শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে একজন কিংবদন্তিতুল্য

12 December, 2019 : 1:30 pm ৩৩০

ডেস্ক।।

হত্যার আগে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে শরীর ক্ষতবিক্ষত করে আয়োডিন লাগিয়ে এবং কারেন্টের শক দিয়ে টানা কয়েকদিন অমানবিক অত্যাচার করা হয় ৮৫ বছরের বৃদ্ধ শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এবং তাঁর পুত্র দিলীপ কুমার দত্তকে………
শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে একজন কিংবদন্তিতুল্য নিবেদিত প্রাণ রাজনীতিবিদ ও জনদরদী জনপ্রতিনিধি। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকদল তাকে বিবেচনা করেছে, একজন হিন্দু হিসেবে- এর বেশি কিছু নয়। ওই সময়ের তথাকথিত পাকিস্তানি সেন্টিমেন্ট ছিল- ‘হিন্দু মানেই পাকিস্তানের শত্রু’। যদিও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর এই মনোভাব ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি। আর তাই, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সেটার চরম মূল্য দিয়েছিলেন তাঁর ছোট ছেলে দিলীপ কুমার দত্ত সহ নিজে শহীদ হয়ে।
শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের জন্ম তৎকালীন বাংলা প্রদেশের ত্রিপুরা জেলার অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশ এর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার রামরাইল গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত কায়স্থ পরিবারে। উনার বাবা জগবন্ধু দত্ত ছিলেন কসবা ও নবীনগর মুন্সেফ আদালতের সেরেস্তাদার। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পড়াশোনা করেছেন নবীনগর হাই স্কুল, কুমিল্লা কলেজ, এবং কলকাতার সুরেন্দ্রনাথ কলেজে। তিনি ১৯০৪ সালে নবীনগর হাই স্কুল হতে প্রবেশিকা, ১৯০৬ সালে কুমিল্লা কলেজ থেকে এফ.এ। এবং ১৯০৮ সালে কোলকাতা রিপন কলেজ থেকে বি.এ এবং ১৯১০ সালে একই কলেজ হতে বি.এল পরীক্ষায় পাস করেন। ১৯০৬ সালে কোলকাতার রিপন কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায় ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত তৎকালীন কুমিল্লা মহকুমার মুরাদনগর থানার পূর্বধইর গ্রামের কৃষ্ণকমল দাসমুন্সীর কন্যা সুরবালা দাসকে বিয়ে করেন। কৃষ্ণকমল দাসমুন্সী পেশায় আইনজীবী ছিলেন। বিয়ের সময় ধীরেন্দ্রনাথের বয়স ছিল ২১ বছর এবং স্ত্রী সুরবালার বয়স ছিল ১৪ বছর। উনাদের সংসারে সাত মেয়ে ও দুই ছেলে জন্মগ্রহণ করে। দীর্ঘ ৪৩ বছর দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে ১২ আগস্ট ১৯৪৯ সালে স্ত্রী সুরবালার মৃত্যুর মাধ্যমে।
১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে দেশভাগের পর নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলনের প্রথম ভাষা সৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। সেইদিন ছিল ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি, বলা যেতে পারে, পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত। অধিবেশনের শুরুতে আলোচনার সূত্রপাত করে তৎকালীন সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তানের করাচীতে পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেনঃ “Mr. President, Sir, I move: “That in sub-rule (1) of rule 29, after the word ‘English’ in line 2, the words ‘or Bengalee’ be inserted.” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বাংলা ভাষা সংক্রান্ত প্রাথমিক আলোচনা পার্লামেন্টে শুরু করেন।
উল্লেখ্য, পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের এই প্রস্তাবটিকে প্রথমে নির্দোষ ভেবেছিল, কিন্তু শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পরবর্তীতে পার্লামেন্টে সংশোধনী প্রস্তাবের পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী এর মধ্যে এমন কিছু ষড়যন্ত্রের পূর্বাভাস পেলো, যা পরবর্তীকালে পূর্ব বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করবে, মূল পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে।
১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত আর কী ভূমিকা পালন করেছিলেন? তিনি বলেছিলেন বাংলা একটি প্রাদেশিক ভাষা হলেও সমগ্র পাকিস্তানের মোট ৬ কোটি ৯০ লক্ষ লোকের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লক্ষ লোক বাংলা ভাষায় কথা বলে, অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠি বাঙালি। অথচ ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে পাকিস্তান সরকার যে ভূমিকা পালন করেছে তা মোটেই সমর্থনযোগ্য নয়। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রমাণ দিয়ে দেখিয়েছেন, পোস্ট অফিসের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে গেলে যে ফর্ম পূরণ করতে হয় সেটি মুদ্রিত উর্দু ভাষায়; খাম-পোস্টকার্ডের উপরে ছাপানো ভাষা উর্দু; জমি বেচাকেনার জন্যে ভেন্ডার-এর কাছ থেকে যে স্ট্যাম্প কিনতে হয়, সেটাও উর্দু ভাষায়। সেইদিন আবেগতাড়িত কণ্ঠে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত জনসংখ্যার অনুপাতে বাংলার সপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করতে গিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করেন; যেটি পরবর্তীকালে সমগ্র বাংলা ভাষাভাষীর প্রাণের দাবীতে পরিণত হয়। যেহেতু তৎকালীন পাকিস্তানের ৬ কোটি ৯০ লক্ষ জনসংখ্যার মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লক্ষই বাঙালি, সেজন্যে তাঁর পাকিস্তান পার্লামেন্টে যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন ছিল, ” Sir, what should be the State Language of the State? The State Language of the Sate should be the Language which is used by the majority of the people of the State.”
শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সেইদিন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আরো বলেন, “So, Sir, I know I am voicing the sentiments of the vast millions of our State and therefore Bengalee should not be treated as a Provincial Language. It should be treated as the language of the State. সময় এবং সঠিক সময়ই প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে। শেষ বাক্য “It should be treated as the language of the state”-ই সর্বপ্রথম ঘোষণা দেয় রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। সেই দাবী তুঙ্গে ওঠে ঠিক চার বছর পর; ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ সালে। এরই ফলশ্রুতিতে, ১৯৫৬ সালে তথাকথিত ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তানের শাসনতন্ত্রে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বাঙালি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে পেলেও এই দাবি পাকিস্তানের পার্লামেন্টে উত্থাপনের জন্য চরম মূল্যে দিতে হয়েছিল শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে।
একাত্তরের ২৯ মার্চ রাত দেড়টায় কুমিল্লা শহরের ধর্মসাগর পাড়ের (শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সড়ক) বাড়ি থেকে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এবং উনার ছোট ছেলে দিলীপ দত্তকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন বোখারি। এ সময় দিলীপ দত্তের পায়ে গুলি করা হয়েছিল। একটি জিপ, পাঁচটি ট্রাক ও একটি অ্যাম্বুল্যান্স এসে তাঁদের ধরে কুমিল্লা সেনানিবাসে নিয়ে যায়। কুমিল্লার কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী অ্যাডভোকেট আবদুল করিমের তত্ত্বাবধানে এই আটক অভিযান পরিচালনা হয়। ভাষাসৈনিক, পাকিস্তানের গণপরিষদে বাংলাকে অন্যতম ভাষা হিসেবে সরকারি স্বীকৃতির দাবি উত্থাপনকারী, বরেণ্য রাজনীতিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে গুলি করে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনীর কুমিল্লার ৫৩ ব্রিগেডের ১১৭ এফআইও ইউনিটের সুবেদার আশরাফ খান (আশরূপ)। ১৯৭১ সালের ৯ এপ্রিল বিকেলে তাঁকে হত্যার আগে চালানো হয়েছিল নির্মম নির্যাতন। টানা কয়েকদিন তাঁকে মারধরের পর ক্ষতবিক্ষত আহত শরীরে আয়োডিন লাগিয়ে তুলো গুঁজে দেওয়া হতো। দেওয়া হয়েছিল বৈদ্যুতিক শকও। ওই ইউনিটের মেজর সেলিম খানের নির্দেশে ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলের পশ্চিম পাশে পাহাড়ের ওপর গর্ত করে এর পাশে দাঁড় করিয়ে তাঁকে গুলি করে হত্যা করেছিল আশরাফ। সেই নির্মম হত্যাযজ্ঞের প্রত্যক্ষদর্শী কুমিল্লা সেনানিবাসের তৎকালীন নরসুন্দর (নাপিত) রমণী মোহন শীলের মৃত্যুর আগে লিখে যাওয়া বর্ণনায় এসব তথ্য জানা গেছে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ওই সেনানিবাসে পাকিস্তানি সেনাদের একমাত্র নরসুন্দর ছিলেন তিনি। হিন্দু বলে পাকিস্তানি সেনারা প্রথমে রমনী মোহন শীলকে হত্যা করতে চেয়েছিল, কিন্তু পরে নিজেদের চুল দাঁড়ি কাটার প্রয়োজনে তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। পুরো সেনানিবাসে তাঁর যাতায়াতের স্বাধীনতা ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে দেখা কুমিল্লা সেনানিবাসের কিছু ঘটনার প্রত্যক্ষ বিবরণ লিখে গেছেন তিনি। তাঁর একমাত্র ছেলে রাখাল চন্দ্র শীলের কাছে রয়েছে সেই অমূল্য দলিল তথা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। সেই তথ্যসূত্র ঘেঁটে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কে নির্যাতন এবং হত্যাকান্ডের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। রমণী মোহন শীল লিখেছেন, ‘কুমিল্লার বড় অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র বাবুকে বাড়ি থেকে ধরে কুমিল্লা সেনানিবাসের সিকিউরিটি ব্রাঞ্চে আনা হয়। এরপর বাবুকে বহু ধরনের মারধর করা হয়। এমনকি কারেন্টের শকও দেওয়া হয়। বাবুকে দুই দিন ব্রিগেড অফিসে আনা-নেওয়ার সময় তাঁর সমস্ত গায়ে ক্ষতবিক্ষত দাগ দেখেছি। ওই সব ক্ষতে আয়োডিন দিয়ে তুলা লাগিয়ে মাথা ব্যান্ডেজ করে রাখা হয়েছিল। আমি সেইদিন স্কুলের পেছনে একজন জল্লাদের দাড়ি কাটছিলাম। ওই সময় ধীরেন্দ্র বাবু আমাকে বলে, ‘বাবু, আমি প্রস্রাব করব কোথায়?’ আমি মুখে না বলে আঙুলের ইশারায় বাবুকে বাথরুম দেখিয়ে দেই। ওই সময় জল্লাদ বাহিনী আমাকে চোখ রাঙিয়ে বলে, ‘তুমি ওইদিকে তাকাচ্ছ কেন?’ এরপর আর বাবুর দিকে তাকানোর সাহস পাইনি। বাবু অনেক কষ্টে হামাগুড়ি দিয়ে বাথরুমের চারটি সিঁড়ি উঠানামা করেন। তার কিছুক্ষণ পর বাবুকে স্কুলের পশ্চিম পাশে নিয়ে সুবেদার আশরাফ সাহেব গুলি করে হত্যা করেন।”
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পবিত্র রক্তে ভিজে আছে বাংলাদেশের মাটি, আমাদের প্রতিটি বাংলা শব্দে পরম মমতায় জড়িয়ে আছেন বাংলা ভাষা আন্দোলনের এই ধ্রুবতারা। মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে এই কিংবদন্তিকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

[gs-fb-comments]
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com