বরগুনা।।

বরগুনায় আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যার ঘটনায় স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি আজ রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। গতকাল শনিবার রাতে তার শশুরের সংবাদ সম্মেলনের পর এবং আজ সকালে তার বিরুদ্বে মানববন্দনের পর তিনি এই পদক্ষেপ নেন। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে মুখ খোলেন তিনি।

আজ দুপুর ১২টার দিকে মিন্নি মাইঠা গ্রামে তাঁর বাবার বাড়িতে ডাকা সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য দেন। এতে তিনি অভিযোগ করেন, যারা বরগুনায় ‘বন্ড ০০৭’ নামে সন্ত্রাসী গ্রুপ সৃষ্টি করিয়েছিলেন, তাঁরা খুবই ক্ষমতাবান ও বিত্তশালী। নেপথ্যের এই ক্ষমতাবানেরা বিচারের আওতা থেকে দূরে থাকা ও এই হত্যা মামলাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য শ্বশুরকে চাপ দিয়ে এই সংবাদ সম্মেলন করিয়েছেন।

আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি অভিযোগ করেন, ‘নয়ন বন্ড একজন মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ী। তাঁর নামে অনেক মামলা ছিল। সে আমাকে দীর্ঘদিন ধরে উত্ত্যক্ত করত। আমার ছোট ভাই ও বাবাকে হত্যার হুমকি দিত। এ জন্য তাঁর বিরুদ্ধে কখনো মুখ খোলার সাহস পাইনি।’ তিনি বলেন, ‘আমার শ্বশুর অসুস্থ। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে তিনি আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আমার স্বামীকে হত্যার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাকে নিয়ে নেতিবাচক, কুরুচিপূর্ণ নানা পোস্ট এবং এডিট করা ছবি আপলোড করে একটি মহল আমার বিরুদ্ধে শুরু থেকেই ষড়যন্ত্র শুরু করে। এর মূল উদ্দেশ্য এই ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা। কারণ, ০০৭ সন্ত্রাসী গ্রুপটি যারা সৃষ্টি করেছিলেন, তাঁরা খুবই ক্ষমতাবান ও বিত্তশালী।’

রিফাত শরীফের স্ত্রী মিন্নি ঘটনার দিন নিজের ভূমিকা প্রসঙ্গে বলেন, ‘ঘটনার দিন আমার স্বামীকে কোপানোর সময় আমি প্রাণপণ চেষ্টা করেছি তাঁকে বাঁচাতে। এমনকি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধের চেষ্টা করেছি। এরপর রক্তাক্ত অবস্থায় আমিই রিকশায় করে রিফাত শরীফকে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাই। যখন চিকিৎসকেরা তাঁকে বরিশালে পাঠাতে বলেন, তা শুনে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। জ্ঞান ফিরলে আমি জানতে পারি তাঁকে (রিফাত শরীফ) বরিশালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’

ফেসবুকে আপনার নামে গত ২৭ জুন ১১টি আইডি দেখা যায়, গতকাল শনিবার রাতেও চারটি আইডির সন্ধান পাওয়া যায়—এগুলো কি আপনার? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মিন্নি বলেন, ‘এগুলো সবই ষড়যন্ত্র। কোনো সুস্থ ব্যক্তি এটা করে? আমাকে নেতিবাচকভাবে প্রচারের জন্যই এসব করা হয়েছে। এসব কারা করেছে, তা তদন্ত করলেই বের হয়ে আসবে।’

রিফাতের সঙ্গে বিয়ের পরও নয়নদের বাড়িতে যাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে মিন্নি বলেন, ‘এটা মিথ্যা ও বানোয়াট কথা। আর নয়ন বন্ডের সঙ্গে আমার যে আগে বিয়ে হওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে, সেটাও মিথ্যা। কারণ, নয়ন বন্ড আমাকে জোর করে ধরে একটি বাড়িতে নিয়ে একটা কাগজে সই রেখেছিল। এরপর কী করেছে সেটা জানি না। পরে শুনি সেটা বিয়ের কাবিননামা।

মিন্নি বলেন, ‘বিয়ের দুই মাস পর স্বামীকে হারালে একজন নারীর মানসিক অবস্থা কেমন থাকতে পারে! তার ওপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনবরত কুৎসা এবং বাজে ছবি পোস্ট দেওয়ার কথা শুনে আমি আরও বিপর্যস্ত। রিফাতকে হত্যার পর থেকেই আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমাদের বাড়িতে পুলিশ প্রহরার ব্যবস্থা করায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ সুপারকে ধন্যবাদ। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন জানাতে চাই, আমি একজন স্বামীহারা অসহায় নারী। এই সুযোগে আমার বিরুদ্ধে যারা মিথ্যাচার ও ষড়যন্ত্র করছে, তাদের বিচারের আওতায় আনা হোক।’

এদিকে আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির গ্রেপ্তারের দাবিতে আজ বেলা ১১টায় বরগুনা প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন হয়েছে। মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, রিফাত হত্যায় তাঁর স্ত্রী মিন্নি জড়িত। ‘বরগুনার সর্বস্তরের জনগণ’-এর ব্যানারে এ মানববন্ধন করা হয়। এতে অংশ নেন রিফাতের বাবা আবদুল হালিম শরীফ।

মানববন্ধনে রিফাত শরীফের বাবা আবদুল হালিম শরীফ, চাচা আবদুল আজিজ শরীফ, আবদুস সালাম শরীফ, বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক এবং বরগুনা সদর আসনের সাংসদের ছেলে সুনাম দেবনাথ, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা মারুফ মৃধা প্রমুখ বক্তব্য দেন। সমাবেশে রিফাত শরীফের বাবা বলেন, ‘আমার ছেলেকে হত্যার পেছনে মিন্নির হাত আছে বলে আমরা মনে করি। তাঁকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে এই হত্যার মূল রহস্য বের হয়ে আসব।’

সমাবেশে সুনাম দেবনাথ বলেন, ‘আমি মনে করি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেসব ভিডিও ও ছবি দেখা যাচ্ছে, রিফাত শরীরের পরিবারের পক্ষ থেকে যেসব অভিযোগ ওঠে এসেছে; সেগুলো নিয়ে বড় ধরনের তদন্ত হওয়া দরকার। তাদের আইনের আওতায় আনা দরকার। রিফাত শরীফের বাবা যে অভিযোগ এনেছেন, পুলিশের উচিত সেটা তদন্ত করা।’

এর আগে গতকাল রাত আটটার দিকে রিফাতের বাবা আবদুল হালিম শরীফ বরগুনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে মিন্নির গ্রেপ্তার দাবি করেন। ওই সংবাদ সম্মেলনে আজ মানববন্ধন করার ঘোষণা ছিল না। তবে গতকাল গভীর রাতে ফেসবুকে এক ব্যক্তি মানববন্ধনের কথা জানিয়ে পোস্ট দেন।

গতকাল রাতে বরগুনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে রিফাতের বাবা আবদুল হালিম শরীফ অভিযোগ করেন, এই হত্যাকাণ্ডে রিফাত শরীফের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি জড়িত। মিন্নি প্রতিদিন একাই কলেজে যেত। ঘটনার দিনও একা গেছে। পরে ফোন করে রিফাতকে কলেজে ডেকে নেয় মিন্নি। তিনি অভিযোগ করেন, মিন্নি ও তাঁর পরিবার এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত নয়ন বন্ডের সঙ্গে তাঁর আগের বিয়ের কথা গোপন করেন এবং নয়ন বন্ডকে তালাক না দিয়েই তাঁর ছেলেকে (রিফাত শরীফ) বিয়ে করেন। বিয়ের পরও মিন্নি নয়নের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। এমনকি নিয়মিত নয়নদের বাসায় যেতেন।

মিন্নির বিরুদ্ধে ওঠা আনা এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন গতকাল রাতে বলেন, ‘বিষয়গুলো আমরা দেখব। মামলাটি তদন্ত হচ্ছে। আর তদন্ত হলো একটি সাবলীল, নিরপেক্ষ বিষয়। অনেকে অনেক কথা বলতে পারেন। সুষ্ঠু তদন্ত করে ন্যায়বিচারের স্বার্থে যা যা করা দরকার, সেটা করা হবে।’

গত ২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরগুনা সরকারি কলেজের মূল ফটকের সামনের রাস্তায় স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির সামনে কুপিয়ে জখম করা হয় রিফাত শরীফকে। বেলা তিনটার দিকে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রিফাতের মৃত্যু হয়। পরের দিন এই ঘটনায় রিফাতের বাবা আবদুল হালিম শরীফ বাদী হয়ে বরগুনা থানায় ১২ জনের নামে এবং চার-পাঁচজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে হত্যা মামলা করেন।