আজ মহাসপ্তমী বিহীত পুজা

5 October, 2019 : 5:23 am ১৬৩

রিপন চৌধূরী।।

আজ শনিবার মহাসপ্তমী।**মা দূর্গা এসেছেন ঘোড়ায়, যাবেনও ঘোড়ায়।

দুর্গতিনাশিনী মহামায়া দেবী দুর্গার আরাধনা করলে অভীষ্ট সিদ্ধ হয়। রাজা সুরথ বসন্তকালের চৈত্র মাসে মহামায়ার অর্চনা করে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন, আবার শরৎকালের আশ্বিন মাসে শ্রীরামচন্দ্র দেবী দুর্গাকে আরাধনা করে রাবণ বধ করতে সক্ষম হন এবং লঙ্কা জয় করেন।

মর্ত্যলোকে মহামায়া পূজিত হন শরৎকালে এবং বসন্তকালে। তবে এই দুই কালের রূপ পৃথক। শরতে তিনি দুর্গতিনাশিনী দুর্গা এবং বসন্তকালে বাসন্তী। দুই রূপেই তিনি সিংহবাহিনী। কিন্তু, মহামায়া দুর্গার বাহন সিংহ হলেও মর্ত্যে গমনাগমনের সময় তিনি ভিন্ন ভিন্ন যানবাহনের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। কখনও তিনি গজে, কখনও বা ঘোটকে, কখনও দোলায়, কখনও আবার নৌকায় ।

সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় যাঁদের পলকের নিমেষে ঘটে যেতে পারে তাঁদের পক্ষে তো অসম্ভব কোনও কিছুই নয়। তাই তো আমরা মহামায়াকে আবাহন করি —

“সৃষ্টি-স্থিতি-বিনাশানং শক্তিভূতে সনাতনী।
গুণাশ্রয়ে গুণময়ে নারায়ণি নমোহস্তুতে।।”

শাস্ত্রে বলা হয়েছে —

“রবৌ সোমে গজরূঢ়া, ঘোটকে শনি ভৌময়ৌঃ।
দোলায়ঞ্চ গুরৌ শুক্রে, নৌকায়ং বুধবাসরে।।”

অর্থাৎ দেবীর গমনাগমন যদি রবিবার বা সোমবার হয় তাহলে তাঁর যানবাহন হয় গজ(হাতী)। আবার দেবীর গমনাগম শনিবার বা মঙ্গলবার হলে তিনি চড়েন ঘোটকে(ঘোড়া)। কিন্তু, বৃহস্পতিবার বা শুক্রবার যদি দেবীর গমনাগমন হয় তাহলে তিনি দোলায় যাতায়াত করেন। আর বুধবার হলে তাঁর যাতায়াতের যানবাহন হয় নৌকা।

শাস্ত্র বলে –

‘গজে চ জলদা দেবী শস্যপূর্ণা বসুন্ধরা’।

অর্থাৎ দেবী যদি গজে গমনাগমন করেন তাহলে পৃথিবীতে জলের সমতা বজায় থাকে এবং শস্যের ফলন ভালো হয়। সুখ সমৃদ্ধিতে পরিপূর্ণ থাকে মর্ত্যভূমি। পার্থিব সম্পদের মধ্যে ‘গজ’ হল বড় সম্পদ। প্রাচীনকালে রাজা মহারাজাদের বৈভব মাপা হত হাতিশালের হাতির সংখ্যা বিচার করে। তাই ‘গজ’ হল সমৃদ্ধির প্রতীক। আবার হাতি হল অন্নপূর্ণা এবং দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার বাহন। অন্নপূর্ণার আশীর্বাদে শস্যশ্যামলা হয়ে ওঠে এই বসুন্ধরা। শস্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন পরিমিত জল। কৃষিকাজের পাশাপাশি প্রয়োজন শিল্পের। বিশ্বকর্মার বাহন যেমন গজ, তাই তেমনই বিশ্বকর্মা হলেন শিল্পের দেবতা। তাই গজে গমনাগমনের ফলে পৃথিবীতে কৃষিকাজের পাশাপাশি শিল্পের উন্নতি ও প্রসার হয়। আবার বৃহস্পতিবার লক্ষ্মী পুজোর শ্রেষ্ঠ দিন। কিন্তু, শাস্ত্রমতে বৃহস্পতিবার লক্ষ্মী পুজোর যোগ্য তিথি-নক্ষত্র যুক্ত রবি বা সোমবার লক্ষ্মী দেবীর আরাধনা করা যেতে পারে। সুতরাং, বলা যায় রবিবার ও সোমবার হল ধনসম্পদ লাভের উত্তম দিন।

“ঘোটকে ছত্রভঙ্গস্তুরঙ্গমে”।

শাস্ত্র মতে, দেবী দুর্গার গমনাগমন ঘোটকে হলে চরম বিশৃঙ্খলা এবং ক্ষয়ক্ষতি দেখা দেয়। এককথায় একে বলা হয়ে থাকে ‘ছত্রভঙ্গস্তুরঙ্গমে’। ঘোড়া অত্যন্ত ক্ষিপ্র, বুদ্ধিমান ও প্রভুভক্ত। তবুও কখনও কখনও তার আচরণে উদভ্রান্ত ভাব লক্ষ্য করা যায়। তাকে বাগে আনতে বেগ পেতে হয়। ঘোড়ার এই স্বভাবের প্রভাব পড়ে মর্ত্যের উপর। এ ছাড়া আরও একটা দিক আছে। দেবী ঘোড়ায় যাতায়াত করেন মঙ্গল অথবা শনিবার। #মঙ্গলগ্রহ তেজস্বী ও বীরদর্পী। আর শনি হল কূট বুদ্ধিসম্পন্ন। প্রায়শই অনিষ্টকারী। তাই দেবীর ঘোড়ায় গমনাগমন হলে এই দুই গ্রহাধিপতির প্রভাব পড়ে মর্ত্যভূমিতে।

“দোলাং মড়কাং ভবেৎ”।

অর্থাৎ দেবী দুর্গা যদি দোলায় চড়ে গমনাগমন করেন তার ফল মর্ত্যে বহু মৃত্যু। এই বহু মৃত্যু হতে পারে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কিংবা যুদ্ধে হানাহানির কারণে। দোলা হল পালকির মতো একটি যান। যার স্থিরতা কম, সব সময় দোদুল্যমান, অল্পে ভঙ্গুর এবং অনেক সময়ই বিপদের কারণ। তাই দুর্গার দোলায় গমনাগমনে মর্ত্যভূমির স্থিরতা ব্যাহত করতে পারে। দুর্গা যদি বৃহস্পতি বা শুক্রবার গমনাগমন করেন, তাহলে তাঁর যানবাহন হয় দোলা। সূত্র ধরে বিচার করা যেতে পারে – #দেবগুরু বৃহস্পতি হলেন বিদ্বান, বুদ্ধিমান এবং চিন্তাশীল। ফলে ভবিষ্যতের ভালোমন্দ ভাবতে তিনি এতটাই বিভোর হয়ে পড়েন যে সিদ্ধান্ত নিতে অনেক সময় নিয়ে নেন। #শাস্ত্র বলে, অতি বিলম্বের ফল ভালো হয় না, বহুবিধ বিঘ্ন-বিভ্রাট এসে উপস্থিত হয়। অন্যদিকে, শুক্রাচার্য হলেন দৈত্য গুরু। তিনিও বিদ্বান ও তেজস্বী। কিন্তু, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এতটাই দ্রুততার সঙ্গে হয় যে প্রায়শই তাঁকে সমস্যায় পড়তে হয়। অতিবিলম্বের সিদ্ধান্ত গ্রহণ যেমন সুফল দেয় না, তেমনই অতি দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণও কুফলের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর এই দুই গুরুর চারিত্রিক প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে দেবীর গমনাগমনের প্রভাব পড়ে মর্ত্যলোকে।

‘নৌকাং জলবৃদ্ধিশ্চ শষ্যবৃদ্ধির্ভপেৎ সদা’।

কথাটির অর্থ হল দেবী দুর্গা নৌকায় গমনাগমন করলে মর্ত্যভূমিতে শস্য খুব ভালো হয়। কিন্তু, অতি বৃষ্টি বা বন্যার আশঙ্কাও থাকে। এক কথায় – জল বৃদ্ধির প্রভাবে ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে মর্ত্যভূমিতে। নৌকা কোনও উৎকৃষ্ট জলযান নয়। বিপদের ঝুঁকিযুক্ত দোদুল্যমান একটি জলযান। ফলে মায়ের আগমনের পর জলের একটা প্রভাব দেখা দেয় প্রকৃতিতে। যেমন অতিবৃষ্টি, বন্যা ইত্যাদি । দুর্গা বুধবার যাতায়াত করলেই তার যানবাহন হয় নৌকা। বুধবার হল সৌম্যবার। খুব শান্ত সৌম্য, শান্তিপ্রিয়। অথচ বালক স্বভাবের। তাই বুধ সরল কিন্তু চঞ্চল। তিনি চিন্তাভাবনা না করেই কাজ করে বসেন আর তার সৌম্য স্বভাবের প্রভাবে মর্ত্যে শান্তিশৃঙ্খলা বিরাজ করে, শস্যে-সম্পদে-সুখে ভরে থাকে বসুন্ধরা। পাশাপাশি তার বালখিল্য আচরণের প্রভাবে মর্ত্যে দেখা দেয় অনাবৃষ্টি, জলবৃদ্ধি, ক্ষয়ক্ষতি।

পরিশেষে বলা যায় দেবীদুর্গার যাতায়াতের সঙ্গে প্রকৃতির যোগ প্রবল।জয় মা দূর্গা।সকলকে শারদীয় শুভেচ্ছা।

[gs-fb-comments]