কথাশিল্পী অদ্বৈত মল্লবর্মন

3 October, 2021 : 12:18 pm ৪৭

রিপন চৌধূরী।।

কালজয়ী দুর্লভ গৌরবের অধিকারী লেখকের সংখ্যা পৃথিবীতে খুব কম। যে কয়জন হাতে গোনা লেখক এই গৌরবের অধিকারী অদ্বৈত মল্লবর্মন তাঁদের অন্যতম। যতই দিন যাচ্ছে অদ্বৈত মল্লবর্মন এবং তাঁর স্বকালে স্বল্প খ্যাত উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদির নাম’ এর জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি চন্দ্রিমা সময়ের কুটিল ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে উত্তোরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাঠকের মুগ্ধতা ও ভালবাসায় সিক্ত হচ্ছে।
জেলে পাড়ায় জল জীবী মালোদের ঘরে ১৯১৪ সালে ১লা জানুয়ারী ক্ষণজন্মা ও বিরল প্রতীভা অদ্বৈতর জন্ম হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের তিতাস পাড়ের গোকর্ণ ঘাট গ্রামে। তাঁর পিতার নাম অধর চন্দ্র বর্মন। সামান্য ডাক বাজিয়ে কিংবা উলুধ্বনি দিয়ে তাঁকে স্বাগত জানানোর মতো পরিস্থিতি ছিল না সেদিন গোকর্ণ ঘাটের মালো পাড়ায়।
শৈশবেই পিতা-মাতাকে হারিয়ে ছিলেন অদ্বৈত। অল্প দিনের ব্যাবধানে হারিয়ে ছিলেন দুই সহোদরকে। একমাত্র দিদি যার বিয়ে হয়েছিল গ্রামেই। দুই সন্তান সহ দিদিও বিধবা হয়ে যান যৌবনেই।
ভাঙ্গন দেখেছেন অদ্বৈত নদীর ভাঙ্গন, সমাজের ভাঙ্গন, পরিবারের ভাঙ্গন। স্বজন হারানোর ব্যাথা ভার শৈশবেই স্তব্দ ও নীরব করে দিয়েছিল অদ্বৈতকে। বুকের ভিতর জাগিয়ে দিয়ে ছিল এক অপার শুন্যস্থান যা তাকে সারা জীবন কুরে কুরে খেয়েছে, অন্য দিকে তার সৃষ্টির প্রেরণা ও জুগিয়েছে।
নাবালক অদ্বৈত গ্রামীন মেলায় মনোহরী দোকানে সাজানো হাজারো আকর্ষনীয় জিনিষের মধ্যে থেকে কচি হাতে তুলে নিয়েছিলেন বাল্য শিক্ষার বই। বিষ্ময় মুগ্ধ বড় বড় চোখে তাকিয়ে দেখছিলেন বর্ণমালা। একের পর এক উল্টে যাচ্ছিল বাল্য শিক্ষার পৃষ্ঠা। ধ্যান ভেঙ্গে দিয়েছিল দোকানীর ধমকে। জাইল্যার পোলার আবার লেখা পাড়ার শখ। যা ভাগ জাল ছোড়া শেখ গে যা। তুচ্ছ বালির বাধ নদীর স্রোতকে কি স্তব্দ করতে পারে?
ব্রাহ্মণবাড়িয়া মাইনর (এমই) স্কুলে পড়াশুনা শুরু করে অদ্বৈত। লেখা পড়ার প্রচলন ছিলনা মালুদের ঘরে। খালিপায়ে হেঁটে হেঁটে শত শত ছিদ্র ফতুয়া পড়ে স্কুলে গেলেও ক্লাশে প্রথম হওয়া আটকায়নি তাঁকে।
এভাবেই সাতটি বছর দিদির বাড়ীতে। পাড়া-পরশী, স্কুলের সহ পার্টি কিংবা স্কুলের শিক্ষক মশাই- প্রত্যেকেরই স্নেহ আর ভালবাসা জয় করে নিয়েছিলেন শৈশবেই।
কলকাতার মেদিনিপুরের বীর সিংহ গ্রামের আরেক সিংহ শিশু ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের, আশৈশব প্রচন্ড কৃচ্ছ সাধণ আর নিরন্তর সাধনা এই দুয়ের অপূর্ব সংমিশ্রণ যেমন দেখা যায় ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যা সাগরের জীবনে, তেমনি অদ্বৈতরও অনেক পন্ডিত প্রবর ব্যাক্তিরাও নির্ধিধায় বলে গেছেন।
মাইনর স্কুল থেকে স্কলার শিপ পেয়ে ১৯২৭ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অন্নদা হাই স্কুলে ভর্তি হন অদ্বৈত। নগ্ন পায়ে ৩ মাইল রাস্তা হেটে ১৩ বছরের অদ্বৈতকে অন্নদা স্কুলে যেতে হত। দারুন দখল ছিল ভাষা ও সাহিত্যে। বরাবর সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছেন বাংলায়। ১৯৩৩ সনে প্রথম বিভাগে ম্যাট্টিকুলেশন পাশ করে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হয়ে, এক কায়স্থ পরিবারের ছেলে-মেয়েদের গৃহ শিক্ষক হিসাবে লজিং নিয়ে খাওয়া-থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন।
আর্থিক অনটনের জন্য প্রথম বর্ষের ছাত্র থাকাকালীন সময়েই পড়াশুনা ছেড়ে দিতে বাধ্যহন অদ্বৈত। বিধবা দিদির দুই নাবালক পুত্র চিন্তাহরণ ও সুশীলদের দায় ভার এসে পড়ল অদ্বৈতের কাঁধে। ১৯৩৪ সনে ২০ বছর বয়সে জীবিকার সন্ধ্যানে চলে যান কলকাতায়। ত্রিপুরার লোক বলে, ত্রিপুরা হিতসাধিনী সভার মাসিক পত্রিকায় শুরু হয় কর্ম জীবন ১৯৩৫ সনে যোগদেন সহকারী সম্পাদক হিসাব নব শক্তি পত্রিকায়। সম্পাদক প্রেমেন্দ্র মিত্রের সব কাজ ও করতে হতো অদ্বৈতকে। প্রেমেন্দ্র এর পরিবর্তে অদ্বৈতকেই পরবর্তীতে নব শক্তির সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করতে হয়। এছাড়াও অদ্বৈত মল্ল বর্মন কাজ করেছেন ‘আজাদ’ ‘মোহাম্মদী’ ‘নবযুগ’ ‘কৃষক’ ‘যুগান্তর’ ‘দেশ’ পত্রিকা এবং বিশ্ব ভারতীয় প্রকাশনা বিভাগে।
বই আর মানুষের প্রতি ভালবাসার টানে দির্ঘ দিন অনাহার অর্ধাহারে কেটেছে তাঁর জীবন। মেধাবী ও পরিশ্রমী অদ্বৈত ছিলেন অবিবাহিত। কিন্তু তার দায়িত্ব ছিল প্রচুর। বিধবা দিদির পরিবারের ভরন পোষনের জন্য অদ্বৈত অসম্ভব খাটতেন। দিদি ছাড়াও অদ্বৈত নিয়মিত টাকা পাঠাতেন গোকর্ণ ঘাটের মালোপাড়ার বিদ্যালয়ের জন্য। দুঃস্থ অনাত্মীয়দের সাহায্য করা ছাড়াও তার ছিল গ্রন্থ প্রিতি। নানা রকম বই কিনতেন অধিকাংশ ইংরেজী বই।
কলকাতার বেলেঘাটার ষষ্ঠিতলার বাসা বাড়ির চিলে কোঠায় থাকতেন এবং নিজেই রান্না করে খেতেন। শেষের দিকে একটা ছেলে তাঁকে রান্না করে দিত। বাড়ির ছাদের উপর চিলে কোঠায় বইয়ের পাহাড়ের মধ্যে ডুবে থেকে যক্ষ্মা রোগাক্রান্ত অদ্বৈত মল্ল বর্মন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ লিখেছেন।
বড়ই অন্তমুখি স্বভাবের মানুষ ছিলেন অদ্বৈত মল্লবর্মন। নিজের কষ্টের কথা কাউকে বলতেন না। শেষ পর্যন্ত দেশ ও আনন্দবাজার পত্রিকা কতৃপক্ষ তার চিকিৎসা করায় কাঁচপাড়া যক্ষ্মা হাসপাতালে। ধীরে ধীরে সেরে ও উঠেছিলেন। তবে এক সময় কাউকে কিছু না জানিয়ে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে আসেন।
শরীরে প্রতি অবহেলা আর অপুষ্টির শিকার হয়ে ৩৭ বছর বয়সেই ১৯৫১ সনের ১৬ এপ্রিল তাঁর জীবন দীপ নিভে যায়। শুধুমাত্র ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসেই অদ্বৈত প্রতিভা নিশেষিত নয়। তিনি ‘রাঙামাটি’ সাদা হাওয়া ‘দু’টি উপন্যাস লিখেছেন জীবন ‘তৃষা’ অনুবাদ উপন্যাস ‘ভারতে চিঠি পার্ল বার্ককে’ পত্র প্রবন্ধ বারমাসী গান ও অন্যান্য নামে গবেষণা গ্রন্থ। ‘দলবেধে’ গল্প গ্রন্থ, গল্প-কবিতা, রম্য রচনা, ভ্রমন সাহিত্য, ফিচার, প্রবন্ধ এবং অসংখ্য সংবাদ ভাষ্য। এক কথায় সব শাখাতেই ছিল অদ্বৈতর অবাধ বিচরণ।

অদ্বৈতমল্ল বর্মন রচনা প্রঞ্জী
প্রবন্ধ-নিবন্ধ
১। অপ্রকাশিত পল্লীগীতি, ২। অপ্রকাশিত পুতুল বিয়ের ছড়া, ৩। অপ্রকাশিত পুতুল বিয়ের ছড়া, ৪। আম্রতত্ত্ব, ৫। এ দেশের ভিখারী সম্প্রদায়, ৬। উপাখ্যানমূক সংগীত, ৭। ছায়াছবির ছবি ও কাহিনী, ৮। ছোটদের ছবি আঁকা, ৯। জল সত্তয়া সংগীত, ১০। টিএস এলিয়ট, ১১। দুটি বারমাসী গান, ১২। ত্রিপুরার একটি বারমাসী গান, ১৩। নাইওরের গান, ১৪। পল্লী সংগীতে পালা গান, ১৫। পরিহার সংগীত, ১৬। পাখীর গান, ১৭। প্রাচীন চীনা চিত্রকলার রূপ ও রীতি, ১৮। বর্ষার কাব্য, ১৯। ভাই ফোঁটার গান, ২০। মাঘমন্ডল, ২১। বরজের গান, ২২। রোকেয়া জীবনী, ২৩। শেওলার পালা, ২৪। সাগরতীর্থে।
উপন্যাস:
১। তিতাস একটি নদীর নাম, ২। শাদা হাওয়া, ৩। রাঙামাটি, ৪। জীবনতৃষা (অনুবাদ উপন্যাস: আরভিং স্টোন-এর লেখা- লাস্ট ফর লাইফ-এর অনুবাদ)
গল্প:
১। ‘দল বেঁধে’: গল্প গ্রন্থ, ২। স্পর্শ দোষ, ৩। সন্তানিকা, ৪। কান্না, ৫। বন্দী বিহঙ্গ
পত্র-প্রবন্ধ :
‘ভারতের চিঠি পার্ল বাককে’ : জীবিতকালে অদ্বৈত মল্লবর্মনের একমাত্র প্রকাশিত গ্রন্থ।
রম্যরচনা :
নাটকীয় কাহিনী
অনুদিত উপন্যাস:
A River Called Titash কল্পনা বর্ধন কর্তৃক অনুবাদিত ও সম্পাদিত। ফরাসী ভাষা এবং উড়িয়া ভাষায়ও ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসটির অনুবাদ হয়েছে।
* অদ্বৈত মল্লবর্মন রচনাবলীর সম্পূর্ন তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি।

[gs-fb-comments]
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com