রিপন চৌধূরী।।

রাণী রাসমণির স্বপ্নের মন্দির দক্ষিণেশ্বরের কালী মন্দির আদতে শ্রীরামকৃষ্ণ তীর্থ। শ্রীরামকৃষ্ণ না থাকলে জানবাজারের রানীর তৈরি এই মন্দির কতটা পাদপ্রদীপে আসত সন্দেহ আছে। তবে সাহস দেখিয়েছিলেন রাণী। বাংলার ব্রাহ্মণ সমাজ যখন এই মন্দির বয়কট করেছেন, তখনও তিনি দমে যাননি। লড়াই চালিয়ে গেছেন। অবশেষে পাশে পেয়েছেন কামারপুকুরের সাহসী যুবক রামকুমারকে। আর দেশবাসী পেয়েছেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসকে।

রাণীর কথায়, কাশী যাওয়ার পথে স্বয়ং দেবী কালী তাঁকে স্বপ্নে এই মন্দির তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই মন্দির তৈরি করতে তখনকার দিনে রাণীর খরচ হয়েছিল প্রায় ৯ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা। ১৮৪৭-তে মন্দির নির্মাণ শুরু হয়ে শেষ হয় ১৮৫৫ সালে। ১০০ ফুটেরও বেশি উঁচু এই নবরত্ন মন্দিরের স্থাপত্য দেখার মতো। গর্ভগৃহে সহস্র পাপড়ির রৌপ্য-পদ্মের উপর শায়িত শিবের বুকে দেবী কালী দাঁড়িয়ে। এক খণ্ড পাথর কুঁদে তৈরি হয়েছে এই দেবীমূর্তি।

কৈবর্তের গড়া মন্দির তখনকার ব্রাহ্মণ সমাজ বয়কট করলেন। পূজারী হবেন না কেউ। অবশেষে হুগলির কামারপুর থেকে রামকুমার চট্টোপাধ্যায় এলেন পূজারী হয়ে। রামকুমারের পর তাঁর ভাই গদাধর দায়িত্ব নিলেন। কালে কালে গদাধর হলেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস। সাধক রামকৃষ্ণের সমস্ত ক্রিয়াকলাপের সঙ্গে জড়িয়ে দক্ষিণেশ্বরের এই মন্দির। তাঁর সারল্য ও মানবিক বোধের সংমিশ্রণে তিনি এখানে দেবী কালিকে ভবতারিণী রূপে উপাসনা করে বিখ্যাত হয়েছিলেন। শ্রী রামকৃষ্ণ বাসও করতেন মন্দির প্রাঙ্গণের উত্তর-পশ্চিম কোণের একটি ঘরে, আজ যা মহাতীর্থ। রোজ হাজার হাজার দর্শনার্থী আসেন তাঁকে প্রণাম জানাতে।
কাছেই পঞ্চবটি (অশ্বথ, বট, বিল্ব, অশোক ও আমলকী)। এখানে নিয়মিত সাধনায় বসতেন শ্রীরামকৃষ্ণ। মন্দির চত্বরে ঢোকার আগে রয়েছে রানি রাসমণির মন্দির। আর গঙ্গার পাড় ধরে রয়েছে দ্বাদশ শিবমন্দির। সুবিস্তীর্ণ মন্দির প্রাঙ্গণে আরেক দ্রষ্টব্য লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির।

কলকাতা ও তার পাশ্ববর্তী অঞ্চলের তীর্থস্থান বা বেড়ানোর জায়গা নিয়ে কোনও আলোচনাই দক্ষিণেশ্বরের কালী মন্দিরকে বাদ দিয়ে সম্ভব নয়।

আবার শোনা যায় রাণী রাসমনি মন্দির স্থাপনের জন্য বারাণসী সমতুল্য গঙ্গার পশ্চিমদিকে বালী, উত্তরপাড়া প্রভৃতি অঞ্চলে জমি সংগ্রহের চেষ্টা করেন। কিন্তু ঐ অঞ্চলের জমিদাররা রাণী রাসমনির প্রচুর অর্থের বিনিময়েও কোন স্থান বিক্রি করতে অনিচ্ছুক হন। কারণ তাঁদের জমিদারির মধ্যে অপরের ব্যায়ে নির্মিত ঘাটে গঙ্গায় স্নান করা, নিজেদের আভিজাত্যের দরুন তারা পছন্দ করেননি। অগত্যা রাণী রাসমনি গঙ্গার পূর্বকূল মন্দির নির্মাণের জন্য কেনেন।
কলকাতা থেকে ৫ মাইল উত্তরে গঙ্গার পূর্বকূলে উত্তর চব্বিশ পরগনার মধ্যে এই দক্ষিণেশ্বর গ্রাম। দক্ষিণেশ্বর নাম তখন জনগনের মধ্যে পরিচিত ছিল না এবং তা জনবহুলও ছিল না। মাঝে মাঝে জঙ্গল, বাগান, পুষ্করিণী, কবরস্থান প্রভৃতি ছিল এই অঞ্চলে। এখানে তৎকালীন স্থাপিত একমাত্র সরকারি বারুদখানা ম্যাগাজিনের, আর কিছু ইংরেজ ও স্থানীয় জমিদারদের ঘোড়ার গাড়ি যাতায়াত করত।

বড়িশার প্রখ্যাত জমিদার সাবর্ণ রায় চৌধুরী বংশের দুর্গাপ্রসাদ রায় চৌধুরী এবং ভবানীপ্রসাদ রায় চৌধুরী বড়িশা থেকে এসে দক্ষিণেশ্বরে যখন বসবাস শুরু করেন, তখন তাঁরাই এখানকার বনজঙ্গল পরিষ্কার করিয়ে গ্রামটির উন্নতি সাধন করেন ও বহু লোক এনে তাদের বসতি স্থাপন করান। এই বংশের যোগীন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের কৃপালাভ করেন ও স্বামী যোগানন্দ নামে পরিচিত হন।
নামটি “দক্ষিণেশ্বর”- তাই এখানে “ভুবনেশ্বর”, “তারকেশ্বর” “বক্রেশ্বর” প্রভৃতি স্থানের মতোন কোন শিবের সন্ধান পাওয়া যায় কিনা, সেই নিয়ে গবেষণায় লক্ষ্য করা যায়। বহুকাল আগে দেউলিপোতার জমিদার বানরাজা নাকি স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে একটি শিবের সন্ধান পান ও তার নিত্যসেবার জন্য তিনি মন্দিরও স্থাপন করেন। দক্ষিণবঙ্গে শিবটি প্রাপ্ত হওয়ার ফলে নামকরণ হল- ‘দক্ষিণেশ্বর’। সেখান থেকে গ্রামটির নামও দক্ষিণেশ্বর হয়। দক্ষিণেশ্বরের শিবতলা ঘাটের বুড়োশিবকেই সবাই ‘দক্ষিণেশ্বর শিব’ বলে মনে করেন। দক্ষিণ দিকের অধিপতিকে দক্ষিণেশ্বর বা দক্ষিণের ঈশ্বর বলা হয়। দক্ষিণেশ্বরের আদি নাম- শোণিতপুর বা সম্বলপুর।

দক্ষিণেশ্বরের কালী মন্দির স্থাপনের পর আরও অনেক মঠ-মন্দির স্থাপিত হয়। শ্রীরামকৃষ্ণ মহামণ্ডল, সারদা মঠ, যোগদামঠ, হরগৌরী মন্দির, আড়িয়াদহের “গদাধর পাঠবাড়ী”- অবশ্য অনেক প্রাচীন, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বরে থাকাকালীন যেতেন।
রাণী রাসমনির দলিল থেকে জানা যায়, এখানকার মোট সাড়ে চুয়ান্ন বিঘা স্থানটি ৪২ হাজার ৫০০ টাকায় কিনেছিলেন-কুঠিবাড়ী সমেত। এই কুঠিবাড়ীটিই এই উদ্দানের আদিবাড়ী,যা সামান্য সংস্কার হলেও এখনও প্রায় অপরিবর্তিত আছে।

১৮৪৭সালে ৬ সেপ্টেম্বর “বিল অফ সেল” এর মাধ্যমে জমিটি কেনা হলেও সেটি তখন রেজিস্ট্রি করা হয়নি, কারণ তখন রেজিস্ট্রেশন আইন ছিল না। পরে এই আইন বলবৎ হলে ১৮৬১ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি রাণী রাসমনি সম্পাদিত আরেকটি দেবত্তর দলিলের মধ্যে “বিল অফ সেল” এর উল্লেখ করেন, সেই দলিল ১৮৬১ সালে ২৭শে আগস্ট আলিপুর রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রি হয়, রাণি রাসমনির দেহ ত্যাগের ৬ মাস পর।
রেজিস্টার ছিলেন তারকনাথ সেন।
রাসমনি যখন জমিটি কেনেন তখন তার চৌহদ্দি ছিল-পূর্বদিকে কাশীনাথ রায় চৌধুরীর জমি, পশ্চিমদিকে গঙ্গা, উত্তরদিকে সরকারি বারুদখানা এবং দক্ষিণব জেমস হেস্টিংসের কারখানা। জমিকেনার পর পূর্বদিকে লোকালয় গড়ে ওঠে- বর্তমানে তার কতকঅংশ রেলওয়ে কোয়ার্টার।

দক্ষিণেশ্বরের জমি কেনার সঙ্গে সঙ্গেই ১৮৪৭-৪৮ সালে, এখানকার যাবতীয় নির্মাণ কাজ শুরু হয়, প্রথমদিকে রাণির প্রধান সহায়ক ছিলেন তার জ্যেষ্ঠ জামাতা রামচন্দ্র দাস। পরে রাণী রাসমনির তৃতীয় জামাতা মাথুরমোহন বিশ্বাসের ওপরই কাজের সমুদয় দায়িত্ব ন্যস্ত হয়। রাণি রাসমনি যেমন তার জামাতার থেকে সমস্ত কাজের খোঁজ নিতেন তেমনি নিজেও মাঝেমাঝে পরিদর্শন করতেন।
গঙ্গার ধারে পোস্তা, বাঁধ প্রভৃতি কাজ হওয়ার পর উত্তর-দক্ষিণ বরাবর গঙ্গার দিকে একই নকসা অনুযায়ী ১২টি শিবমন্দির, চাঁদনি, মন্দিরের পূর্বদিকে-উত্তর-দক্ষিণ বিস্তৃত মাটির টালি বাঁধানো একটি চতুষ্কোণ প্রাঙ্গন তৈরী করা হয়। আয়তন যার- ৪৪০ ফুট লম্বা ও ২২০ ফুট চওড়া। মন্দিরের সমগ্র এলাকার তিনপাশে দালানবাড়ী তৈরী করা হয়। মন্দিরের এলাকার বাইরে উত্তর ও দক্ষিণে একটি করে নহবতখানা নির্মাণ করা হয়। মন্দিরের নির্মাণ শুরু হয় ১৮৪৭-৪৮ সালে এবং মন্দির নির্মাণ সমাপ্ত হয় ১৮৫৪সালে।

সমস্ত কাজ সমাপ্ত হলেও রাণী রাসমনির কাজে বাঁধা পড়ল। উপযুক্ত দিনে মন্দির প্রতিষ্ঠা ও দেবীকে অন্নভোগ দেওয়ায় যখন রাণী রাসমনি সচেষ্ট তখনই তিনি কঠিন বাঁধার সম্মুখীন। কারণ রাণী জাতিতে শূদ্র হওয়ায় সামাজিক প্রথা অনুযায়ী কোন ব্রাহ্মণ এমনকি রাণীর গুরুদেবও দেবীকে অন্নভোগ দিতে রাজী ছিলেননা। তখন কলকাতার ঝামাপুকুর চতুষ্পাঠীর পণ্ডিত রামকুমার চট্টোপাধ্যায় তিনি বিধান পাঠান। তিনি বলেন মন্দির প্রতিষ্ঠার আগে কোন ব্রাহ্মণকে মন্দির দান করা যায় ও ব্রাহ্মণ যদি দেবীকে প্রতিষ্ঠা করে অন্নভোগ দেন তাহলে তা অশাস্ত্রীয় নয়। অগত্যা রাণী রাসমনি এই উদার মতাবলম্বী ব্রাহ্মণ পণ্ডিতকেই কাজ করার জন্য আহ্বান করেন। সমস্ত বাঁধা থাকলেও রামকুমার তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা রামকৃষ্ণকে(গদাধর) নিয়ে রাসমণির ইচ্ছায় বৃহস্পতিবার স্নানযাত্রার দিন ১৮৫৫ সালে ৩১ শে মে মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।

যে সময়ে এই মন্দিরটি নির্মিত হয় সেই সময়ে বাঙলার মন্দিরের সূত্রধর, শিল্পী সব অবলুপ্তির পথে। মূল মন্দিরের স্থাপত্য, মনোমুগ্ধকারী গঠননৈপুণ্য ও বিন্যাস-লালিত্যের অন্তরালে কোন স্থপতির প্রতিভা সেদিন মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল তার নামধাম জানা যায় না। কিন্তু মন্দিরের পরিকল্পনাতে নিকটবর্তী তিনটি মন্দিরের প্রভাব যে সুস্পষ্টরূপে প্রতিফলিত হয়েছিল তা David Macutchi এর The Temples of Calcutta in Bengal: Past & Present & Late Mediaeval Temples of Bengal, পঞ্চানন রায়ের “কলকাতার মন্দির ও মণ্ডপ” এবং লোকগাথা বা প্রচলকথা থেকে জানা যায়।

© ত্রিনয়না।