সংগৃহীত।।

বাকশাল কি একদলীয় শাসন ছিল? ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি জাতীয় সংসদের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ, সংক্ষেপে বাকশাল প্রবর্তন করেন আর একই বছর ১৫ই আগস্ট তাঁকে তাঁর নিজ বাড়িতে সপরিবারে হত্যা করা হয়। হত্যার আগ পর্যন্ত বাকশালের সাংগঠনিক ভিত্তি তেমন একটা মজবুত হয়নি।বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর থেকে যখনই তাঁর শাসনামলের কথা ওঠে তখনই এক শ্রেণির রাজনীতিবিদ, ‘সুধী’ ব্যক্তি তাঁর শাসনামলের সাড়ে তিন বছরের অর্জনগুলোর কথা আলোচনা না করে সরাসরি বাকশাল বিষয়ে চলে যান এবং বলেন, শেখ মুজিব গণতন্ত্রকে হত্যা করার জন্য বাকশাল নামক একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করেছিলেন এবং কথা বলার স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবটা হচ্ছে, বাকশাল বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয় এবং বাকশাল ব্যবস্থা একটি ধারণাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। এটির ভালো-মন্দ বিচার করার মতো তেমন কোনো উদাহরণ ইতিহাসে নেই। আর যেকোনো ব্যবস্থা একটি সময়ের নিরিখে বিচার করাটা সমীচীন। একটা সময়ে যা বাস্তব ও প্রয়োজন ছিল তা অন্য সময়ে না-ও থাকতে পারে। যেমন—রুশ বিপ্লবের পর রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে লেনিন যে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিলেন সেটির বিকল্প তখন অন্য কিছু ছিল না। কিন্তু সেই ব্যবস্থা এখন প্রবর্তন করতে চাইলে তা বাস্তবমুখী হবে না। একই কথা চীনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ফিদেল কাস্ত্রোর কিউবা আর বর্তমান কিউবা এক নয়।আর কোনো দেশ যখন একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয় তখন শুরুতে দেশটিকে নিজ পায়ে দাঁড় করাতে যেসব ব্যবস্থা নিতে হয় পরবর্তীকালে তার অনেক কিছুই আর প্রাসঙ্গিক থাকে না। ভিয়েতনাম তার একটি বড় উদাহরণ। নেহরুর আমলের ভারতবর্ষের শাসনব্যবস্থা আর মোদি অথবা নেহরুর কন্যা ইন্দিরা গান্ধীর ভারতবর্ষের শাসনব্যবস্থা এক নয়। সময়ের প্রেক্ষাপটে অনেক কিছুই করতে হয় আবার সময়ের প্রেক্ষাপটে অনেক কিছুই বদলে যায় বা যেতে হয়। বাকশাল বিষয়টি আবারও সামনে চলে এসেছে এবং তা এসেছে বাকশালের প্রবর্তক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক কয়েকটি বক্তব্যে।বাকশালকে বুঝতে হলে তার প্রেক্ষাপট বুঝতে হবে এবং তার জন্য জাতীয় সংসদে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী বিল (বাকশাল প্রবর্তন) ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি গৃহীত হওয়ার পরের দিন জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধু যে দীর্ঘ ভাষণটি দিয়েছিলেন তা পড়তে হবে। একই সঙ্গে ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দেওয়া ভাষণ ও বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম বৈঠকে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দেওয়া তাঁর ভাষণটিও পড়তে হবে।১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশ-ভারত মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। ৯ মাসের যুদ্ধে বাংলাদেশ তখন সম্পূর্ণ যুদ্ধবিধ্বস্ত। কেমন যুদ্ধবিধ্বস্ত, তা আজকের প্রজন্মকে বোঝানো সহজ নয়। দেশের একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ঢাকার তেজগাঁও মিত্রবাহিনীর গোলায় বিধ্বস্ত। চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভাসমান মাইন (শক্তিশালী বোমা) দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে। দেশের প্রধান দুটি রেল সেতু, ভৈরব ও হার্ডিঞ্জ ধ্বংসপ্রাপ্ত, প্রায় চার হাজার ব্রিজ ও কালভার্ট চলাচলের অনুপযোগী, কোনো খাদ্যগুদামে এক ছটাক চাল নেই, ব্যাংকে নেই একটি টাকা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শূন্য, অথচ ভারত থেকে এক কোটি শরণার্থী ফিরছে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে ১২ তারিখ সরকার গঠন করে দেশকে আবার নিজের পায়ে দাঁড় করাতে লেগে গেলেন। তাঁর প্রথম কাজটি হলো মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে অস্ত্র জমা নেওয়া আর ভারতীয় সেনাবাহিনীকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো, যা তিনি করতে পেরেছিলেন। কিন্তু পরে দেখা গেল সব অস্ত্র জমা পড়েনি। সেগুলো পরবর্তীকালে ব্যবহৃত হয়েছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হত্যা করার জন্য। ১৯৭৪ সালের আগ পর্যন্ত পাঁচজন সংসদ সদস্যসহ হাজারের ওপর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে এই অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়েছে।সাধারণত কোনো একটি সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে একটি দেশ স্বাধীন হলে সেই দেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যেসব দল, ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিরোধিতা করে অথবা দখলদার বাহিনীকে সহায়তা করে তাদের ক্ষমা করা হয় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, ইতালি প্রভৃতি দেশে যারা হিটলার বাহিনীকে সহায়তা করেছিল, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই তাদের অনেককে ল্যাম্পপোস্টের সঙ্গে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। নেদারল্যান্ডসে সাংবিধানিকভাবে তাদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন উদার হৃদয়ের মানুষ। যারা হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটের সঙ্গে জড়িত ছিল তাদের ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেশ গড়ার কাজে সহায়তা করার জন্য তিনি আহ্বান জানিয়েছিলেন। ফিদেল কাস্ত্রো বঙ্গবন্ধুকে পরবর্তীকালে বলেছিলেন এটি তাঁর একটি ভুল সিদ্ধান্ত। কারণ এরাই একদিন তাঁর বিপক্ষে দাঁড়িয়ে যাবে। ঠিক তা-ই হয়েছিল। রাজাকার, আলবদর আর জামায়াতের সদস্যরা প্রথমে গিয়ে জুটল মওলানা ভাসানীর ন্যাপের পতাকা তলে। ১৯৭২ সালের অক্টোবর মাসে যখন জাসদ গঠিত হলো তখন অনেকে সেখানে আশ্রয় নিল। মাথাচাড়া দিয়ে উঠল নকশালবাড়ীর মন্ত্রে দীক্ষিত সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি, আবদুল হকের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (তখনো তারা নামও পরিবর্তন করেনি)। সবার একটাই স্লোগান—শেখ মুজিবকে অস্ত্রের মাধ্যমে উৎখাত করতে হবে। আবদুল হক তো পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ভুট্টোর কাছে শেখ মুজিবকে উৎখাত করার জন্য অস্ত্র আর অর্থ চেয়ে চিঠি দিলেন, যা ভুট্টো গুরুত্বসহকারে নিতে তাঁর সহকর্মীদের নির্দেশ দিলেন। এঁরা সবাই চীনা রাজনীতির ধারক-বাহক। আবদুল মতিন ও আলাউদ্দিন তো শেখ মুজিবকে উৎখাত করার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে রাজশাহী অঞ্চলে দিনভর যুদ্ধ করলেন। অন্যদিকে জামায়াতের আমির গোলাম আযম লন্ডনে পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধারের জন্য দোকান খুললেন। এই উৎখাতের রাজনীতিতে প্রচ্ছন্নভাবে ইন্ধন জোগালেন মওলানা ভাসানী ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত পত্রিকা ‘হক কথা’। জাসদ উৎখাত প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করতে গঠন করল তার নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী ‘গণবাহিনী’। রাতারাতি দেশে বিদেশি অর্থে প্রকাশ হওয়া শুরু হলো একাধিক দৈনিক পত্রিকা। এসব পত্রিকায় কোনো বিজ্ঞাপন না থাকা সত্ত্বেও তা মাসের পর মাস অসত্য ও অর্ধসত্য সংবাদ পরিবেশন করে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করা শুরু করল। এদিকে প্রতিবছর দেশে হয় অনাবৃষ্টি অথবা অতিবৃষ্টির কারণে সৃষ্ট বন্যা ফসল নষ্ট করেছে। সারা বিশ্বে খাদ্যের দাম চড়া। বিদেশ থেকে খাদ্য কিনে আনবে তেমন আর্থিক সংগতি বাংলাদেশের নেই। এরই মধ্যে মওলানা ভাসানী নিয়মিত ভুখা মিছিল করে চলেছেন। ঢালাও প্রচার করছেন বাংলাদেশের সব খাদ্য ভারতে পাচার হয়ে যাচ্ছে। দেশে খাদ্যই নেই, তো পাচার হওয়ার প্রশ্নই আসে না। যুক্তরাষ্ট্র খাদ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে বাংলাদেশের জন্য পিএল ৪৮০ প্রকল্পের অধীন পাওয়া খাদ্যবাহী জাহাজ মাঝপথ থেকে ফিরিয়ে নিল। দেশের মানুষকে বাঁচানোর জন্য বঙ্গবন্ধু দেশে পাঁচ হাজার ৭০০ লঙ্গরখানা খুললেন, যা তিনি সংসদে ও সংসদের বাইরে বলেছেন। টানাটানির সংসারে এটি যথেষ্ট ছিল না। দেশ ও দেশের মানুষকে বাঁচাতে যখন তিনি রাতের ঘুম হারাম করেছেন অন্যদিকে তখন তাঁকে উৎখাত করার জন্য পর্দার অন্তরালে প্রস্তুতি চলছে এবং তাতে সহায়তা দিচ্ছে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন সরকার। ১৯৭৪ সালের শেষের দিকে দেশের এই শত্রুরা সম্মিলিতভাবে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ভঙ্গুর করে দিয়েছে।অনেকে বলেন, বঙ্গবন্ধু নিজের অবস্থানকে পাকাপোক্ত করার জন্য বাকশাল পদ্ধতি চালু করেছিলেন। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ৩১৫টি আসনের মধ্যে ৩০৭টি আসনে জয়ী হয়েছিল। এই অবস্থায় তাঁর আসন পাকাপোক্ত করার কি কোনো প্রয়োজন ছিল? তিনি তাঁর এই নতুন পদ্ধতি চালু করার কারণ হিসেবে বলেছিলেন, তিনি দেশের সব দেশপ্রেমিক মানুষকে দেশ গড়ার কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন। কারণ তিনি জানতেন দেশের মঙ্গল কামনা করেন তেমন অনেক মানুষ তাঁর দলের বাইরে আছেন, তাঁদের সুযোগ দেওয়ার জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন। সেটি হতে পারে তাঁর এই নতুন ধারণা আর তিনি এই বাকশালকে বলতেন জাতীয় দল এবং তাতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ সদস্য হতে পারতেন, যদি তাঁরা দেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, দেশের মঙ্গল চান। এটি একদলীয় ব্যবস্থা ছিল না, ছিল একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে অন্যান্য দল বা পেশার মানুষও সম্পৃক্ত হতে পারে। নির্বাচনের সময় দল একাধিক প্রার্থীকে মনোনয়ন দেবে এবং দলীয় খরচে তাদের নির্বাচনী প্রচারের ব্যবস্থা হবে। জনগণ যাকে চাইবে তারা তাঁকে নির্বাচিত করবে। অনেকে বলে থাকেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই বঙ্গবন্ধু একটি জাতীয় সরকার গঠন করতে পারতেন। বাস্তবটা হচ্ছে, তখন তিনি তা করলে বলা হতো তিনি একজন একনায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি কাউকে সেই সুযোগ দেননি।১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এলে ইচ্ছা করলে তিনি বাকশালের নেতা হতে পারতেন। তিনি তা হননি। তিনি জানতেন যে ব্যবস্থা ১৯৭৪-৭৫ সালে বাস্তব ছিল তা ১৯৮১ সালে বাস্তব নয়। সব কিছুই সময়ের নিরিখে বিচার করতে হয়। মহিউদ্দিন আহম্মদ ও আবদুর রাজ্জাক চেষ্টা করেছিলেন বাকশাল পুনরুজ্জীবিত করতে। সফল হননি, কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে অনেক কিছু। তাঁরাও পরে আওয়ামী লীগে ফিরে এসেছিলেন। যে মানুষটি আজীবন লড়াই করেছেন কখনো পরাজিত হননি সেই বঙ্গবন্ধু ষড়যন্ত্রের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। তাঁর কন্যার বিরুদ্ধে বর্তমানে ষড়যন্ত্রের কত চাকা চালু আছে তা আঁচ করা কঠিন। বঙ্গবন্ধু কাছের মানুষ, যাদের তিনি বিশ্বাস করতেন পরবর্তীকালে তারাই ষড়যন্ত্রের আসল জোগানদাতা আর সহায়ক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তিনি সজাগ ছিলেন না, কারণ তিনি বাংলার মানুষকে বিশ্বাস করতেন।বাকশাল ব্যবস্থা আর ফিরবে না, কারণ বর্তমান প্রেক্ষাপট ভিন্ন, যা বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের শেষের দিকে অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। সে অবস্থা এখন আর নেই। বঙ্গবন্ধুকন্যার সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ দলকে আরো শক্তিশালী করা আর দলের ভেতরে ঢুকে পড়া পরগাছাগুলো ছেঁটে ফেলা। বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রত্যেক বক্তৃতায় দুর্নীতির প্রসঙ্গটাকে প্রাধান্য দিয়ে বলতেন, দেশটাকে শেষ করে দিচ্ছে দুর্নীতি। এবং এটাও বলতেন, এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত শিক্ষিত ব্যক্তিরা, সাধারণ খেটে হাওয়া মানুষ নয়। এটি বর্তমানে আরো বেশি সত্য। বঙ্গবন্ধুকন্যা এসব দিকে নজর দিলে আওয়ামী লীগ হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের অজেয় রাজনৈতিক দল।