শত্রু/অর্পিত সম্পত্তি আইন দেশের এক কালো অধ্যায়

5 March, 2020 : 7:32 am ৯০

রিপন চৌধূরী।।

বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত; সব ধর্মের লোকে যুগ যুগ ধরে শান্তিপূর্ন ভাবে এ দেশে মিলে মিশে বসবাস করে আসছে, ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে সম অধিকার ’৭২ সাল থেকেই সংবিধানে স্বীকৃত। আমাদের অসাম্প্রদায়িক শান্তিপূর্ন চেহা্রায় মুগ্ধ হয়ে কোন এক মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কাছ থেকে আমরা ‘মডারেট মুসলিম’ কাউন্ট্রি খেতাব পেয়েও ধন্য হয়েছি, গর্বের সাথে সে পরিচয়ও আমরা পেশ করি। মোক্ষম প্রমান পাশের দেশ ভারতেও হিন্দু মুসলমান সাম্প্রতিক সময়েও ভয়াবহ দাংগায় লিপ্ত হলেও যুগ যুগ ধরে আমাদের দেশে হিন্দু মুসলমান কোন দাংগা হয় না, শেষ দাংগা দেশে হয়েছে সেই ’৬৪ সালে। এ হিসেবে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সুবাতাস বইছে তা অস্বীকার করার উপায় কই? মুশকিল হল এসব ভাল ভাল কথা সংখ্যালঘুরা (আসলে হিন্দু) কিছুতেই বুঝতে চায় না। তারা খায় দায় এ দেশের আর তালে থাকে কিভাবে ভারতে রাতারাতি সর্বস্ব পাচার করে পালিয়ে যাবে। এমন কথাবার্তা শুধু মৌলবাদী লোকজনে নয়, হিন্দু বান্ধব বলে খ্যাত আওয়ামী নেত্রী খোদ প্রধানমন্ত্রী হাসিনাও একবার নিউ ইয়র্কে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে প্রকাশ্যেই বলেছিলেন। সাম্প্রদায়িকতা/সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বলতে ঠিক কি বোঝায় তা আমরা আসলে কতটুকু বুঝি? বিদেশে থাকি বলে দেশের অনেকেই আমাদের দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক মনে করেন। দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক আসলেই ঠিক কি জিনিস? সাম্প্রদায়িকতা মানে শুধুই দল বেঁধে অপর সম্প্রদায়ের ওপর হামলা করা যেমনটা গুজরাটে দেখা গেছিল? নিজের দেশের বিশেষ এক সম্প্রদায়ের লোককে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ‘শত্রু’ আখ্যায়িত করে বিশেষ আইন বানিয়ে তাদের সহায় সম্পত্তি রাষ্ট্রের কব্জায় নিয়ে নিজের দলের লোকজনদের মাঝে বছরের পর বছর ধরে বিতরন প্রক্রিয়াকে ঠিক কি বলা যেতে পারে? আর আম জনতা যে যুগ যুগ ধরে নীরব দর্শকের মত এই অন্যায় দেখে এসেছে তারাও নিশ্চয়ই সকলে শান্তিপূর্ন অসাম্প্রদায়িক চেতনার জনগন যারা সংখ্যালঘুদের সমাধিকারে পূর্ন বিশ্বাসী? শুনতে অবিশ্বাস্য হলেও আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশেই (শুধু পাকিস্তান আমলেই নয়) এমন ঘটনা শত শত, হাজারে হাজারে ঘটেছে সম্পূর্ন আইন সম্মত প্রক্রিয়ায় – ‘শত্রু সম্পত্তি আইন’, পরবর্তিকালে নাম পালটে অর্পিত সম্পত্তি আইন নামে। রাষ্ট্র কর্তৃক এই আইন সম্মত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিষয় সম্পত্তি হাত করা বিষয়েই দুটো কথা বলব, আমার ধারনা এই আইনের কথা শুনে থাকলেও ব্যাপকতা বেশীরভাগ লোকেই জানেন না। ৪৭ সালে ধর্মীয় ভিত্তিতে দেশভাগ হয়ে গেলেও হিন্দু মুসলমান সম্পর্ক কোনদিন এ অঞ্চলে স্বভাবিক হয়নি। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধ লাগে, ভারতকে সরকারী ভাবেই শত্রু দেশ হিসেবে গন্য করা হয়। ‘দ্য ডিফেন্স অব পাকিস্তান অর্ডিন্যান্স ১৯৬৫’-এর মাধ্যমে আইনটি করা হয় যা শত্রু সম্পত্তি আইন নামে পরিচিত। ওই অধ্যাদেশের ১৬৯ উপবিধি অনুযায়ী তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের যেসব নাগরিক ১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বরের আগে থেকে ভারতে ছিল এবং সেই তারিখ থেকে ১৯৬৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ভারতে চলে গিয়েছিল, তাদের শত্রু হিসেবে গণ্য করা হয়। সেই সঙ্গে তাদের বাড়িঘর ও জমিজমা শত্রু সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয় যার মালিকানা সরকার অস্থায়ীভাবে নিয়ে নিতে পারে। তখনকার বিবেচনায় হয়ত আইনটি খুব একটা আপত্তিকর হবার কথা নয়, কারন হাজার হোক আপনার দেশের বিরুদ্ধে কোন দেশ যুদ্ধ করছে, আপনি পাততাড়ি গুটিয়ে সেই দেশের নাগরিকত্ব গ্রহন করলে আপনার দেশপ্রেম নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে। ভারতও সে সময় তাদের দেশে অনুরূপ এক আইন জারি করে পাকিস্তানে নাগরিকত্ব গ্রহনকারী ভারতীয় সম্পত্তি সরকারের অধিকারে নিয়ে আসার ব্যাপারে। সোজা কথায় এই আইনের আওতায় পাকিস্তানের কোন নাগরিক ভারতের নাগরিকত্ব গ্রহন করলে সরকার তার নামে থাকা দেশের সব সম্পত্তি নিয়ে নিতে পারত। এরপর স্বল্প সময়তেই বহু পানি গড়িয়েছে, শত্রু ভারতের সহায়তাতেই বাংলাদেশে স্বাধীন হয়, এক সময়ের শত্রু পরিনত হয় পরম মিত্রে। তবে ভারত মিত্র হয়ে গেলে কি হবে, স্বাধীন দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদেরই এবার রাষ্ট্রীয়ভাবে শত্রু বিবেচনার পালা শুরু হল। বংগবন্ধুর প্রতিশ্রুতি ছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়বেন, সে মোতাবেক ’৭৪ সালে এক সরকারী গেজেটে এই শত্রু সম্পত্তি আইন বাতিল করা হল, তবে জারী করা হল দেশে পরিত্যাক্ত অবাংগালীদের সম্পত্তি সরকারী অধিগ্রহনের জন্য ‘অর্পিত সম্পত্তি আইন’। আগের শত্রু সম্পত্তি আইন বাতিল হলেও পূর্ব পাকিস্তান থাকা অবস্থায় যাদের সম্পত্তি সরকার অধিগ্রহন করেছিল সেসব আর ফেরত দেবার বন্দোবস্ত এ আইনেও রাখা হল না। আরো বিপদজনক হল যে এই ‘অর্পিত সম্পত্তি আইন’ এর আওতাতেও যেসব বাংলাদেশী দেশের স্থায়ী বাসিন্দা নন কিংবা অন্য কোন দেশের নাগরিকত্ব গ্রহন করেছেন তাদের নামে থাকা সম্পত্তি অধিগ্রহন করার জন্য সরকারকে ক্ষমতা ঠিকই দেওয়া হল। যদিও এই আইনের লক্ষ্য ছিল আসলে পাকিস্তানে যুদ্ধের পর স্বেচ্ছায় হিজরত করা বাংগালীদের সম্পত্তি সরকারী তক্ত্বাবধনে আনা। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকে স্বভাবতই বাংলাদেশ ফেলে পাকিস্তানে যায়নি, কিন্তু কার্যত ভুগতে হয়েছে তাদেরই। অর্পিত সম্পত্তি আইনের ছত্রছায়াতেই মোটামুটি নির্বিঘ্নেই চলতে লাগল তাদের সহায় সম্পত্তি দখলের মহোতসব। কোন মুসলমান অন্য দেশের নাগরিকত্ব গ্রহন করলে তার নামে দেশে থাকা সম্পত্তি কোনদিন বাজেয়াপ্ত হবার প্রশ্ন আসে না, তবে সংখ্যালঘু হলেই সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত। আরো বিস্ময়কর ব্যাপার দেখা গেছে যে আসলে সব সংখ্যালঘুও নয়, এই আইনের একচেটিয়া শিকার কেবল হিন্দু সম্প্রদায়; বৌদ্ধ বা খৃষ্টানরাও এর শিকার হন না। ’৭৪ সালেই শত্রু সম্পত্তি আইন বাতিল হয়ে গেছে এমন দাবী অনেকে করে থাকলেও তা পুরোপুরি সঠিক নয়। ফাঁক রেখে দেওয়া হয়েছিল ঠিকই যার প্রমান পরবর্তিকালে সরকারের অধিগ্রহনকৃত হিন্দু সম্পত্তির বিশাল তালিকা, যা নানান সমীক্ষায় দেখা গেছে। কার্যক্ষেত্রে শুধু নামই পরিবর্তন করে শত্রু সম্পত্তি থেকে অর্পিত সম্পত্তি হয়েছিল। আইনের ভেতরেও কিন্তু সম্পত্তির মালিকদের শত্রু হিসেবেই লেখা ছিল। [১] ৭৫ এর পটপরিবর্তনের পর অবস্থার আরো অবনতির ঘটানো হল। ’৭৬ এর নভেম্বরে ’৭৪ এর আইন পরিবর্তন করে সরকারের ক্ষমতা আরো বাড়ানো হল, এবার সরকার শুধু অধিগ্রহনই নয়, সম্পত্তি নিজের ইচ্ছেমত প্রদান করারও ক্ষমতা পেয়ে গেল, যা বিভিন্ন মেয়াদে লীজ দেওয়া শুরু হল। বিহারীদের সম্পত্তিও ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়, এবং তাদের পরিত্যাক্ত সম্পত্তি বাদ দিয়ে হিন্দু সম্প্রদায় পরিনত হয় মূল টার্গেটে। শুরু হল নিজ নিজ দলীয় কর্মীদের মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের অধিগ্রহন করা সম্পত্তির বাটোয়ারা করার নোংরা ও নিষ্ঠুর সংস্কৃতির। কোন দলীয় সরকারই এই লোভ সামাল দিতে পারেনি (পরে আসছি কিছু হিসেব নিয়ে)। আমাদের দেশে যে রাজনৈতিক দলের নেতা হবার জন্য দলীয় কর্মীদের মাঝে তীব্র প্রতিযোগিতা দেখা যায়, এমনকি খুনাখুনিও হয় তার কারন তো নিশ্চয়ই আছে, আমাদের দেশের মত এত দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক কর্মী মনে হয় না অন্য কোন দেশে পাওয়া যাবে বলে। এই ন্যাক্কারজনক আইন সম্মত সাম্প্রদায়িক লুটপাট নিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে অনেকবার আপত্তি তোলা হয়, আন্তর্জাতিক অংগন থেকেও কিছু চাপ আসা শুরু হয়। ফলে এরশাদ আমলে ’৮৪ সালে আর কোন সম্পত্তি এই আইনে অধিগ্রহন করা হবে না ঘোষনা দেওয়া হয়, যদিও কার্যক্ষেত্রে এর কোনই প্রতিফলন দেখা যায়নি। [১] ৪ঠা জুলাই, ’৯১ সালে সংসদে দেশে প্রায় সাড়ে আট লক্ষ একর জমি অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে সরকারের অধীনে আছে বলে জানানো হয়। সে সময় এই আইন দেশ বিদেশের মানবাধিকার সংস্থাগুলির প্রবল সমালোচনার শিকার হয়, ফলে ততকালীন বিএনপি সরকার শুরু করে অর্পিত সম্পত্তির ব্যাপারে জরীপ ও সমীক্ষা। সরকারের দাবী ছিল এ সমীক্ষার উদ্দেশ্য এ সমস্যা চিরতরে দূর করে অর্পিত সম্পত্তি ফেরত দেওয়া, বাস্তবে দেখা গেছে উলটো। সমীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে আরো নুতন নুতন হিন্দু সম্পত্তি সরকার অধিগ্রহন করে, বলাই বাহুল্য যে এ রিপোর্ট কোনদিন আলোর মুখ দেখেনি। ’৯৫ ও ’৯৭ সালে একটি এনজিও দুটি সমীক্ষায় প্রকাশ করে যে মোট ১.০৫ মিলিয়ন একর জমি শত্রু/অর্পিত সম্পত্তি আইনে অধিগ্রহন করা হয়েছে, এবং দেশের শতকরা ৩০ ভাগ হিন্দু বসতবাড়ি এই কালো আইনের প্রত্যক্ষ শিকার হয়েছে। [১] আগেই বলেছি যে অধিগ্রহনকৃত সম্পত্তি বাটোয়ারা করে ক্ষমতাসীন দলের লোকজনদের ভোগেই যায়। আইন ও শালিস কেন্দ্র ’৯৫ সালে প্রকাশ করে যে মোট সম্পত্তির ৭২% বিএনপির লোকজনের গ্রাসে গেছে, যদিও ’৮৮ সালে ৪৪% আওয়ামী লোকদের ভাগে ও ৩২% বিএনপির ভাগে ছিল, জাতীয় পার্টি জামাতও পিছিয়ে নেই। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত ’৯৭ সালে ‘Inquiry into Causes and Consequences of Deprivation of Hindu Minorities in Bangladesh through the Vested Property Act’ নামের একটি গবেষনা মূলক গ্রন্থতে এসব তথ্য প্রকাশ করেন। ওনার গবেষনায় বেরিয়ে আসে যে মোট ৯২৫,০৫০ হিন্দু বসতবাড়ি (বাংলাদেশের শতকরা ৪০% হিন্দু পরিবারের) এই আইনে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। চাষাবাদের জমি হারায় ৭৪৮,৮৫০টি পরিবার। মোট জমির পরিমান ১.৬৪ মিলিয়ন একর, যা হিন্দু সম্প্রদায়ের মালিকানাধিন মোট ৫৩% ভূসম্পত্তি। এই সম্পত্তির পরিমান সমগ্র বাংলাদেশের ৫.৩% ভাগ। অন্যদিকে সম্পত্তি দখল করে লাভবান হয়েছে মাত্র ০.৪% লোক। এই আইনের করাল গ্রাস সম্পর্কে তেমন সন্দেহের অবকাশ থাকে না। [২] আবুল বারাকাতের হিসেবে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ এর ওপর হিন্দু দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। নিজ জন্মভূমি কেউ স্বেচ্ছায় ছাড়তে চায়? হিন্দু জনসংখ্যা কি হারে দেশে কমেছে (নাকি কমানো হচ্ছে) সে হিসেব তো মোটামুটি সকলেরই জানা। এই ভাগাভাগি/ দলীয় লোকদের প্রদান আইনসিদ্ধ, এর বাইরেও সরকারী দলের লোকজনের বলপূর্বক দখল তো আছেই যা স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয় সহায়তা ছাড়া কোনভাবেই সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দলগুলির দলের নেতাকর্মীদের নানান মহান আদর্শে উজ্জীবিত রাখার এটি একটি স্বীকৃত মাধ্যম; যার জন্যই বছরের পর বছর এই কালো আইন প্রায় বিনা চ্যালেঞ্জে চলে এসেছে। হয়ত মনে হতে পারে যে যারা ভারতে স্থায়ীভাবে চলে গেছে বা যাচ্ছে তাদের সম্পত্তি গ্রহন করায় এমন কি সমস্যা? আপত্তি কি কেবল একমাত্র হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সম্পত্তিই দেশ ত্যাগ করে গেলে গ্রহন করা হয় এ যায়গাতেই? প্রবাসে স্থায়ী হওয়া মুসলমানদেরও সম্পত্তি এভাবে অধিগ্রহন হয়ে থাকলেই সমস্যা ছিল না? অনেকটা এই রকম আইন ভারতেও ক’বছর আগেও ছিল। ভারতীয়দের দ্বৈত নাগরিকত্ব অনুমোদিত ছিল না। তখন কেউ বিদেশের নাগরিকত্ব গ্রহন করলে তার ভারতীয় নাগরিকত্ব বাতিল হয়ে যেত, ভারত সরকার তার সম্পত্তি গ্রহন করত। তবে সে আইনের আওতায় ধর্মীয় পরিচয়ের কোন ব্যাপার ছিল না। এ কারনে তখন প্রবাসে থাকা ভারতীয়দের স্বামী বা স্ত্রী একজন নাগরিকত্ব গ্রহন না করে গ্রীন কার্ড জাতীয় স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে থেকে যেতেন দেশের সম্পত্তি রক্ষার্থে।

প্রথমত, কাগজে কলমে এই আইনের আওতা প্রবাসে স্থায়ী হওয়া নাগরিকদের জন্য হলেও কার্যত এর আওতা শুধু সেখানেই ঠেকে ছিল না। এই আইন ছিল আসলে আইন সম্মত উপায়ে দূর্বলের সম্পত্তি গ্রাস করার এক চমতকার উপায়; এর আওতায় উইল করে মারা যাননি এমন বহু হিন্দু পরিবারের সম্পত্তি হরির লুট হয়েছে। প্রক্রিয়া খুবই সহজ; সরকারকে দিয়ে তার জমি শত্রু সম্পত্তি হিসেবে অধিগ্রহন করানো, এরপর দলীয় প্রভাব খাটিয়ে নিজ নামে লিজ নিয়ে ভোগদখল করা। বেশ কিছু উদাহরন আছে যা সমগ্র জাতির জন্য চরম লজ্জাজনক। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দেবার দাবী প্রথম পাকিস্তান গনপরিষদে ’৪৮ সালে বলিষ্ঠ কন্ঠে তুলেছিলেন কুমিলার শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। পাক সরকার চিরদিনই ভদ্রলোকের ওপর তীব্র আক্রোশে ভুগেছে, ’৭১ এর ২৫শে মার্চ গনহত্যা শুরুর প্রথম প্রহরেই তাকে তার ছেলেসহ ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টে ধরে নিয়ে অবর্ননীয় অত্যাচার করে হত্যা করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশ তার এই সপরিবারে চরম আত্মত্যাগের প্রতিদান দেয় তার সম্পত্তিও শত্রু সম্পত্তি হিসেবে অধিগ্রহন করে? অপরাধ? জন্মই তাদের আজন্ম পাপ, তারা হিন্দু। তিনি দেশের শত্রু, কাজেই তার সম্পত্তি রাষ্ট্রের, এতে তার পরিবার পরিজনের আর অধিকার নেই। বিশ্বব্যাপি সাড়া জাগানো ব্রিটিশ রাজের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের নায়ক মাষ্টার দা সূর্যসেনের পারিবারিক সম্পত্তিও ’৭৬ সালে এভাবেই আমাদের সদাশয় সরকার হুকুম দখল করে নিয়েছে। কি বিস্ময়ের কথা, ভদ্রলোক সেই ’৩৪ সালে অবিভক্ত ভারতীয় উপমহাদেশে ফাঁসিতে আত্মহুতি দেন যখন ভারত পাকিস্তান বলেও কিছু ছিল না, অথচ সরকারী নথিতে তার স্থায়ী ঠিকানা লেখা হয়েছিল ভারত। এই চমকে যাবার মত তালিকায় আরো আছেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, রবি নিয়োগী (৩৪ বছর ব্রিটিশের জেল খেটে বাংলাদেশের শেরপুরেই মারা যান), কবি নবীন চন্দ্র সেন, পশ্চীম বংগের সাবেক মূখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু। মুক্তিযুদ্ধের আরো দুই শহীদ বুদ্ধিজীবি দেবতূল্য অধ্যাপক জিসি দেব ও জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার জমিও শত্রু সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে বর্তমানে অবৈধ ভোগ দখলে আছে। [৩] অমর্ত্য সেনও আছেন এই তালিকায়। সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন বলেন, ‘রাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি অবিচার করেছে জে এম সেন অর্থাৎ যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের প্রতি। তিনি ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন সেনের প্রধান অনুসারী এবং ব্যারিস্টার। ১৯২১ সালে স্বাধীনতার জন্য তিনি অসহযোগ আন্দোলনে জড়িয়ে নিজের আইন পেশা পরিত্যাগ করেন। তাঁর স্ত্রী নেলী সেনগুপ্ত ছিলেন ভারতীয় কংগ্রেসের সভাপতি। এমন সম্মান দেশের খুব কম মহিলার ভাগ্যেই জুটেছে। অথচ তিনি জীবিত থাকাকালে রহমতগঞ্জের বাড়ি থেকে তাঁকে নির্মমভাবে উচ্ছেদ করে সে বাড়ি দখল করে নেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। সেখানে তিনি শিশুবাগ নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে এখনো সে বাড়িটি দখল করে রেখেছেন। ১৯৩৩ সালে রাঁচী জেলে অন্তরীণ থাকা অবস্থায় দেশপ্রিয় মারা গেলেও তাঁকে দেশের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁর বাড়ি ১৯৬৫ সালের আইনে শত্রু সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।’
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, স্থাপত্যশৈলীর কারুকাজ করা দোতলা বাড়ির ফটকে ‘শিশুবাগ’ লেখা সাইনবোর্ড টাঙানো আছে। এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে নাম আছে সামসুদ্দীন মোহাম্মদ ইসহাকের।
[৩] কয়েকজন কুখ্যাত দেশের শত্রু (অন্তত সরকারী খাতায়)। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের শহীদ, ভাষা আন্দোলনের নেতা কি মুক্তিযুদ্ধের শহীদ এসব কিছুই হার মেনে গেছে ধর্মীয় পরিচয়ের সংকীর্ন গন্ডিতে, কারন তারা হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক ছিলেন। আমাদের কি লজ্জা পাবার মত বিবেক বুদ্ধিও সকলের আছে? আমি ভালই জানি যে এসব জেনেও অনেকেরই চেতন হবে না। অসীম মেধা ওঁ বিবেচনা বোধের পরিচয় দিয়ে খুজে খুজে ভারতে কি হয় উদাহরন হাজির করে ফেলবেন। নিদেনপক্ষে কোন কালে হিন্দু ব্রাক্ষ্মনরা কিভাবে জাতপাতের বিচারে মুসলমানদের ছোঁয়া বাঁচিয়ে হাতে জল ঢেলে দিতেন এসব টেনে দায় মোটামুটি আধাআধি ভাগ করে ফেলতে পারবেন। যেমনটা কিছুদিন আগে দেখলাম আমার প্রিয় দুই ব্লগার সাম্প্রদায়িক সমস্যা নিয়ে সাম্প্রতিক এক লেখায় করেছেন। বৈষয়িক বা অর্থগত বিচার বাদ দিলেও ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের এহেন অবিচার আচরন কিভাবে এসব ব্যাক্তিত্বদের আত্মীয় স্বজনদের নিদারুন মর্মবেদনা দিতে পারে তা কি ভাবার নয়? তারা নিজেদের কোন শ্রেনীর নাগরিক বিবেচনা করতে পারে?

অমানবিকভাবে জবর দখল করা এসব সম্পত্তি ফেরত দেওয়া নিয়ে সংখ্যালঘু সমাজ, দেশী বিদেশী মানবাধিকার সংস্থাগুলি সব সময়ই সোচ্চার, স্বভাবতই অগতির গতি আওয়ামী সরকারই যা কিছু ভরসা। ’৯৬ সালের আওয়ামী সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল এই আইন বাতিল করে গৃহীত সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়া। ’৯৮ সালে আইন করার চেষ্টা করলেও নানান মহলের তীব্র চাপের মুখে তা মুখ থুবড়ে পড়ে। অবশেষে বিএনপি জামাতের তীব্র আপত্তির মুখেও তড়িঘড়ি করে ২০০১ সালের মার্চ/এপ্রিলে অর্পিত সম্পত্তি ফেরত দেওয়া আইন সংসদে তড়িঘড়ি করে আধা খেঁচড়া আকারে বিল আকারে পাস করানো হয়। এটা অনেকটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ছিল বলে অনেকে মনে করেন কারন এই বিলে যথেষ্ট ঝামেলার কারন ছিল এবং ততকালীন সরকার জানত যে এটা আইন আকারে পাশ করাতে রাষ্ট্রপতির সই লাগবে যা আর সেই টার্মে হত না। কার্যক্ষেত্রে হয়েছেও তাই, অব্যাহত গতিতেই চলতে থাকে ‘শত্রু’ সম্পত্তি অধিগ্রহন।আওয়ামী সরকাররের গতবারের নির্বাচনেও অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পন প্রতিশ্রুত ছিল। সরকার ক্ষমতায় বসার পর পরই হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রধানমন্ত্রীর কাছে মানবাধিকার উন্নয়ন বিষয়ে একটি চিঠি দেয় যার মধ্যে এটা ছিল। অবশেষে গত বছরের নভেম্বরে সংসদে এই বিল আবারো সংশোধিত আকারে পাশ করানো হয়। বহু দেরী হবার পরেও একে স্বাগত জানাতে হয়, তবে এতে আগে যারা সম্পত্তি হারিয়েছেন তাদের বাস্তবিক অর্থে তেমন আশাবাদী হবার কিছু মনে হয় না আছে বলে। কারন সরকার যাদের কাছে সম্পত্তি ইতোমধ্যে বিতরন করে দিয়েছে তারা সুড়সুড় করে দাবী ছেড়ে দেবে এমন নয়, আরো মারাত্মক জটিলতা আছে যেসব ক্ষেত্রে সম্পত্তি হাত বদল হয়েছে সেসবের ক্ষেত্রে। যিনি নুতন মালিক এবার ভিক্টিম হবেন তিনি। এটাও অন্য আইনের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এই যুক্তিতেই অর্পিত সম্পত্তি আইন বাতিলের ব্যাপারে অপর পক্ষ থেকে ’৯৮ সালেও আপত্তি এসেছিল। কিছু ভুল থাকে যা অমার্জনীয়, অমোচনীয়, রাষ্ট্রের পক্ষে তেমন ভুল করা হয়ে গেলে তা আর সংশোধনের কার্যকরি উপায় থাকে না। আমি খুব আশাবাদী হতে চাই যে একদিন আমাদের দেশেও সংখ্যালঘুদের দাবী দাওয়া সমাধিকার নিয়ে আন্দোলন করতে হবে না, কারন সেদিন সমাজে সংখ্যালঘু বলেই কিছু থাকবে না। সবাই হবে কেবল মানুষ, গুরু লঘু কেউ নয়। কালো সাদা হিন্দু, মুসলমান, শিয়া, সুন্নী, কাদিয়ানী এসবের কোন প্রভাব কোনভাবেই দৈনন্দিন জীবনে কোনভাবে পড়বে না। অন্য বহু দেশ এ ভাবেই অনেকটা এগিয়ে গেছে। আমরা কেন পারব না? এ দেশের বেশীরভাগ লোকেই সাম্প্রদায়িক নয়, এসব সমর্থন করে না জানি। তারপরেও কেন প্রতিবাদী কন্ঠস্বর এত ক্ষীন?

[gs-fb-comments]