আজ বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের জন্মদিন

25 May, 2020 : 4:48 pm ১৫৩

রিপন।।

১৯২৩ সালের জানুয়ারি মাস। কলকাতার প্রেসিডেন্সি আদালতে চলছে রাজদ্রোহের মামলা। ধূমকেতু পত্রিকার সম্পাদককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ আদালতে পেশ করেছে। এই পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করার প্রচার চালানো হচ্ছে। ইন্ধন দেওয়া হচ্ছে সশস্ত্র বিপ্লবের। ব্রিটিশ সিংহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক, গুরুতর অপরাধ। কিন্তু অপরাধী অকুতোভয়। সুঠাম শরীর, ঝাঁকড়া চুল, সরু গোঁফ আর উজ্জ্বল চোখের অধিকারী সেই যুবকের মধ্যে চিন্তার লেশ মাত্র নেই। বিদ্রোহের আগুন যেন ঠিকরে বেরোচ্ছে দুচোখে। কাঠগড়ায় দাঁড়ালেন তিনি।শুরু করলেন জবানবন্দি। যেন সাইক্লোন বইছে ঘরে। অগ্নিবীণা তে উঠেছে সুর।.……”আমার উপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী। তাই আমি আজ রাজকারাগারে বন্দি এবং রাজদ্বারে অভিযুক্ত।… আমি কবি,আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তিদানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। কবির কণ্ঠে ভগবান সাড়া দেন, আমার বাণী সত্যের প্রকাশিকা ভগবানের বাণী। সেবাণী রাজবিচারে রাজদ্রোহী হতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারে সে বাণী ন্যায়দ্রোহী নয়, সত্যাদ্রোহী নয়। সত্যের প্রকাশ নিরুদ্ধ হবে না। আমার হাতের ধূমকেতু এবার ভগবানের হাতের অগ্নি-মশাল হয়ে অন্যায় অত্যাচার দগ্ধ করবে…।”কে এই যুবক? ব্রিটিশের মুখের ওপর কোন কবির এইরকম সপাটে জবাব। কে এই বিদ্রোহী? উত্তর পেতে আমাদের যেতে হবে বর্ধমানের সেই প্রত্যন্ত গ্রাম চুরুলিয়ায়।ফকির আহমেদের ষষ্ঠ পুত্র দুখু মিয়া মাত্র ৯ বছর বয়সে পিতাকে হারিয়ে মসজিদের মুয়াজ্জিন এর কাজ নেন।মসজিদের সাথেই চলতে থাকে ধর্মীয় শিক্ষা। ইসলামিক দর্শনে আসে তার অগাধ জ্ঞান। কিন্তু সেই পেশায় সম্মান আছে অর্থ নেই। তাই গ্রামীণ যাত্রা বা লেটোর দলে শুরু হয় পালাগান। সেই সূত্রেই জানতে হয় হিন্দু পুরাণ, রামায়ন, মঙ্গলকাব্যের কাহিনী। হিন্দু সংস্কৃতিতেও বাড়ে তার আগ্রহ। এর সঙ্গেই রানীগঞ্জ এর শিয়ার শোল স্কুলে শুরু হয় পড়াশোনা। কিন্তু পেটের জ্বালা বড়ো দায়। তাই আবার সব ছেড়ে এক খাবারের দোকানে বয়ের কাজ। কিন্তু সুর ছন্দ তাঁর রক্তে। সঙ্গে চলে কবিতা লেখার চর্চাও।সেই রক্তে সুরের সাথে আর একটা বৈশিষ্ট্যও প্রকট হচ্ছিল, তার নাম লড়াই। সেই টানেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগ দিলেন ইংরেজ সেনা দলে। গেলেন করাচি। সেখানে আরবী ফারসি। পরিচিত হলেন খিলাফতের আদর্শের সঙ্গে। যুক্তি দিয়ে বুঝলেন তুরস্ককে মধ্যযুগে আটকে রাখার আদর্শের নাম খিলাফত। তাঁর রক্তে দোলা দিলো রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক আদর্শ আর তুরস্কের আধুনিকতার জনক কামাল পাশা। যুদ্ধ শেষে ফিরলেন বাংলায়। দেশ তখন মেতেছে অসহযোগ আর খিলাফত আন্দোলনে। তিনি মনে করলেন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অহিংসা নীতি অসাড়। তাই হাতে নিলেন অগ্নিবীণা। সুর তুললেন বিদ্রোহের। ১৯২০ তে ফজলুল হকের নবযুগ পত্রিকায় লেখা আরম্ভ করলেন। ব্রিটিশ রাজের শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। ব্রিটিশের নজর পড়লো তাঁর ওপর। একদিকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা অন্যদিকে কামাল পাশার আদর্শে মুসলিম সমাজকে আধুনিক করা। লড়াই শুরু হলো তাঁর। প্রকাশ করলেন ধূমকেতু পত্রিকা। যে পত্রিকার উদ্দেশ্যে রবি ঠাকুর লিখলেন,
….”আয় চলে আয়রে ধূমকেতু।
আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু, দুর্দিনের এই দুর্গশিরে উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।”সেই সময় আকৃষ্ট হলেন সমাজতন্ত্রের মহান আদর্শে। ইংরেজদের মতোই ভারতের চরম শত্রু দারিদ্র্য, ক্ষুধা, শ্রমিক কৃষকদের ওপর শোষণ। তাই শ্রমিক সংগঠনের সভায় সভায় উদাত্ত কণ্ঠে গাইলেন মুক্তির গান। লিখলেন ” চোখ ফেটে এলো জল, এমনি করে কি জগৎ জুড়িয়া, মার খাবে দুর্বল?” কমিউনিস্ট নেতা মুজফ্ফর আহমেদের সংস্পর্শে এসে কৃষক সভার লাঙল পত্রিকার সম্পাদক হলেন? ডাক দিলেন, ” কে আছো জোয়ান, হও আগুয়ান হাঁকিছে ভবিষ্যৎ।” গাইলেন রণ সঙ্গীত,”উষার দুয়ারে হানি আঘাত, আমরা আনিব রাঙা প্রভাত, বাধার বিন্ধ্যাচল। চল চল চল”.। রাজ দ্রোহের অপরাধে এক বছর কারাদণ্ড হলো তাঁর। কিন্তু তিনি অদম্য। চিৎকার করে উঠলো তাঁর বিদ্রোহী কণ্ঠ, ” কারার ঐ লৌহ কপাট, ভেঙে ফেল কর রে, লোপাট, রক্ত জমাট, শিকল পূজার পাষাণ বেদী।”
রক্তে দোলা লাগলো ভারতবাসীর। অগ্নিবীণা কাব্যগ্রন্থের বিদ্রোহী কবিতায় বাঙালির রক্তে আগুন ছুটলো….
“মহা-বিদ্রোহী রণক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়ুগ কৃপাণ ভীম রণ, ভূমে রণিবে না-
বিদ্রোহী রণক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।”

কিন্তু বিদ্রোহের এই তেজ বুঝি অসহ্য হলো পরম শক্তিধরের কাছে। রবি অস্তাচলে যাবার পরের বছরই ব্রিটিশ সিংহ যাকে দমাতে পারে নি, সেই বিদ্রোহী কবি স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারালেন, চির নির্বাক হয়ে রইলেন জীবনের বাকি ৩৪ বছর। দেশ স্বাধীন হলো, ইংরেজ শাসনের অবসান হলো, কতো ঘটনা, বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশ কিচ্ছু স্পর্শ করলো না তাঁকে। অসহায় চোখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা। বড়ো বেদনার সে অধ্যায়। ১৯৭৬ সালে চির ঘুমে গেলেন বিদ্রোহী কবি। রণক্লান্ত নির্বাক নিশ্চুপ।আজ বড়ো দুঃসময়। বড়ো দরকার আজ তাঁকে।যিনি ইসলামিক কাওয়ালির সাথেই উদাত্ত কণ্ঠে গেয়ে উঠবেন শ্যামা সঙ্গীত, কালো মেয়ের পায়ের তলায়, দেখে যা আলোর নাচন। যিনি চিৎকার করে সাবধান করবেন, “হিন্দু না ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন,” বলে উঠবেন “কান্ডারী দেখো ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মার।” যিনি পুত্রের নাম রাখবেন কৃষ্ণ মহম্মদ। যিনি হাসি মুখে বলবেন,
“কেউ বলেন আমার বানী যবন কেউ বলেন কাফের। আমি বলি ও দুটোর কোনটাই না। আমি শুধু হিন্দু মুসলিম গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি।” যিনি রেললাইনে পড়ে থাকা শ্রমিকদের মৃতদেহ দেখে আক্রোশে চিৎকার করে উঠবেন, ” যে দধিচি দের হাড় দিয়ে ওই বাষ্প শকট চলে, বাবু সাব এসে চড়িল তাহাতে, কুলিরা পড়িল তলে।” সাবধান করে দিয়ে বলবেন, ” আসিতেছে শুভ দিন, দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ।” তিনি নেই। ১৯৭৬ সালেই নীরব হয়েছেন তিনি। কিন্তু তাঁর বিদ্রোহী কণ্ঠ আজও দোলা লাগায় প্রাণে। শোনায় মুক্তির গান। ২৫ মে বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের জন্মদিন। প্রণাম জানাই তাঁকে।

আমি চির বিদ্রোহী বীর –
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির উন্নত শির!

তথ্য – উইকিপিডিয়া

[gs-fb-comments]