ব্রাহ্মণবাড়িয়া।।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরে নৌকা ডুবাতে যে ‘নীলনকশা’ করা হয়েছে এর সঙ্গে জড়িতদের ব্যাপারে খোঁজখবর করছেন সরকারদলীয় নেতারা। সদরের নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করেন ১২ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল মান্নান ছাড়াও আলোচনায় রয়েছেন এই ম্যাজিস্ট্রেটরা। ভোটের দিন ও আগের রাতে বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের ওপর চড়াও হওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। ভোটের পরদিনই তাদের নামধাম সংগ্রহ করা হয়েছে সরকারি দলের পক্ষ থেকে। দলের একটি সূত্র জানিয়েছে, দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলায় অগ্রগামী ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের সহকারী কমিশনার-ভূমি কামরুজ্জামান। তিনি বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নানের নিকটাত্মীয়। এরই মধ্যে তার অপসারণ দাবি করেছে ছাত্রলীগ।
তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার দায়িত্বে ছিলেন। তার সঙ্গে বিজিবির স্ট্রাইকিং ফোর্সের নেতৃত্ব দেন নায়েক সুবেদার মো. আবদুর রহমান। এছাড়া অন্য ১১ জন ম্যাজিস্ট্রেটের মধ্যে নাটাই উত্তর ইউনিয়নে দায়িত্ব পালন করেন কুমিল্লা সেনানিবাসের এক্সিকিউটিভ অফিসার শেখ জাহিদুল ইসলাম। তার সঙ্গে ছিলেন বিজিবির হাবিলদার মো. কামরুল ইসলাম। সুহিলপুর ইউনিয়নের দায়িত্বে ছিলেন চট্টগ্রাম বিআরটিএর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. জিয়াউল হক মীর। তার সঙ্গে বিজিবি স্ট্রাইকিং ফোর্সের নেতৃত্বে ছিলেন হাবিলদার মো. হুমায়ুন কবির। চট্টগ্রাম পতেঙ্গা সার্কেলের সহকারী কমিশনার-ভূমি তাহমিলুর রহমান ছিলেন মাছিহাতা ইউনিয়নের দায়িত্বে। তার সঙ্গে বিজিবির স্ট্রাইকিং ফোর্সের নেতৃত্ব দেন সুবেদার মো. নূরুল ইসলাম। চট্টগ্রাম কাট্টলী সার্কেলের সহকারী কমিশনার-ভূমি এস এন শান্তুনু চৌধুরী দায়িত্ব পালন করেন বাসুদেব ইউনিয়নে। তার সঙ্গে ছিলেন বিজিবির নায়েক সুবেদার তফসিরুল তরফদার। মতলব উত্তরের সহকারী কমিশনার-ভূমি শুভাশিস ঘোষ দায়িত্ব পালন করেন রামরাইল ইউনিয়নে। বিজিবির নায়েক সুবেদার মো. দেলোয়ার হোসেন ছিলেন তার সঙ্গে। খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার আবদুল্লাহ আল বাকিউল বারী দায়িত্ব পালন করেন তালশহর পূর্ব ইউনিয়নে। তার সঙ্গে ছিলেন বিজিবির হাবিলদার বাবুল হোসেন। খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার উজ্জল কুমার হালদার দায়িত্ব পালন করেন মজলিশপুর ইউনিয়নে। তার সঙ্গে ছিলেন বিজিবির হাবিলদার বেলায়েত হোসেন। খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার শ্যামানন্দ কুণ্ডু দায়িত্ব পালন করেন সুলতানপুর ইউনিয়নে। তার সঙ্গে ছিলেন বিজিবির স্ট্রাইকিং ফোর্সের নায়েক সুবেদার মো. আফজল হোসেন। খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার নয়ন কুমার সাহা ছিলেন নাটাই দক্ষিণ ইউনিয়নের দায়িত্বে। তার সঙ্গে ছিলেন বিজিবি’র হাবিলদার মো. আবদুল আউয়াল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার সনজীব সরকার দায়িত্ব পালন করেন সাদেকপুর ইউনিয়নে। তার সঙ্গে ছিলেন বিজিবির হাবিলদার নিখিল চন্দ্র দাশ। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার তনিমা আফ্রাদ ছিলেন বুধল ইউনিয়নের দায়িত্বে। তার সঙ্গে ছিলেন বিজিবির হাবিলদার মো. আসাদুজ্জামান। বিজিবির পাশাপাশি তারা পুলিশের স্ট্রাইকিং ফোর্সেরও নেতৃত্ব দেন। এছাড়াও নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার মাসুদ হোসেন, চট্টগ্রাম ওয়াসার চিফ রেভিনিউ অফিসার মোহাম্মদ মাহমুদুল হক, পটিয়ার সহকারী কমিশনার-ভূমি মো. সাব্বির রহমান সানি, চন্দনাইশের সহকারী কমিশনার-ভূমি নিজাম উদ্দিন আহমেদ, আনোয়ারার সহকারী কমিশনার-ভূমি সাঈদুজ্জামান চৌধুরী, হাটহাজারীর সহকারী কমিশনার-ভূমি সম্রাট খীসা, রামগতির সহকারী কমিশনার-ভূমি সুচিত্র রঞ্জন দাস। আলোচনা রয়েছে বিভাগীয় কমিশনার তাদের সঙ্গে করে নিয়ে আসেন নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের জন্য। বিভাগীয় কমিশনার ভোটের দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের ৩-৪টি কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। এ সময় প্রশাসনের কর্মকর্তা ও স্থানীয় ঘনিষ্ঠ লোকজন তার সঙ্গে ছিলেন। তারা কেন্দ্রের মাঠে দাঁড়িয়ে ফটোসেশনও করেন। ওইদিন জেলার আরো ৪টি উপজেলায় নির্বাচন হলেও বিভাগীয় কমিশনার ওইসব উপজেলার কোথাও যাননি। দু’দিনের সফরে ৩০শে মার্চ তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া আসেন ভোটের আগের রাতে। তার দেয়া সফরসূচিতে দেখা যায় ওইদিন বিকাল ৪টায় তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উদ্দেশে চট্টগ্রাম ছাড়েন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সার্কিট হাউজে তার উপস্থিতি দেখানো হয়েছে সন্ধ্যা ৭টায়। পরদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত আখাউড়া, কসবা ও সদর উপজেলায় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু ওইদিন কসবা উপজেলায় কোনো নির্বাচনই ছিল না। কসবার প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। সদরের নির্বাচনে বিভাগীয় কমিশনারের তৎপরতা নিয়ে ফেসবুকে নানা কথা লেখা হচ্ছে। নৌকা ডুবিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে জেতাতে তার ব্রাহ্মণবাড়িয়া মিশন বলে অভিযোগ উঠেছে সরকারি দল থেকে। এদিকে বিভাগীয় কমিশনার তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের জবাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তিনি নির্ধারিত করে ৩ প্রার্থীর সঙ্গে কোনো বৈঠক করেননি। সে সময় আরো অনেকেই ছিলেন। কারা নির্বাচন করছে না করছে সেটাও জানেন না তিনি। তিনি আরো জানান, ভোট শুরুর পর তিনি এক ঘণ্টা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছিলেন। এরপর নির্বাচন সুষ্ঠু করার নির্দেশ দিয়ে চলে যান। তবে এই বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকার বলেন, আবদুল মান্নান কি বললেন না বললেন সেটা আমার বিবেচ্য নয়। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কামরুজ্জামান ও দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্যরা বিজিবি নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী-সমর্থকদের ওপর কোনো কারণ ছাড়া ভোটের আগের দিন থেকে নির্যাতন করতে শুরু করে। মারধর করে আহত করেছে দলের অনেক নেতাকর্মীকে।