চট্টগ্রাম।।

চট্টগ্রামের খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞ চিকিতসক অধ্যাপক প্রদীপ কুমার দত্ত। তিনি চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের (চমেক) উপাধ্যক্ষ ও কিডনি রোগ বিভাগের প্রধান। রোগী দেখার ক্ষেত্রে তিনি নামমাত্র ফি নেন। ১৮ বছরের বেশি সময় ধরে নিজ চেম্বারে ৩০০ টাকায় রোগী দেখেন এই চিকিতসক। শুধু তাই নয়, একবার রোগী দেখানোর পর ছয় মাসের মধ্যে এলে দ্বিতীয়বার আর ফি নেন না তিনি।

অধ্যাপক প্রদীপ কুমার দত্তের দেশি-বিদেশি ৬২টি গবেষণাপত্র রয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগই বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) অনুমোদিত। চিকিতসাশাস্ত্রে বিভিন্ন গবেষণাপত্র প্রকাশের পর তাঁকে লন্ডনের গ্ল্যাক্সো ইউনিভার্সিটি এবং আমেরিকার ফেলো কলেজ অব দ্য ফিজিশিয়ান সম্মানসূচক ডিগ্রি প্রদান করেছে।

জানা যায়, অধ্যাপক প্রদীপ কুমার দত্ত তাঁর চেম্বারে সপ্তাহে চার দিন ২০ জনের বেশি রোগী দেখেন না। চেম্বারে যেসব রোগী দেখেন তা তিনি নিজেই নাম অন্তর্ভুক্ত করেন। গড়ে ১৫ থেকে ২০ মিনিট করে দেখেন একেকজন রোগীকে। রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাবদ তিনি ল্যাব-ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে আরএফও নেন না। বরং তিনি সব রোগীকে গড়ে ৩০ শতাংশ বিশেষ ছাড় দেওয়ার জন্য ব্যবস্থাপত্রে লিখে দেন। ডা. প্রদীপ কুমার দত্তের ব্যবস্থাপত্র দেখলেই বেসরকারি ল্যাব-ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছাড় দেয়।

অধ্যাপক ডা. প্রদীপ কুমার দত্ত বলেন, ‘আমার মা-বাবা কেউ এখন বেঁচে নেই। মা আমাকে সব সময় বলতেন, মানুষ যাতে সহজে চিকিতসাসেবা পায় সেটা দেখবে। যাতে কেউ কষ্ট না পায়। কেউ কষ্ট পেলে তা নিজের ওপরে আসে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আগামী বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর আমার পিআরএলে যাওয়ার কথা রয়েছে। যত দিন বেঁচে থাকব মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চাই। আর ফিও বাড়াব না। আমৃত্যু ৩০০ টাকা ফি রাখতে চাই। আমাদের দেশে টাকার অভাবে অনেকে চিকিতসা করাতে না পেরে কষ্ট পাচ্ছে, তা ঠিক। রোগীর কষ্টের টাকা যাতে আমার ও পরিবারে প্রভাব না পড়ে তাই আমি ফি বাড়াব না।’

তিনি বলেন, ‘আমার চেম্বারে যারা যান তাদের মধ্যে যাদের ভর্তি প্রয়োজন তাদের আমি চট্টগ্রাম মেডিক্যালে ভর্তি হতে লিখে দিই। তাদের সাহস দিয়ে বলি, আমি তো হাসপাতালেও দেখতে পারব।’

ডা. প্রদীপ বলেন, সপ্তাহে সোম, বৃহস্পতি ও শুক্রবার ছাড়া অন্য চার দিন আমি চেম্বার করি। সকাল ৭টায় আমি নিজে রোগী ও স্বজনদের ফোন ধরে তাদের দেখার সময় দিয়ে থাকি। কে কয়টায় চেম্বারে আসবে এবং কতক্ষণ দেখব। ২০ জনের বেশি দেখি না। কারণ রোগীদের সময় দিতে হয়।’

কিডনি রোগ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. প্রদীপ কুমার দত্ত বলেন, ‘বাইরের দেশে কিডনি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে ১০ শতাংশ। কিন্তু আমাদের দেশে তা বেড়ে ১০ থেকে ১৬ শতাংশ। তবে কিডনি রোগটি প্রতিরোধযোগ্য। প্রতিরোধ করা সম্ভব। ডায়াবেটিস, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ রাখা যায়, পুষ্টিকর খাদ্য খাওয়া, শরীরে সংক্রামক রোগসমূহের দ্রুত চিকিতসা করা, নিয়মিত শারীরিক চর্চা, টেনশন না করাসহ বিভিন্ন পরামর্শ মানলে মানুষ বিভিন্ন রোগব্যাধি থেকে মুক্ত থাকবে।’

ডা. প্রদীপ কুমার দত্তের ফি কম নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি অধ্যাপক ডা. মুজিবুল হক খান বলেন, ‘পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় ধর্ম হলো মানব ধর্ম। একজন বড় চিকিতসক হয়েও ডা. প্রদীপ কুমার দত্ত চেম্বারে মাত্র ৩০০ টাকায় রোগী দেখেন। অথচ এত কম ফিতে বাংলাদেশে অন্য কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিতসক রোগী দেখেন না। আমরা তাঁর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিতসা অনুষদের ডিন ও চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. সেলিম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, ‘তিনি শুধু একজন বিশেযজ্ঞ চিকিতসক হয়েও অতি কম ফিতে চেম্বারে সীমিতসংখ্যক রোগী দেখেন তা নয়, তিনি একজন অসাধারণ শিক্ষকও। তাঁর সিরিয়াল পেতে অনেক কষ্ট হওয়ার কথা রোগীদের। কিন্তু ডা. প্রদীপ কুমার দত্ত রোগীর কথা চিন্তা করে যেমন ফি কম নেন, তেমনি নিজে নম্বর দেন। রোগীরা সহজেই তাঁকে দেখাতে পারে।’

তিনি আরো বলেন, ‘চিকিতসক হওয়ার পর রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতি অনেক দায়বদ্ধতা থাকে। জনগণের স্বার্থটাই আমাদের প্রথমে দেখতে হবে। যেটি ডা. প্রদীপ কুমার দত্ত সবাইকে দেখিয়েছেন।’