বাংলা নববর্ষের প্রবর্তক রাজা শশাঙ্ক

১৫ এপ্রিল, ২০২০ : ২:৩৩ অপরাহ্ণ ১৮

রিপন চৌধূরী।।

বাঙ্গালী মানেই নববর্ষে পথচলা শুরু, আষাঢ়ে রথযাত্রা, আশ্বিনে দেবীর আরধনা, ফাল্গুনে দোলযাত্রা হয়ে চৈত্র সংক্রান্তিতে বর্ষশেষ। বার মাসে তের পার্বণের মধ্যে দিয়ে বঙ্গাব্দের একটি বছর হয় অতিক্রান্ত। বঙ্গাব্দ, বাঙ্গালীর নিজস্ব একটি যুগাব্দ। ভারতবর্ষে শুধুমাত্র বাঙ্গালীরই আছে নিজস্ব এক যুগাব্দ। কিন্তু প্রশ্ন, এই বঙ্গাব্দের পথচলা কবে শুরু হয়েছিল? সহজ হিসেব বলে, এই বছর ১৪২৭ বঙ্গাব্দ যদি ২০২০ খ্রিস্টাব্দ হয়, তাহলে বঙ্গাব্দের প্রথম বছর নিশ্চয় ২০২০ – ১৪২৬ অর্থাৎ ৫৯৪ খ্রিস্টাব্দ। ষষ্ঠ শতকের শেষ দশকে গুপ্ত সাম্রাজ্যের সামন্তরাজা শশাঙ্ক নিজেকে বঙ্গের স্বাধীন সার্বভৌম শাসক হিসেবে ঘোষণা করেন। মহারাজা শশাঙ্ক স্বাধীন নৃপতি হিসেবে তার শাসনকালের সূচনাকে স্মরণীয় করে রাখতে সূর্যসিদ্ধান্তভিত্তিক বর্ষপঞ্জী অনুসারে বঙ্গাব্দের প্রচলন করেন। এই ব্যাপারে সুনীলকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘বঙ্গাব্দের উৎস কথা‍’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেছেন,“সৌর বিজ্ঞান ভিত্তিক গাণিতিক হিসাবে ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দের ১২ এপ্রিল, সোমবার, সূর্যোদয় কালই বঙ্গাব্দের আদি বিন্দু।‍”

আকবর বঙ্গাব্দের স্রষ্টা?
অথচ আমরা ইদানীং শুনছি, বঙ্গাব্দের প্রতিষ্ঠাতা নাকি আকবর! প্রতি বছর নববর্ষের সময় পত্রপত্রিকায় এটা নিয়ে লেখা হচ্ছে। এক দশক আগেও কিন্তু এমনটা শোনা যেত না। গত শতাব্দীতে তো নয়ই। তাহলে এর মধ্যে কোন ঐতিহাসিক আবিষ্কার করলেন এই চাঞ্চল্যকর তথ্য? সেই ঐতিহাসিক আর কেউ নন স্বয়ং অমর্ত্য সেন! ২০০৫-এ প্রকাশিত ‘দ্য আগুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ান’ বইতে তিনি এই দাবীটি করেন। এরপর বিভিন্ন বক্তৃতায় তিনি এইটি বলতে শুরু করেন। ক্রমে এটি চালু হয়ে যায়। ‘বঙ্গাব্দের প্রতিষ্ঠাতা যে আকবর’, ইতিহাসের এই সামান্য তথ্যটি না জানার জন্য বুদ্ধিজীবীরা রীতিমত খোঁটা দিতে শুরু করেন বাঙ্গালীকে! আকবরপন্থীদের যুক্তি, খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে আকবর তারিখ-ই-ইলাহী নামে একটি সৌর বর্ষপঞ্জী চালু করেন। কিন্তু তার ভিত্তিবর্ষ ছিল ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ, আকবরের শাসনকালের প্রথম বছর। অর্থাৎ তারিখ-ই-ইলাহী শুরুই হয় তার ২৯তম বর্ষ থেকে। ওদিকে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ ছিল ৯৬৩ হিজরী। আকবরপন্থীদের মতে ১৫৫৬ খৃষ্টাব্দকে ৯৬৩ বঙ্গাব্দ ধরে, ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে তারিখ-ই-ইলাহীর সাথে সাথে বঙ্গাব্দও চালু করেন আকবর। অর্থাৎ বঙ্গাব্দ শুরু হয় তার ৯৬৩ + ২৯ = ৯৯১তম বর্ষ থেকে। চান্দ্রবর্ষ হওয়ায়, হিজরী ততদিনে আবার এক বছর এগিয়ে গেছে। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দ ছিল ৯৯২ হিজরী। আকবরপন্থীদের দাবী অনুসারে এই বছর থেকে যুক্ত হল ২৯ তারিখ-ই-ইলাহী ও ৯৯১ বঙ্গাব্দ। কিন্তু সত্যিই কি আকবর ‘বঙ্গাব্দ’ বা ‘বাংলা সন’ চালু করেছিলেন? আসুন দেখা যাক ইতিহাস কি বলে? যুক্তিই বা কি বলে? প্রথমত, ‘আইন-ই-আকবরী’-তে ৩০ পাতা জুড়ে বিশ্বের ও ভারতের বিভিন্ন বর্ষপঞ্জীর কালানুক্রমিক বিবরণ রয়েছে। সব শেষে রয়েছে তারিখ-ই-ইলাহী। কিন্তু ‘বঙ্গাব্দ’ বা ‘বাংলা সন’-এর কোনো উল্লেখ নেই। আকবর যদি সত্যিই ‘বঙ্গাব্দ’ বা ‘বাংলা সন’ প্রবর্তন করতেন, তাহলে আইন-ই-আকবরীতে তার উল্লেখ থাকবে না, একি সম্ভব?দ্বিতীয়তঃ ‘আইন-ই-আকবরী’-তেই স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে আকবর হিজরী সন পছন্দ করতেন না, তাই তিনি তারিখ-ই-ইলাহীর সূচনা করেন। সেই সঙ্গে তিনি যদি সত্যিই বঙ্গাব্দের সূচনা করতেন তার ভিত্তিবর্ষ নিজের প্রবর্তিত তারিখ-ই-ইলাহী সাথে সমান না রেখে অপছন্দের হিজরীর সাথে মেলাতেন কি? তৃতীয়তঃ আকবরের শাসনকালে মোগল সাম্রাজ্যে বাংলা, ইলাহাবাদ, অযোধ্যা, আগ্রা, পাটনা, মূলতান, কাবুল ইত্যাদি মোট বারোটি সুবা ছিল। তাহলে শুধুমাত্র বাংলার জন্য পৃথকভাবে বিশেষ একটি বর্ষপঞ্জী তৈরি করতে গেলেন কেন আকবর? কই কাবুলের জন্য তো কোনো পৃথক বর্ষপঞ্জী তৈরি করেননি তিনি। চতুর্থতঃ বাংলাকে তখন কার্যত শাসন করছেন প্রতাপাদিত্য, কেদার রায়ের মত প্রবল পরাক্রান্ত বারভুইঞারা। মোগলদের সাথে তাদের ঘোর বিরোধ। ‘মোগল অধিকৃত বাংলা’র রাজধানী তখন রাজমহল, বাংলার রাজনীতির ভারকেন্দ্র যশোহর বা শ্রীপুর থেকে বহু দূরে। মোগলদের দৃষ্টিভঙ্গীতে বাঙ্গলায় তখন জঙ্গলরাজ চলছে। সেই পরিস্থিতিতে সুশাসক বলে পরিচিত আকবর কেন একটি নতুন বর্ষপঞ্জী প্রণয়ন করার ঝুঁকি নেবেন? পঞ্চমতঃ পাঞ্জাব থেকে দাক্ষিণাত্য, গুজরাত থেকে অসম, মণিপুর, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া হয়ে সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া যেখানেই ভারতীয় সংস্কৃতি পৌঁছেছে, সকল জায়গাতেই বর্ষ শুরু পয়লা বৈশাখে। তাহলে কি বলেন? দিল্লির আকবর এই সকল জায়গায় ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করেছিলেন?‘আইন-ই-আকবরী’-তে ‘বঙ্গাব্দ’ বা ‘বাংলা সন’-এর যেমন উল্লেখ নেই, তেমনই উল্লেখ নেই ‘ফসল-ই-শান’ বা ‘ভাল ফসলের বছর’-এর। হিজরী সন চান্দ্র বর্ষপঞ্জী হওয়ায় অসময়ে রাজস্ব আদায় করতে গিয়ে সমস্যা হচ্ছে এবং তার জন্যই সৌর বর্ষপঞ্জী প্রণয়ন করেন আকবর এমন উল্লেখও নেই সেখানে। আবার প্রণয়নের পর সঠিক রাজস্ব আদায় হচ্ছে, তাও কোথাও বলা নেই। আকবরের আমলের সরকারী ইতিহাসে বরং বলা হচ্ছে হিন্দুস্থানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বর্ষপঞ্জীগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য আনতেই নতুন বর্ষপঞ্জী তারিখ-ই-ইলাহীর সূচনা হয়। এখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, শাসনকালের তিন দশকের মাথায় গিয়ে হঠাৎ এই সমস্যার কথা মনে পড়ল কেন? এই সমস্যার কথা সুশাসক বলে পরিচিত আকবরের আগে কেন মাথায় এল না? আসলে ঠিক দেড় বছর আগে, অক্টোবর ১৫৮২-তে পোপ অষ্টম গ্রেগরী পূর্বতন জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের সংস্কার সাধন করে নতুন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার প্রণয়ন করে ইউরোপে যে খ্যাতি অর্জন করেন, আকবরও ঠিক তেমনই খ্যাতিমান হতে চেয়েছিলেন। তাই মধ্য এশিয়ার সমরকন্দের গুরগানি গণনাপদ্ধতিকে ভিত্তি করেই তারিখ-ই-ইলাহী বর্ষপঞ্জী তৈরি করেন আকবরের জ্যোতির্বিদ ফতুল্লাহ শিরাজী। বাংলাদেশের পঞ্জিকা কমিটি ও বঙ্গাব্দের স্রষ্টানির্মাণ আকবর যে বঙ্গাব্দ প্রতিষ্ঠা করেননি তার পাথুরে প্রমাণও রয়েছে। নীতিশ সেনগুপ্তর বই ‘দ্য ল্যান্ড অফ টু রিভার্স’-এ উল্লেখ রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার ডিহারগ্রাম ও সোনাতপন গ্রামের হাজার বছরেরও প্রাচীন টেরাকোটার শিব মন্দিরের। ওই মন্দির দু’টির গায়ে বঙ্গাব্দের কথা খোদিত রয়েছে, যা আকবরের থেকেও প্রাচীন। আকবর বঙ্গাব্দ প্রচলন করেন, এটি তাহলে অমর্ত্য সেন পেলেন কোথা থেকে? এর উত্তর পেতে গেলে পিছিয়ে যেতে হবে অর্ধ শতাব্দী। ১৯৬০-এর দশকের পাকিস্তানে। পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা ও পূর্ব-পাকিস্তানের সরকারী ভাষা তখন বাংলা। অথচ রবীন্দ্রসাহিত্য সেখানে নিষিদ্ধ। ১৯৬৪-তেই ঘটেছে নারকীয় এক গণহত্যা। হাজারে হাজারে বাঙ্গালী হিন্দুর লাশ পড়েছে ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জে। রায়েরবাজারের কুমোর থেকে ঢাকেশ্বরী কটন মিলের মালিক, সকলেই তখন পথের ভিখারী। বাঙ্গালী হিন্দুকে অর্থনৈতিকভাবে উদ্বাস্তু করার পর এবার সাংস্কৃতিকভাবে ছিন্নমূল করার পালা। ১৯৬৬ সালে ঢাকার বাংলা একাডেমিতে ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে ‘পঞ্জিকা সংস্কার কমিটি’ তার ৪ নং সুপারিশে সিদ্ধান্ত নিল আকবরই বঙ্গাব্দের প্রবর্তক। এই ‘পঞ্জিকা সংস্কার কমিটি’ই বাংলা পঞ্জিকাকে খানিক পরিবর্তন করে একটি নতুন পঞ্জিকা প্রস্তাব করল, যা বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় ক্যালেন্ডার। এখানেই ১৪ই এপ্রিলের দিনটিকে পয়লা বৈশাখকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়, মাসের দিনগুলির সংখ্যা পাল্টে দেওয়া হয় ইত্যাদি। কিন্তু পূর্ব-পাকিস্তানের শেষদিনগুলিতে এই ক্যালেন্ডার প্রণয়নের সম্ভাবনা ছিল না, স্বাধীন বাংলাদেশেও আলোর মুখ দেখতে অপেক্ষা করতে হল প্রায় দু’দশক। ১৯৮৮-তে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঘোষিত হওয়ার ঠিক পরের বছরই চালু হল নতুন জাতীয় ক্যালেন্ডার, সাথে পেঁচা ও বাঘের মুখোশ সহকারে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’।দেশভাগের সময় সমগ্র বাংলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত করা যায়নি। তবে বৃহত্তর বাংলাদেশের স্বপ্ন এখনো অটুট। স্বপ্নের সেই ‘সুবে বাংলা’ গড়তে গেলে শুধু পশ্চিমবঙ্গের জমির দখল নিলেই চলবে না, বাঙ্গালী জাতিসত্ত্বারও দখল নিতে হবে। বাংলা ভাষার আরবীকরণ থেকে শুরু করে, আকবরকে বঙ্গাব্দের প্রতিষ্ঠাতার স্বীকৃতি দেওয়া, খন্ডিত পূর্ববঙ্গকে ‘বাংলাদেশ’ নামকরণ, ‘হাজার বছরের বাঙালি’ তত্ত্ব, সনাতন ঐতিহ্য বর্জিত নতুন বাংলা ক্যালেন্ডারের প্রণয়ন এই সবই বাঙ্গালী জাতিসত্ত্বাকে হাইজ্যাক করার এক একটি মাইলফলক। এই প্রচেষ্টার সাফল্যের জোরেই আজ পশ্চিমবঙ্গে বাঙ্গালী বিশ্বাস করছে আকবরই বঙ্গাব্দের প্রতিষ্ঠাতা। পাকিস্তান আমলে তাড়াহুড়ো করে বাংলার সঙ্গে সম্পর্কবিহীন আকবরকে বঙ্গাব্দের প্রতিষ্ঠাতা করতে গিয়ে বোধহয় একটু ভুল হয়ে গেছিল। কে জানত যে পূর্ব-পাকিস্তান আর টিকবে না! এখন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আবহে মোগল সম্রাট আকবর অনেকটাই যেন পাকিস্তানী। তাই বিগত দু’দশকে বঙ্গাব্দের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ‘সুলতান-ই-বাঙ্গালাহ’ আলাউদ্দিন হুসেন শাহের নাম চর্চা হচ্ছে বাংলাদেশে। কিন্তু তাকেও ‘বাঙালি’ করতে সম্ভবত কোনো অসুবিধে হচ্ছে। কারণ বঙ্গাব্দ প্রতিষ্ঠাতাদের তালিকায় এখন দ্রুত উঠে আসছেন মুর্শিদকুলি খাঁ। ‘সুবে বাংলা’র স্বপ্নদর্শীরা যতদিন না তাদের মনমত বঙ্গাব্দ প্রতিষ্ঠাতা খুঁজে পাচ্ছেন এমন অনেক খাঁ-ই আসবেন যাবেন। আর বাঙ্গালীর অস্তিত্ব সংকট গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকবে। সেই সংকট থেকে বাঁচতে গেলে বাঙ্গালীকে ফিরতে হবে তার শিকড়ে। অধিকার করতে হবে নিজের ভাষা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও জাতিসত্ত্বাকে। তার প্রথম ধাপ হিসেবে আজ বাঙ্গালীকে অবশ্যই স্মরণ করতে হবে বঙ্গাব্দের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা গৌড়েশ্বর মহারাজাধিরাজ শশাঙ্ককে। যিনি বাঙ্গালীকে পরিণত করেছিলেন সুসংহত এক জাতিতে, দিয়েছিলেন এক গৌরবময় পরিচয়, প্রচলন করেছিলেন বঙ্গাব্দের।

[gs-fb-comments]