ফেনী।।

ভাইদের আদরের একমাত্র বোন, বাবা মায়ের কলিজার টুকরো ছিলো নুসরাত। সব সময় হাসি আনন্দে পুরো পরিবারকে মাতিয়ে রাখতো মেয়েটি।

পরিবারের মধ্যমণি সেই মানুষটি নির্মমতার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করায় উৎসবের ক্ষণ ঈদের দিনেও পুরো পরিবারে আনন্দের বদলে বইছে শোকাবহ পরিবেশ।

অন্যান্য বারের মতো নুসরাতের পরিবারে এবছর নেই ঈদের আনন্দ। উৎসবের আনন্দ না নিয়ে এই পরিবারে ঈদ এসেছে ‘শোকে’র আবহ নিয়ে।

বিগত ঈদের সময়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নুসরাতের কাটানো বিভিন্ন মুহূর্তের কথা স্মরণ করে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছেন তার স্বজনেরা।

বাড়িতে পড়ার টেবিল-চেয়ারসহ তার ব্যবহৃত জামা-কাপড় সবই পড়ে আছে। কিন্তু নেই শুধু নুসরাত। তাই তার নানা স্মৃতিতে কাতর পরিবারের সদস্যরা। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে নির্বাক নুসরাতের মা।

নৃশংসভাবে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করায় অকালে সবাইকে ছেড়ে চিরদিনের জন্য নুসরাত চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তার এ মৃত্যু কিছুতেই মানতে পারছে না পরিবার ও স্বজনেরা।

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি ছিলেন তিন ভাইয়ের মধ্যে একমাত্র বোন। মেধাবী নুসরাত মাদ্রাসার অধ্যক্ষর বিরুদ্ধে শ্লীলতহানির প্রতিবাদ করায় গত ৬ এপ্রিল কেরোসিন ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে দেয় অধ্যক্ষের অনুসারীরা।

টানা ৫ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে গত ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মৃত্যুর কাছে হার মানেন তিনি।

নুসরাতের অকাল মৃত্যুতে পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। মেয়েকে হারিয়ে মা এখন পাগলপ্রায়। নুসরাত না থাকায় এবার ঈদের নতুন জামা-কাপড়ও কিনেনি পরিবারের কোনো সদস্য।

বাবা-মা শুধুই তার স্মৃতি খুঁজে বেড়াচ্ছেন সবখানে। প্রতিবছর পরিবার ঈদ কিভাবে উদযাপন করবে, কে কি খাবে সব পরিকল্পনা আগে থেকেই করতেন নুসরাত।

আর এসব বলেই ডুকরে কেঁদে উঠলেন নুসরাতের মা শিরিন আক্তার।

ঈদের দিনেও কাঁদতে কাঁদতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন তিনি। বলছিলেন, আমার মাইয়াটা (মেয়েটা) ছিলো আমার বুকের ধন। সারাদিন আমার চারপাশে ঘোরাঘুরি করতো। ঈদের দিন ভাইরা কি খাবে, মেহমানরা কি খাবে এসব করতো মেয়েটা। আজ আমার মেয়েটা নাই, ওরা আমার মেয়েরে খুন করে ফেলছে।

এদিকে গত ৩০ তারিখ নুসরাত হত্যার ২১ আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। ওইদিন তারা নুসরাতের পরিবারসহ আইনজীবীদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেয়।

এতে এখনও অজানা আতঙ্কে রয়েছেন বলে জানান তারা। নুসরাত হত্যা মামলার বাদী তার ভাই মাহমুদুল হাসান বলেন, আমরা আতঙ্কে রয়েছি।

পাশাপাশি মামলার চার্জশিটে সোনাগাজীর তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেমসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ না করায় হতাশ বলে জানান তিনি।

তবে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে নুসরাতের বাড়িতে সার্বক্ষণিক পাহারায় রয়েছে পুলিশ। এ বিষয়ে ফেনীর পুলিশ সুপার মো. মনিরুজ্জামান বলেন, নুসরাতের পরিবারকে নিরাপত্তা দিতে পুলিশ সবসময় তৎপর রয়েছে।

উল্লেখ্য, ১০ জুন নুসরাত হত্যা মামলার চার্জশিটগ্রহণের শুনানির দিন ধার্য় রয়েছে। ওইদিন চার্জশিট গ্রহণ হলে মামলার বিচারকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।