গরু আমদানি নয় উৎপাদনে জোর

1 September, 2015 : 8:48 am ১৫৪

ডেস্ক রিপোর্ট : আমদানি করে ‘সাময়িক’ সঙ্কট নিরসন নয়, দেশে উৎপাদন বাড়িয়ে স্থায়ীভাবে চাহিদা মেটানোর পরিকল্পনা করেছে সরকার। এ লক্ষ্যে নানামুখী পদক্ষেপও নেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নামমাত্র সুদে (৫ শতাংশ) গরু পালনে উৎসাহী চাষিদের ঋণ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বাণিজ্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে এ তথ্য।

বাণিজ্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং পশু ও মাংস বিক্রেতারা বলছেন, এখন চড়া মূল্যে পশু আমদানির বিষয়ে তেমন তৎপরতা নেই সরকারের। বরং দেশের কৃষকদের ন্যায্যমূল্য দেয়ার ব্যাপারেই বেশি আগ্রহী নীতিনির্ধারকরা। তারা মনে করছেন, পশু সঙ্কটের কারণে এবারের ঈদের বাজার কিছুটা চড়া থাকলেও আগামীতে বেশি দাম পাওয়ার আশায় গরুসহ সব ধরনের পশু পালনে আগ্রহী হবেন দেশের প্রান্তিক কৃষকরা। আর গ্রামনির্ভর বাংলাদেশে পশু পালনের সম্ভাবনাও অনেক। এতে স্থায়ীভাবে পশু সঙ্কট নিরসন হবে, অন্যদিকে বেকার সমস্যাও দূর হবে। আরো মজবুত হবে গ্রাম্য অর্থনীতিও।

এ ছাড়া দেশেই থাকবে বছরে আমদানি ব্যয় ও চোরাইপথে পাচার হওয়া অন্তত ছয় হাজার কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ‘দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন নীতি’র কারণে গত পাঁচ দিনের ব্যবধানে বাণিজ্যমন্ত্রী ও বাণিজ্য সচিবের দুই ধরনের বক্তব্য মিলেছে। তারা উদাহরণ হিসেবে জানান, গত বৃহস্পতিবার বাণিজ্য সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘আসন্ন কোরবানি ঈদে পশু সঙ্কটের কোনো আশঙ্কা নেই। চাহিদা অনুযায়ী ঘাটতি থাকা ১০ লাখ পশু ভারত থেকে আনা হবে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের মাধ্যমে। আর এ প্রক্রিয়া দ্রুতই শুরু হবে।’ এরপর পাঁচ দিন পার হলেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি অনুবিভাগের কেউই পশু আমদানির ব্যাপারে গতকাল পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি। বরং গতকাল বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ভবনে দ্রব্যমূল্য পর্যালোচনা কমিটির সভায় বলেছেন, দেশে পর্যাপ্ত পশু রয়েছে। আসন্ন ঈদে ভারত থেকে গরু না এলেও কোরবানির পশুর কোনো সঙ্কট হবে না। তিনি প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাবের উদ্ধৃতি দিয়ে জানান, দেশের কৃষকের ঘরে বিক্রির উপযোগী ৩৪ লাখ গরু-মহিষ ও ৭৯ লাখ ভেড়া-ছাগল রয়েছে, যা প্রস্তুত আছে কোরবানির জন্য।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় গরু-মহিষে চাহিদা মিটেছে বাংলাদেশিদের। এবার হঠাৎ করেই ঘোষণা দিয়ে সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করেছে দেশটির সরকার। ফলে গরু-মহিষ আসা কমে গেছে আশঙ্কাজনক হারে। এতে বাজারে গরু-মহিষ ও মাংসের দামে প্রভাব পড়েছে। মাংসের কেজিতে গড়ে বেড়েছে ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত। এখন রাজধানীতে এক কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৪০০ টাকার উপরে, যা দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবর্তী ক্রেতাদের নাগালের বাইরে। এরই মধ্যে আসন্ন মুসলমানদের বড় উৎসব ঈদুল আজহা। ত্যাগের বার্তা নিয়ে আসা এই ঈদেই শুধু কোরবানি হয় ২৫ লাখেরও বেশি পশু। চিরাচরিতভাবে যার অর্ধেকই মিটে আসছে ভারতীয় পশুতে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম টেলিফোনে বলেন, ভারতীয় গরু বাজারে কম এলে দামে প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু এখন দামের ব্যাপারে নির্দিষ্ট ধারণা দেয়া সম্ভব নয়। কারণ, রাজধানীর হাটগুলোতে সাধারণত ঈদের এক থেকে দেড় সপ্তাহ আগে দেশি গরু উঠতে শুরু করে। যদিও এখন গাবতলীর হাটে পশুর সংখ্যা অন্যান্য সময়ের চেয়ে অন্তত ২৫ শতাংশ কম। তিনি মনে করেন, দেশের কৃষকদের ন্যায্যমূল্য দিতে ও নিজস্ব উৎপাদন বাড়াতে আমদানি কমানোর সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। এতে সাময়িক (চড়া দাম) সমস্যা হলেও দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের সুফল বয়ে আনবে।

অন্যদিকে, গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সহকারী গবেষণা পরিচালক ও গরু বাণিজ্য নিয়ে গবেষণায় যুক্ত খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, হাতে সময় কম, এজন্য উচ্চাভিলাষী কিছু করার সুযোগ নেই। তবে ভেতরে-ভেতরে সরকার কোনো উদ্যোগ নিলে সেটা খুব ভালো হয়। আর পশুর সঙ্কট সৃষ্টি হলেও মানুষ ঠিকই বিকল্প খুঁজে নেবে।

সীমান্তে কড়াকড়ি, ঈদে বাড়বে দাম : ২ ফেব্র“য়ারি পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত পরিদর্শনের সময় ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রী রাজনাথ সিং গরু পাচার বন্ধ করতে বিএসএফের প্রধান আশিস মিত্রকে নির্দেশ দেন। এর পর থেকে প্রায় বন্ধ হয়ে যায় গরু-মহিষ আসা। গরু ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা জানান, কোরবানি ঈদের আগে সর্বোচ্চসংখ্যক গরু পাচার হয় বাংলাদেশে। এই সময়ে বৈধ ও পাচার হওয়া গরুর কারণে সীমান্ত এলাকা থাকে জমজমাট। কিন্তু এবার সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) বাধার মুখে কড়া অবস্থানের কারণে সীমান্তে সুনসান নীরবতা। ভারত থেকে যাতে বাংলাদেশে গরু ঢুকতে না পারে, সেজন্য পাহারা বসিয়েছে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএসের কর্মীরা। এতে দু-একটি স্থান ছাড়া দেশের প্রায় সব সীমান্ত দিয়ে গরু আসা বন্ধ হয়ে গেছে। যদিও ঈদ সামনে রেখে সীমান্ত এলাকায় ভারতের ব্যবসায়ীরা গরু এনে জড়ো করছেন। কিন্তু ভয়ে সীমান্তের কাছাকাছি আসতে পারছেন না। কারণ দু’পারেই গরু না আনার জন্য মাইকে সতর্ক করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সতর্কাবস্থার মধ্যেও ঝুঁকি নিয়ে কিছু ব্যবসায়ী চোরাই ও পানিপথে গরু-মহিষ আনছেন। তবে তা সংখ্যায় খুবই কম। সম্প্রতি রাতে বসিরহাটসংলগ্ন ইছামতী, উত্তর ২৪ পরগনা ও মুর্শিদাবাদ জেলার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে পানিপথে গরু ভাসিয়ে আনা হচ্ছে। যদিও এ পদ্ধতিতে গরু পাচার করতে গিয়ে শুক্রবার রাতে মুর্শিদাবাদের শমসেরগঞ্জ থানার শোভাপুর সীমান্ত থেকে বাংলাদেশের ২৯ জন পাচারকারীকে আটক করে বিএসএফ। অভিযানে উদ্ধার হয় ৩৫০টি গরু। এ বিষয়ে শমসেরগঞ্জ থানায় মামলাও হয়েছে।

এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবি আর) ও বিজিবির হিসাব অনুসারে, প্রতি বছর গড়ে ২০ লাখ গরু ভারত থেকে আনা হয়। এ খাতে লেনদেনের পরিমাণ প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। আর বেসরকারি হিসাবে গরু ও টাকার পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি। সরকারি হিসাবে, ২০১৪ সালে গরু এসেছে ২০ লাখ ৩২ হাজার। ২০১৩ সালে আসে ২৩ লাখ ৭৪ হাজার, অর্থাৎ মাসে প্রায় দুই লাখ করে। কিন্তু ২ ফেব্র“য়ারি মন্ত্রীর নির্দেশের পর গরু পাচার কমতে থাকে। গত জানুয়ারিতে প্রায় এক লাখ গরু এলেও ফেব্র“য়ারিতে আসে মাত্র ৪৮ হাজার ৪৫০টি, মার্চে ৪৪ হাজার ৯৪৫টি। এপ্রিল, মে, জুন ও জুলাইয়ে ২০ হাজার গরুও আসেনি। আর চলতি আগস্টে প্রতিদিন এসেছে মাত্র দুই হাজারেরও কম গরু। অথচ এর আগে প্রতিদিন গড়ে ১০-১২ হাজার গরু ঢুকেছে।

গরু ও মাংস ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় গরু কম আসার কারণে অতিরিক্ত দাম গুনতে হচ্ছে। আগের ৫০ হাজার টাকার গরু ক্রয়ে এখন দিতে হচ্ছে ৬৫ থেকে ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত ‘ঘুষ’ (গরুপ্রতি দুই থেকে চার হাজার টাকার স্থলে ১২ থেকে ১৭ হাজার টাকা পর্যন্ত) দেয়ার কথা বলে বেশি দাম আদায় করছেন। আর চাহিদা থাকায় তা হরহামেশাই বিক্রিও হচ্ছে। তারা বলছেন, সীমান্তে কড়াকড়ি আর গরু আসা প্রায় বন্ধের কারণে দুই পারের ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। খালি পড়ে আছে গরুর করিডোর হিসেবে পরিচিত খাটালগুলো।

গরু পালনে আগ্রহীরা ৫ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন : দেশে প্রান্তিক চাষীদের গরুসহ সব ধরনের পশু পালনে উৎসাহ দিতে একজন কৃষককে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা ঋণ দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই ঋণে সুদের হার হবে ৫ শতাংশ। একটি গরু কেনার জন্য সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা নেয়া যাবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, অনধিক তিন মাসের প্রজননক্ষম হতে পারে এমন বকনা বাছুর কেনার জন্য ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা পাবেন গরু চাষীরা। এ ছাড়া রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আরো দেয়া হবে ১০ হাজার টাকা। একজন কৃষক সর্বোচ্চ চারটি বকনা বাছুর কেনার জন্য ঋণ সুবিধা পাবেন। প্রজ্ঞাপনে আরো বলা হয়েছে, ঋণ পরিশোধের জন্য ঋণগ্রহীতা অনধিক ১৪ মাস গ্রেস পিরিয়ড পাবেন। ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে নারী ও প্রান্তিক খামারিরা অগ্রাধিকার পাবেন। দেশের সব রাষ্ট্রায়ত্ত, বিশেষায়িত, আইএফআইসি, মিডল্যান্ড, আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান ব্যাংক থেকে এই ঋণ দেয়া হবে। এ ছাড়া নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইডিএলসি ফাইন্যান্স থেকেও এই ঋণ সুবিধা পাওয়া যাবে।   আজকের পত্রিকা

[gs-fb-comments]
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com