এবং লন্ডন মিউনিসিপ্যালিটির হাত ধরে টেমস সংস্কার করে। তাদের পরামর্শ মতো নাগরিকরাই নদীর তীর এবং সে এলাকার নদীর পানির দায়িত্ব নেন। সাধারণ অধিবাসীরা যেভাবে দেয় যন্ত্রপাতি, প্রয়োজনীয় সব উপকরণ। হিসাব রাখা হয় কত টন আবর্জনা উঠল। সংস্থাটি পানির অক্সিজেন, কার্বন মনোক্সাইডসহ বিভিন্ন নিরিখে মেপে দেখে। আমরা জানি সুইজারল্যন্ড, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, জার্মানির মতো পাঁচটি দেশের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীগুলো খুব পরিষ্কার। জনগণই তা পরিষ্কার রাখে। তাদের মতোই আমাদের নদীর দুই পাড়ের বিভিন্ন অংশ দত্তক দেওয়া হোক স্থানীয় জনগণকে।
ভারতের উড়িষ্যার দেওগড় জেলার গোড়ভাঙ্গা মিডল ইংলিশ স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা ৩০০ একরজুড়ে থাকা পাঙ্গুলুর অরণ্য রক্ষার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধেই তুলে নিয়েছে। পরে তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাও। ফলে বছর পনেরোর মধ্যেই ন্যাড়া হতে বসা একটা জমি এখন সবুজে সবুজে ভরে উঠেছে।
পুরো কর্মকা-ের পেছনে রয়েছেন মিডল স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তিনিই প্রথমে ছাত্রছাত্রীদের বোঝাতে শুরু করেন অরণ্যের উপকারিতা। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে নিয়ে নেমে পড়েন বন বাঁচাও আন্দোলনে। তারপর অবশ্য আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ছাত্রছাত্রীরাই কাঁধে তুলে নিয়েছে বন রক্ষার দায়িত্ব। দেওগড়ের বরকোট ব্লকের কয়েক কিলোমিটারের মধ্যেই পাঙ্গুলু পাহাড়। এর পাদদেশের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছিল অরণ্য; কিন্তু কাঠচোর আর জঙ্গল মাফিয়াদের উৎপাতে দ্রুত শেষ হয়ে আসতে থাকে বিশাল অরণ্য। প্রধান শিক্ষক প্রথমে পড়ার ফাঁকে, টিফিনের সময় লাঠি কাঁধে দল বেঁধে জঙ্গল পাহারা দেওয়ার কাজ শুরু করেন। পাশাপাশি অঞ্চলের বাসিন্দারাও কাজের সঙ্গী হয়ে পড়লেন অচিরেই। স্কুলের প্রায় জনা ষাটেক ছাত্র পালা করে জঙ্গলের ওপর নজর রাখতে শুরু করে। স্কুল থেকে পড়ালেখা শেষ করে চলে যাওয়ার পরও তারা জঙ্গল রক্ষা করে চলেছে। এমনও হয়েছে, ক্লাস চলাকালীন জঙ্গল থেকে গাছ কাটার শব্দ পেয়ে হইহই করে লাঠিসোটা নিয়ে দৌড়ে গেছে ছাত্ররা। কচি কচি হাতে কাঠ-শিকারিকে ঘিরে ফেলে তাকে প্রধান শিক্ষকের হাতে তুলে দিয়েছে। ধরা পড়ে অনেকেই নিজেদের দোষ স্বীকার করে বন রক্ষার কাজে শামিল হয়েছেন বলে জানান প্রধান শিক্ষক। এখন অবশ্য জঙ্গল ঘন হয়েছে। তাই গ্রামবাসী পাঙ্গুলু থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারেন। শুকনো ডালপালা, পাতা এসব। তবে আস্ত গাছ কাটার অনুমতি দেওয়া হবে না আগামী বছরগুলোতেও বলে জানা গেছে।
বর্ধমানের বেলুন গ্রামের সঞ্জয়, তন্ময়, সুমন, প্রবীর, কিংশুক, বিশ্বজয়Ñ এরা ক’জন বন্ধু। সবাই ছাত্র। কেউ কলেজের, কেউবা বিশ্ববিদ্যালয়ের। কেউই ভুবন বিখ্যাত পরিবেশবিদ নন। তীব্র ভালোবাসেন সাপ, ব্যাঙ, প্যাঁচা ইত্যাদি সব প্রকৃতির বন্ধুদের। গ্রামে কে কচ্ছপ ধরল, কোন পাখি ডিম পাড়ল, কোথায় এসে উদাস বসে আছে একজোড়া নীলকণ্ঠÑ বনেবাদাড়ে ঘুরে এসব খবর জোগাড় করেন তারা। এরপরই তন্ময়ের নির্দেশ, ওয়াচ করা এবং রিপোর্টে লেখা। কাটোয়া থেকে আট কিলোমিটার দূরে কাটোয়া আহমদপুর রেললাইন। তারই তীরঘেঁষে বেলুন, অম্বল, শিবলুন, পুরুলিয়া ও তালাড়ি গ্রাম। এসব জায়গার ঝোঁপঝাড়, পশুপাখি, কীটপতঙ্গ বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন তারা। কিন্তু ওখানে এতসব পান কী করে? এ তো রাজ্যের কীটপতঙ্গ? কারণ ওইসব গ্রামে কখনও কোনো কীটনাশক ব্যবহার করা হয়নি। মাঠভর্তি কেঁচোই চাষিদের কাজের সহায়। ফলে প্রকৃত বন্ধুরা এসব অঞ্চলে দাপিয়ে বেড়ায়। তন্ময়, প্রবীরদের সাহায্যে তারা টিকেও থাকে বহাল তবিয়তে। কোলাব্যাঙ অসুস্থ হলে সঞ্জয় তাকে সারিয়ে তোলেন। কারও বাড়িতে সাপ ঢুকলে সুমন সেটাকে ধরে জঙ্গলে ছেড়ে আসেন। আর তন্ময় বসে থাকেন প্যাঁচার সঙ্গে ভাব জমাতে রাতের পর রাত গাছের ডালে। সময়ে সময়ে তন্ময়রা জড়ো হন গ্রামের মেলায়, গঞ্জের হাটে-বাজারে। তারা ছবি এঁকে বোঝান কোন পোকা ক্ষতি করে, কোন পোকা কত উপকারী, কোন ব্যাঙ কতটা পোকা খায় এবং তাতে মানুষের কী লাভ ইত্যাদি।
কালিয়, জীবন, বসন্ত তারা কেউই পক্ষীবিদ সালিম আলীর নাম শোনেনি। তারা একেবারেই দরিদ্র শ্রেণির মানুষ। দিন আনে দিন খায় গোছের। কিন্তু প্রতি বছর নিজের সন্তানদের মতো বুক দিয়ে আগলে রাখেন পরিযায়ী পাখিদের। পশ্চিম উড়িষ্যার খরাশার খরাপ্রবণ আদিবাসী জেলা বড়বড়। এ জেলারই বালিজুড়ি, আম্ববহনা, নিলাজী। আর এ গ্রামগুলোর বাসিন্দারাই গত দশ বছর ধরে আগলে রেখেছেন দূরের দেশ থেকে আসা পরিযায়ী পাখিদের। এসব অঞ্চলের মানুষ একান্তভাবে ভালোবেসে ফেলেছেন দূরের এ অতিথিদের। তাদের বিশ্বাস, এরা এসে পৌঁছালেই বর্ষা নামে। শুরু হয় চাষের কাজ। তাই অতিথিরা তাদের কাছে ভাগ্যলক্ষ¥ী। গ্রামবাসীর আদরে বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখিরা বাসা বেঁধে থাকে প্রায় ছয় মাস। ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চা হওয়ার পর মাস দুয়েকের মধ্যেই স্বাবলম্বী হয়ে উঠে শাবকের দল। তখন আবার তারা ফিরে যায় যে দেশ থেকে তারা উড়ে এসেছিল, সে দেশের মাটির টানে। তবে তাদের মধ্যে কেউ কেউ অবশ্য বর্তমানে ওইসব অঞ্চলের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেছে। আদরের চোটেই তারা তাদের ধাত বদলে ফেলেছেÑ এমনটা মনে করেন এলাকার গ্রামবাসী।
পরিবেশ দূষণই সুনামির অন্যতম কারণÑ এমনটা মনে করেন একদল পরিবশেবাদী। গত শতকে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়েছে মাত্র ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। প্রাণিজগতে এর প্রভাব পড়েছে অপরিসীম। বিভিন্ন জৈব পরিবেশের জলবায়ু এতটাই বদলে যাচ্ছে যে, বিভিন্ন প্রজাতির বাসযোগ্য অঞ্চলের বিস্তার খুব দ্রুত কমে আসছে। বাড়বে নানা রোগ সৃষ্টিকারী ছত্রাক ও পরজীবী। এসব ঘটনা কোনো বিশেষ অঞ্চলের নয়, গোটা বিশ্বের। ক্রমে শুষ্কতার মুখোমুখি। অস্ট্রেলিয়া বা কোস্টারিকার অরণ্য থেকে শুরু করে অস্বাভাবিক দ্রুত গলতে থাকা সুমেরুর বরফরাজ্য সব জায়গার ছবি একই। বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয় প্রতি বছর ৫ জুন। এ দিবসেই রাস্তার দুই পাশে ময়লা-আবর্জনায় ভরাট থাকে। আমাদের এ শহরগুলোতে এখন প্রতিদিন কী পরিমাণ বর্জ্য পথঘাট ও নালায় জমছে, তার কোনো পরিসংখ্যান দেওয়া কি সম্ভব? ফলে এখানকার আবহাওয়া তার বাসিন্দাদের কাছেই বিপজ্জক হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, আমাদের দেশের শহরগুলোর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর পানি পান করে কোনো লোকের পক্ষে সুস্থ থাকা সম্ভব নয়। তাই সামগ্রিকভাবে শহর ও তার নাগরিকদের রক্ষা করতে এক ব্যাপক গণসচেতনতা তৈরি ও আন্দোলন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। কী বলেন আপনারা? একটা দিনের মধ্যে পরিবেশকে আটকে না রেখে যার যার ক্ষমতা ও সাধ্য অনুযায়ী কোনো একটা কাজের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করি আসুন।