বরগুনায় আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার এক নম্বর সাক্ষী ও নিহতের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে সারাদিন প্রায় ১৩ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর রাতে গ্রেফতার দেখিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার তদন্তে নতুন মোড় নিল। মিন্নিকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে স্বামীর হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে গেলেন স্ত্রী। রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আজ বুধবার মিন্নিকে আদালতে তোলা হবে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল পৌনে ১০টার দিকে সদর উপজেলার নয়াকাটা গ্রামের বাড়ি থেকে মিন্নিকে বরগুনা পুলিশ লাইন্সে নিয়ে যাওয়া হয়। তার বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোরকেও তার সঙ্গে নেওয়া হয়। মিন্নিকে গ্রেফতার দেখানোর পর রাতেই তার বাবাকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন জানান, প্রাথমিকভাবে রিফাত হত্যায় তার স্ত্রী মিন্নির সংশ্নিষ্টতা পাওয়া গেছে। তাই এই মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। পুলিশ সুপার আরও বলেন, বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণ করে রিফাত হত্যা পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নে মিন্নির প্রত্যক্ষ যোগসূত্র মিলেছে। হত্যাকারীদের সঙ্গে পূর্ব যোগাযোগ ও ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। রিমান্ডে এনে এ ব্যাপারে তাকে আরও বিশদ জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। রাত সাড়ে ৯টায় বরগুনায় নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও সুদীর্ঘ সময় ধরে প্রাপ্ত তথ্যাদি পর্যালোচনা এবং বিশ্নেষণপূর্বক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মিন্নির সংশ্নিষ্টতা প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়। তাই মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটন এবং সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর আগে গতকাল দুপুরে বরগুনার পুলিশ সুপার জানিয়েছিলেন, মিন্নিকে মামলার সাক্ষী হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আরও কিছু ব্যাপারেও তার বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বরগুনা থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. হুমায়ুন কবির জবানবন্দি নেওয়ার জন্য মিন্নিকে নিয়ে এসেছেন। তদন্তের স্বার্থে যে কোনো সময় সিদ্ধান্ত যে কোনো দিকে মোড় নিতে পারে। মিন্নির বাবা মো. মোজাম্মেল হোসেন কিশোর জানান, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বরগুনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহজাহানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি টিম তার বাড়ি থেকে মিন্নিকে ও তাকে কালো মাইক্রোবাসে বরগুনা পুলিশ লাইন্সে নিয়ে যায়। এ সময় পুলিশ জানায়, একজন আসামি শনাক্ত করার জন্য মিন্নিকে নিতে হবে। গতকাল বিকেল ৫টা ২৩ মিনিটের সময় মিন্নির বাবার কাছে মোবাইলফোনে সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে চাইলে তিনি জানান, মিন্নির কাছ থেকে তাকে সকাল ১১টার দিকে আলাদা করে রাখা হয়েছে। তাকে পুলিশ লাইন্সের গোলঘরে বসতে বলা হয়েছে। মিন্নিকে কোথায় রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। গত ২৬ জুন ঘটনার পর থেকে মিন্নি বাড়িতে পুলিশ পাহারায় ছিলেন। সম্প্রতি ঘটনার একটি নতুন ভিডিও প্রকাশ পেলে একটি মহল এ মামলায় মিন্নিকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি আলোচিত হয়। গত ১৩ জুলাই রাতে নিহত রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বরগুনা প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে এ মামলায় গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানান। পরদিন ১৪ জুলাই সকালে বরগুনা প্রেস ক্লাবের সামনে সর্বস্তরের জনগণের ব্যানারে মিন্নিকে গ্রেফতারের দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। এ সময় নিহত রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ, চাচা আবদুল আজীজ শরীফ, জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক এমপিপুত্র অ্যাডভোকেট সুনাম দেবনাথ ও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান মারুফ মৃধা বক্তৃতা করেন। এর পর থেকে শহরে গুঞ্জন শুরু হয়, মিন্নিকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে অথবা গ্রেফতার করবে। বরগুনা জেলা অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতে দায়িত্বরত অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর ও জেলা মানবাধিকার জোটের সভাপতি অ্যাডভোকেট সঞ্জীব দাস বলেন, রিফাত শরীফ হত্যা মামলার প্রধান ও প্রত্যক্ষ সাক্ষী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে এ মামলায় আসামি হিসেবে গ্রেফতার করা হলে এজাহারভুক্ত আসামিদের বিচারে জটিলতা হতে পারে। এমনকি নৃশংস এ ঘটনায় সম্পৃক্ত মূল আসামিরা আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে। এ ব্যাপারে বরগুনা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুর রহমান নান্টু বলেন, মিন্নিকে আসামি হিসেবে গ্রেফতার করা হলে রিফাত শরীফ হত্যা মামলা ডিফেক্টিভ হবে। উচিত ছিল, তাকে সাক্ষী রেখেই তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা। মিন্নিকে প্রধান সাক্ষী রেখে প্রসিকিউশন তৈরি হতে থাকলে, সেখান থেকে ফিরিয়ে আনা হলে তখন বিষয়টি ডিফিকাল্ট হয়। তিনি বলেন, এই মামলায় মিন্নি শুধু সাক্ষী নয়, আই উইটনেসও বটে। মামলা বিচারে উঠলে অনেকেই সন্ত্রাসীদের ভয়ে সাক্ষ্য দিতে চাইবেন না। তখন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বরগুনা প্রেস ক্লাবের সভাপতি চিত্তরঞ্জন শীল বলেন, রিফাত হত্যা মামলা মিন্নির আকুতির কারণেই গুরুত্ব পেয়েছে এবং এ পর্যন্ত এসেছে। এখন কোনো কারণে যদি মিন্নি এ মামলায় আসামি হয়ে যায়, তাহলে মামলার বিচার ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে পারে। তিনি বলেন, মিন্নি দোষী হলে তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে কোনো বাধা নেই। তবে কোনো মহলের চাপে অথবা প্রভাবের কারণে মামলার মূল আসামিরা রক্ষা পেয়ে যাবে, এটা বরগুনার মানুষ একেবারেই কামনা করে না। গুঞ্জন রয়েছে, ঘটনার আগের দিন ও ঘটনার দিন ঘাতক নয়ন বন্ড মিন্নির সঙ্গে কথা বলেছে। নয়ন বন্ডের মোটরসাইকেলে মিন্নি ঘুরেছেন। তবে পুলিশ হেফাজতে যাওয়ার আগে মিন্নি এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ঘটনার দিন বা আগের দিন নয়ন বন্ডের সঙ্গে তার কোনো কথা হয়নি। শুরু থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পক্ষ তাকে টার্গেট করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে। এসব কারণে তিনি মানসিকভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত। ঘটনার আগের দিন মিন্নি রিফাত শরীফের এক আত্মীয়ের বাসায় পরিবারের সব সদস্যকে নিয়ে নিমন্ত্রণে গিয়েছিলেন। ভাইরাল হওয়া সিসিটিভির যে ফুটেজ নিয়ে বিতর্ক চলছে তাতে দেখা যায়, ঘটনার দিন কলেজের গেট থেকে মিন্নি বেরিয়ে আসছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন রিফাত শরীফ। এদিক-সেদিক তাকিয়ে আবার রিফাতকে কলেজে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন মিন্নি। তখন দুর্বৃত্তরা কলেজ গেট থেকে রিফাতকে ধরে সামনের দিকে নিয়ে যায়। এ সময় মিন্নিকে হাঁটতে দেখা যায়। এরপর নয়ন বন্ড ও অন্যরা যখন রিফাতকে কিল-ঘুষি-লাথি মারতে শুরু করে, তখন তিনি তার স্বামীকে বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা চালান। এই ভিডিওর সূত্রে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, দুর্বৃত্তরা রিফাতকে ধরে নেওয়ার সময় মিন্নি কেন স্বাভাবিকভাবে হাঁটছিলেন? কেন দুর্বৃত্তরা তাকে টার্গেট করেনি? কেন স্বামীকে প্রথমে ধরতে না গিয়ে জুতা তোলার চেষ্টা করেছিলেন মিন্নি? গত ২৬ জুন সকালে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে দুর্বৃত্তরা প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে রিফাত শরীফকে। এ ঘটনায় পরের দিন ২৭ জুলাই ১২ জনের নাম উল্লেখ করে নিহত রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বাদী হয়ে বরগুনা থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় এখন পর্যন্ত এজাহারভুক্ত সাতজন এবং জড়িত সন্দেহে সাতজনসহ মোট ১৪ আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যার মধ্যে মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে 'বন্দুকযুদ্ধে' মারা গেছে। এ পর্যন্ত গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে এজাহারভুক্ত চারজন এবং জড়িত সন্দেহে ছয়জনসহ মোট ১০ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। বাকি তিনজনকে পুলিশ বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।"/>

রিফাত হত্যা মামলায় স্ত্রী মিন্নি গ্রেপ্তার তদন্তে ভিন্ন মোড় নিচ্ছে

17 July, 2019 : 5:33 am ১৫৫

বিশেষ প্রতিবেদক।।

বরগুনায় আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার এক নম্বর সাক্ষী ও নিহতের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে সারাদিন প্রায় ১৩ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর রাতে গ্রেফতার দেখিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার তদন্তে নতুন মোড় নিল। মিন্নিকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে স্বামীর হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে গেলেন স্ত্রী। রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আজ বুধবার মিন্নিকে আদালতে তোলা হবে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল পৌনে ১০টার দিকে সদর উপজেলার নয়াকাটা গ্রামের বাড়ি থেকে মিন্নিকে বরগুনা পুলিশ লাইন্সে নিয়ে যাওয়া হয়। তার বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোরকেও তার সঙ্গে নেওয়া হয়। মিন্নিকে গ্রেফতার দেখানোর পর রাতেই তার বাবাকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন জানান, প্রাথমিকভাবে রিফাত হত্যায় তার স্ত্রী মিন্নির সংশ্নিষ্টতা পাওয়া গেছে। তাই এই মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
পুলিশ সুপার আরও বলেন, বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণ করে রিফাত হত্যা পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নে মিন্নির প্রত্যক্ষ যোগসূত্র মিলেছে। হত্যাকারীদের সঙ্গে পূর্ব যোগাযোগ ও ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। রিমান্ডে এনে এ ব্যাপারে তাকে আরও বিশদ জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
রাত সাড়ে ৯টায় বরগুনায় নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও সুদীর্ঘ সময় ধরে প্রাপ্ত তথ্যাদি পর্যালোচনা এবং বিশ্নেষণপূর্বক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মিন্নির সংশ্নিষ্টতা প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়। তাই মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটন এবং সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এর আগে গতকাল দুপুরে বরগুনার পুলিশ সুপার জানিয়েছিলেন, মিন্নিকে মামলার সাক্ষী হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আরও কিছু ব্যাপারেও তার বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বরগুনা থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. হুমায়ুন কবির জবানবন্দি নেওয়ার জন্য মিন্নিকে নিয়ে এসেছেন। তদন্তের স্বার্থে যে কোনো সময় সিদ্ধান্ত যে কোনো দিকে মোড় নিতে পারে।
মিন্নির বাবা মো. মোজাম্মেল হোসেন কিশোর জানান, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বরগুনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহজাহানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি টিম তার বাড়ি থেকে মিন্নিকে ও তাকে কালো মাইক্রোবাসে বরগুনা পুলিশ লাইন্সে নিয়ে যায়। এ সময় পুলিশ জানায়, একজন আসামি শনাক্ত করার জন্য মিন্নিকে নিতে হবে। গতকাল বিকেল ৫টা ২৩ মিনিটের সময় মিন্নির বাবার কাছে মোবাইলফোনে সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে চাইলে তিনি জানান, মিন্নির কাছ থেকে তাকে সকাল ১১টার দিকে আলাদা করে রাখা হয়েছে। তাকে পুলিশ লাইন্সের গোলঘরে বসতে বলা হয়েছে। মিন্নিকে কোথায় রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।
গত ২৬ জুন ঘটনার পর থেকে মিন্নি বাড়িতে পুলিশ পাহারায় ছিলেন। সম্প্রতি ঘটনার একটি নতুন ভিডিও প্রকাশ পেলে একটি মহল এ মামলায় মিন্নিকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি আলোচিত হয়। গত ১৩ জুলাই রাতে নিহত রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বরগুনা প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে এ মামলায় গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানান। পরদিন ১৪ জুলাই সকালে বরগুনা প্রেস ক্লাবের সামনে সর্বস্তরের জনগণের ব্যানারে মিন্নিকে গ্রেফতারের দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। এ সময় নিহত রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ, চাচা আবদুল আজীজ শরীফ, জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক এমপিপুত্র অ্যাডভোকেট সুনাম দেবনাথ ও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান মারুফ মৃধা বক্তৃতা করেন। এর পর থেকে শহরে গুঞ্জন শুরু হয়, মিন্নিকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে অথবা গ্রেফতার করবে।
বরগুনা জেলা অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতে দায়িত্বরত অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর ও জেলা মানবাধিকার জোটের সভাপতি অ্যাডভোকেট সঞ্জীব দাস বলেন, রিফাত শরীফ হত্যা মামলার প্রধান ও প্রত্যক্ষ সাক্ষী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে এ মামলায় আসামি হিসেবে গ্রেফতার করা হলে এজাহারভুক্ত আসামিদের বিচারে জটিলতা হতে পারে। এমনকি নৃশংস এ ঘটনায় সম্পৃক্ত মূল আসামিরা আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে।
এ ব্যাপারে বরগুনা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুর রহমান নান্টু বলেন, মিন্নিকে আসামি হিসেবে গ্রেফতার করা হলে রিফাত শরীফ হত্যা মামলা ডিফেক্টিভ হবে। উচিত ছিল, তাকে সাক্ষী রেখেই তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা। মিন্নিকে প্রধান সাক্ষী রেখে প্রসিকিউশন তৈরি হতে থাকলে, সেখান থেকে ফিরিয়ে আনা হলে তখন বিষয়টি ডিফিকাল্ট হয়। তিনি বলেন, এই মামলায় মিন্নি শুধু সাক্ষী নয়, আই উইটনেসও বটে। মামলা বিচারে উঠলে অনেকেই সন্ত্রাসীদের ভয়ে সাক্ষ্য দিতে চাইবেন না। তখন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বরগুনা প্রেস ক্লাবের সভাপতি চিত্তরঞ্জন শীল বলেন, রিফাত হত্যা মামলা মিন্নির আকুতির কারণেই গুরুত্ব পেয়েছে এবং এ পর্যন্ত এসেছে। এখন কোনো কারণে যদি মিন্নি এ মামলায় আসামি হয়ে যায়, তাহলে মামলার বিচার ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে পারে। তিনি বলেন, মিন্নি দোষী হলে তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে কোনো বাধা নেই। তবে কোনো মহলের চাপে অথবা প্রভাবের কারণে মামলার মূল আসামিরা রক্ষা পেয়ে যাবে, এটা বরগুনার মানুষ একেবারেই কামনা করে না।
গুঞ্জন রয়েছে, ঘটনার আগের দিন ও ঘটনার দিন ঘাতক নয়ন বন্ড মিন্নির সঙ্গে কথা বলেছে। নয়ন বন্ডের মোটরসাইকেলে মিন্নি ঘুরেছেন। তবে পুলিশ হেফাজতে যাওয়ার আগে মিন্নি এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ঘটনার দিন বা আগের দিন নয়ন বন্ডের সঙ্গে তার কোনো কথা হয়নি। শুরু থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পক্ষ তাকে টার্গেট করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে। এসব কারণে তিনি মানসিকভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত। ঘটনার আগের দিন মিন্নি রিফাত শরীফের এক আত্মীয়ের বাসায় পরিবারের সব সদস্যকে নিয়ে নিমন্ত্রণে গিয়েছিলেন।
ভাইরাল হওয়া সিসিটিভির যে ফুটেজ নিয়ে বিতর্ক চলছে তাতে দেখা যায়, ঘটনার দিন কলেজের গেট থেকে মিন্নি বেরিয়ে আসছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন রিফাত শরীফ। এদিক-সেদিক তাকিয়ে আবার রিফাতকে কলেজে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন মিন্নি। তখন দুর্বৃত্তরা কলেজ গেট থেকে রিফাতকে ধরে সামনের দিকে নিয়ে যায়। এ সময় মিন্নিকে হাঁটতে দেখা যায়। এরপর নয়ন বন্ড ও অন্যরা যখন রিফাতকে কিল-ঘুষি-লাথি মারতে শুরু করে, তখন তিনি তার স্বামীকে বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা চালান।
এই ভিডিওর সূত্রে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, দুর্বৃত্তরা রিফাতকে ধরে নেওয়ার সময় মিন্নি কেন স্বাভাবিকভাবে হাঁটছিলেন? কেন দুর্বৃত্তরা তাকে টার্গেট করেনি? কেন স্বামীকে প্রথমে ধরতে না গিয়ে জুতা তোলার চেষ্টা করেছিলেন মিন্নি?
গত ২৬ জুন সকালে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে দুর্বৃত্তরা প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে রিফাত শরীফকে। এ ঘটনায় পরের দিন ২৭ জুলাই ১২ জনের নাম উল্লেখ করে নিহত রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বাদী হয়ে বরগুনা থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় এখন পর্যন্ত এজাহারভুক্ত সাতজন এবং জড়িত সন্দেহে সাতজনসহ মোট ১৪ আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যার মধ্যে মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছে। এ পর্যন্ত গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে এজাহারভুক্ত চারজন এবং জড়িত সন্দেহে ছয়জনসহ মোট ১০ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। বাকি তিনজনকে পুলিশ বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

[gs-fb-comments]