বাঞ্ছারামপুরে জামায়াতের নতুন কৌশল

28 September, 2020 : 1:12 pm ১০৯

বিশেষ প্রতিনিধি।।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে জামায়াত নতুন কৌশলে এগিয়ে যাচ্ছে। যদিও অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, জামায়াতে ইসলামী নামের রাজনৈতিক দলের কোন কার্যক্রম বাঞ্ছারামপুরে নেই। বেশ কিছুদিন পূর্বে অবশ্য সাবেক জামায়াতিদের একটি নতুন দল আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবিপি) নামে আত্মপ্রকাশ করেছে। যারা এই দলের হাল ধরেছেন তারা নিজেদের জামায়াতে ইসলামী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বলে দাবি করছেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর কোন কর্মকাণ্ড গত নির্বাচনের পর থেকে দেখা যাচ্ছে না। ফলে মনে হতেই পারে যে রাজনীতিতে জামায়াত এখন আর নেই। কিন্তু বাস্তবচিত্র ভিন্ন। বাঞ্ছারামপুরে অতি গোপনে ও কৌশলে চলছে জামায়াতের কার্যক্রম। নেপথ্যে থেকে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা জামায়াতের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন উপজেলার একজন শীর্ষ ব্যবসায়ী, দশদোনা গ্রামের জনৈক প্রবাসী, ইসলামী ব্যাংকের সাবেক একজন শীর্ষ কর্মকর্তা সহ আরও কয়েকজন। বাঞ্ছারামপুরের একটি প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল, একই মাদ্রাসার সহকারি শিক্ষক ও বাঞ্ছারামপুরের একটি বেসরকারি কলেজের শিক্ষক সহ ৭-৮জন গত ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাজধানী ঢাকার একটি বাসায় গোপন মিটিং করে। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, বাঞ্ছারামপুর উপজেলা জামায়াত রাজনীতির কৌশল নির্ধারণে একটি পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামবে। সেই পরিকল্পনা মোতাবেক বাঞ্ছারামপুর পৌরসভা নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে তারা ৩জন প্রার্থী দিবে। আর সেই ৩জন প্রার্থীর সমস্ত টাকা বহন করবে বাঞ্ছারামপুরের ওই প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও দশদোনা গ্রামের ধর্ণাঢ্য প্রবাসী। ১৯৭১ সালে ন্যক্কারজনক ভূমিকার পর দলটি নিষিদ্ধ ছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পর দলের সমর্থকরা নানা কৌশলে রাজনীতির মাঠে আসতে শুরু করে। তাদের নাম প্রথমে রাখা হয় মজলিসে ইসলামি, পরে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ, এরপর আশির দশকে আত্মপ্রকাশ করে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ নামে। বাঞ্ছারামপুরে জামায়াতে ইসলামীর প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ ঘটে ২০০১ সালে। নির্বাচন পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের পার্টি অফিসে ক্যাপ্টেন এ বি তাজুল ইসলাম অবস্থান করেছিলেন। ওই সময় চারদলীয় জোট সরকারের বিজয় মিছিল ছাত্রবন্ধু লাইব্রেরির সামনে এসে অবস্থান করে এবং জামায়াতের জনৈক নেতার ঢিলেই ক্যাপ্টেন তাজের কপাল রক্তাক্ত হয়। ২০০২ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের দেখে আইয়ুবপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা সালামতউল্লাহ সর্বপ্রথম প্রতিবাদ করে অনুষ্ঠান থেকে বেরিয়ে আসেন। বাঞ্ছারামপুর থানার মোড়ে বিএনপির সাথে একাত্ম হয়ে ক্যাপ্টেন এ বি তাজুল ইসলামের গাড়ি বহরে হামলা করে সর্বপ্রথম নিজেদের শক্তি জানান দেয়। ২০০৬ সালে জানুয়ারিতে বাঞ্ছারামপুরের বিভিন্ন মাজারে জামায়াতের হামলার আশঙ্কা শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হলে স্থানীয় সাংবাদিক মনিরুজ্জামান পামেনের উপর তীব্র আক্রোশে ফেটে পড়ে। পরে স্থানীয় বিএনপির নেতাদের সাথে মিলে বাঞ্ছারামপুর বার্তা পত্রিকার অফিসে হামলা চালিয়ে ভাংচুর ও লুটপাট করে জামায়াত। ১/১১ এর পর বাঞ্ছারামপুর থেকে বিএনপির চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা এলাকা ছেড়ে দিলেও জামায়াতে ইসলামীর নেতারা কৌশল অবলম্বন করে কিছুদিন চুপ করে থাকে। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে ছয়ফুল্লাকান্দিতে ক্যাপ্টেন এ বি তাজুল ইসলামের উপর শাহজাহান চেয়ারম্যানের ভাতিজা নূর মোহাম্মদের নেতৃত্বে যখন হামলা হয়েছিল, তখন সেই হামলার ইন্দনদাতা ছিল বাঞ্ছারামপুর উপজেলা জামায়াত। ওই হামলায় কাঞ্চনপুর মোড়ে সাংবাদিকদের গাড়ি বহরও আক্রমণ করে জামায়াত। বিএনপি জামায়াতের সেই হামলায় বাঞ্ছারামপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা পালিয়ে গেলেও তার দেহরক্ষী জাহাঙ্গীর আলমের সাথে বাঞ্ছারামপুরের সাংবাদিক মনিরুজ্জামান পামেন ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সমস্ত সাংবাদিকরা অবস্থান করেছিলেন। দেহরক্ষী বাখরনগরের জাহাঙ্গীর আলম ও সাংবাদিকরা ভূমিকা না নিলে সেদিন নূর মোহাম্মদের আঘাতে ক্যাপ্টেন এ বি তাজুল ইসলামের মাথা দুই ভাগ হয়ে যেতো। সেদিনে জামায়াতের তান্ডব ছিল চোখে পড়ার মতো। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে এবং ক্যাপ্টেন এ বি তাজুল ইসলাম বিজয়ী হলে বাঞ্ছারামপুর সোবহানিয়া ইসলামীয়া মাদ্রাসার ২ জন, খাল্লা দারুস সুন্নাহ ইমাম মেহেদী মাদ্রাসার ১ জন, মানিকপুর মাদ্রাসার ৩জন, শাহ রাহাত আলী মাদ্রাসার ১ জন ও ফরদাবাদ আকবর আল উলুম মাদ্রাসার ২ জন এবং ড. রওশন আলম কলেজের একজন শিক্ষক আবারও কৌশল অবলম্বন করে মাস ছয়েক উপজেলার বাইরে অবস্থান নেয়। পরে ২০০৯ সালের আগস্ট মাসের শেষ দিকে জামায়াতের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ওই শিক্ষকদের এলাকায় দেখা যায়। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত স্থানীয় অনেক নেতা তাদের প্রতি বিভিন্নভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা জামায়াত একেবারেই চুপ থাকে। কিন্তু গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবারও মাথা চাড়া দিয়ে উঠে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা জামায়াত। এই দীর্ঘসময়ে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা জামায়াতের নেতাদের সাথে গোপনে আর্থিক লেনদেনের সুবিধায় তাদেরকে সহযোগিতা করেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। ২০১৬ সালের পর থেকে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা ছাত্রলীগের বেশ কয়েকটি পদ বাগিয়ে নেয় শিবিরের নেতারা এমন অভিযোগ রয়েছে। একই সাথে উপজেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে গোপনে নিজেদের দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছে জামায়াত। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় বিএনপির কয়েকজন নেতা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করলেও জামায়াত তাদের দলীয় নেতাকর্মী ও আত্মীয় স্বজনদের সরকারি চাকুরিতে নিয়োগ দিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। তখন তারা বেশ সফলও হয়। ২০০১-২০০৬ পর্যন্ত বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় সরকারি চাকুরিতে ৫০শতাংশ জামায়াতের নেতাকর্মীদের চাকুরি হয় বলে একটি সূত্র থেকে জানা যায়। ওই সময় বাঞ্ছারামপুরের মাদ্রাসাগুলোতে যত নিয়োগ হয়েছে সবই জামায়াতের লোক। তাছাড়া বাঞ্ছারামপুর উপজেলার শতকরা ৯৫ শতাংশ মসজিদে ইমাম ও মুয়াজ্জিন ছিল জামায়াতের অনুসারি। দৈনিক ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে বের হয়েই বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা ও ক্যাপ্টেন এ বি তাজুল ইসলামের নামে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করাই ছিল তাদের কাজ। আজকে সেই তাদেরই বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা, এমন অভিযোগ করছে অনেকে। সম্প্রতি আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবিপি) বাঞ্ছারামপুরে কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটিতে আওয়ামী লীগের অনেকে সম্পৃক্ত। তারা থেমে নেই, বসেও নেই। তাদের সংযোগ নীরবে চলছে। তাদের সমর্থকরাও মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করছে। জামায়াতের নতুন এই দলের অনেক নেতাকর্মী আওয়ামী লীগের ছবি পোস্ট করছে। সেই সাথে আওয়ামী লীগের জয়গান গেয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি নিরবে জামায়াতের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাঞ্ছারামপুর পৌরসভার জনৈক কমিশনারের ভাইয়ের একটি কফি হাউসে বছর দুয়েক পূর্বে নিয়মিত জামায়াতের গোপন মিটিং চলতো। বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর কিছুদিন কৌশল বদল করে কার্যক্রম বন্ধ রাখে। পরে ছাত্রলীগের কয়েকজনকে হাত করে আবারও কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে। এই মুহুর্তে বাঞ্ছারামপুরের মসজিদ ও মাদ্রাসা ভিত্তিক জামায়াতের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলে কৌশল অবলম্বন করে এগিয়ে যাচ্ছে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা জামায়াত শিবিরের কার্যক্রম।

[gs-fb-comments]