১৩শ শতাব্দী থেকে শুরু হওয়া সুলতানি সাম্রাজ্য এবংপরবর্তীতে তার উত্তরাধিকারী মুঘল সাম্রাজ্যের শাসকরা ভারতীয় উপমহাদেশে শিল্প এবং স্থাপত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন  তাদের নির্মিত অনেক সমাধি, মসজিদ-মাদ্রাসা স্বতন্ত্র গঠনশৈলী ও সূক্ষ নির্মাণকৌশলের নিদর্শন বহন করে। এই স্থাপত্যগুলো তকালীন শিল্প ঐতিহ্য এবং স্থানীয় কারিগরদের মার্জিত শৈলী ও দক্ষতা উভয়ই প্রকাশ পায়। সমগ্র ভারতবর্ষের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মধ্যযুগের মুসলিম শাসকদের বিভিন্ন স্থাপত্যকর্ম। বাবরি মসজিদও তেমন একটি স্থাপত্য , যা  ১৫২৮ সালে সম্রাট বাবরের আদেশে বর্তমান ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের ফৈজাবাদ জেলার রামায়ণ-খ্যাত অযোধ্যা শহরে অবস্থিত। মসজিদটি নির্মাণের পর থেকে কোনরুপ বিরোধ ছাড়া মুসলমানরা সেখানে ইবাদাত বন্দেগী করত। ঐতিহাসিক বাবরি সমজিদ নিয়ে প্রথম বিরোধ বাধে ১৮৫৩ সালে। কিছু হিন্দুত্ববাদী সংগঠন দাবি করতে শুরু করে রাম মন্দির গুড়িয়ে দিয়ে সেখানে তৈরি করা হয়েছে বাবরি মসজিদ। শুরু হতে থাকে হিন্দু মুসলিম সম্পর্কের টানাপোড়া। উভয়পক্ষের বিরোধ যখন তুঙ্গে তখন ১৮৫৯ সালে ব্রিটিশ সরকার একটি প্রাচীর দিয়ে হিন্দু ও মুসলমানদের আলাদা প্রার্থণার জায়গা করে দেয়। এতে বিরোধ অনেকটাই কমে গিয়েছিল, শান্তিপূর্ণ ভাবে উভয় ধর্মের মানুষই নিজ নিজ ধর্ম পালন করছিল। পুনরায় বিরোধ বাধে ১৯৪৯ সালের ২৩শে ডিসেম্বর- বেআইনিভাবে বাবরি মসজিদের অভ্যন্তরে রাম-সীতার মূর্তি স্থাপন করা হয়। মুসলিমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং দুই পক্ষই দেওয়ানি মামলা করে। তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু উত্তর প্রদেশের মূখ্যমন্ত্রী গোবিন্দ বল্লভ কে হিন্দু দেব-দেবীর মূর্তি অপসারণ ও মসজিদের দরজা বন্ধ করে দেয়ার নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে, ১৯৮৪ সালে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি), ইশ্বর রামের জন্মভূমি উদ্ধার ও তার সম্মানে সেখানে রাম মন্দির স্থাপনের লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করে। উক্ত কমিটি বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদভানির নেতৃত্বে বাবরি মসজিদের তালা খোলে দেয়ার জন্য ব্যাপক আন্দোলন শুরু করে। আন্দোলোনের মুখে তৎকালিন সরকার, ১৯৮৬ সালে মসজিদের দরজা উন্মুক্ত করে দিয়ে সেখানে হিন্দুদের উপাসনার সুযোগ করে দেন। এবং ঐবছরই মুসলিমরা এর প্রতিবাদে বাবরি মসজিদ অ্যাকশন কমিটি গঠন করেন১৯৮৯ সালে সাধারণ নির্বাচন এর আগে ভিএইচপি মসজিদ সংলগ্ন জায়গায় রাম মন্দিরের ভিত্তি স্থাপন করে এবং বিজেপি নেতা  লাল কৃষ্ণ আদভানি ভারতের দক্ষিণতম প্রান্ত থেকে মসজিদের উদ্দেশ্যে দশ হাজার কিলোমিটার দূরত্বের রাম রথযাত্রাশুরু করেন ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর এল কে আদভানি,মুরলি মনোহর যোশি, বিনয় কাটিয়াসহ অন্যান্য হিন্দুবাদী নেতারা মসজিদ প্রাঙ্গনে পৌঁছান। বিজেপি আর শিবসেনার নেতাদের আহ্বানে প্রায় দেড় লাখ মানুষ বাবরি মসজিদে হামলা চালায় ও মসজিদটি ধবংস করে ফেলে। এর ফলে পুরো ভারতে ছড়িয়ে পড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং ২ হাজারেরও বেশী মানুষ নিহত হয়। ২০০১ সালে মসজিদ ধ্বংসের বার্ষিকীতে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ঐ স্থানে আবারো মন্দির তৈরির দাবি তোলে ভিএইচপি ২০০২ সালের জানুয়ারীতে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী (হিন্দু-মুসলিম) দু’পক্ষের সমঝোতার জন্য নিজ কার্যালয়ে “অযোধ্যা সেল” গঠন করেন।  বলিউডের সাবেক অভিনেতা শত্রুঘ্ন সিনহাকে হিন্দু ও মুসলমানদের নেতাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করার দায়িত্ব দেয়া হয়  ভিএইচপি ১৫ই মার্চের মধ্যে মন্দির নির্মানকাজ শুরু করার ঘোষণা দেয়। শত শত স্বেস্বচ্ছাসেবক বিতর্কিত স্থানে জড়ো হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারী মাসে, অযোধ্যা থেকে ফিরতে থাকে হিন্দু অ্যাক্টিভিস্টদের বহনকারী একটি ট্রেনে হামলার ঘটনায় অন্তত ৫৮ জন মারা যায়। ট্রেন হামলার জের ধরে মার্চ মাসে গুজরাটে হওয়া দাঙ্গায় ১ হাজার থেকে ২ হাজার মানুষ মারা যায় মসজিদ ধ্বংসের প্রায় ১০ বছর পর ২০০২ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়াকে অযোধ্যার বিধ্বস্ত বাবরি মসজিদের জমিতে খনন কাজ চালানোর নির্দেশ দেয়। সেই নির্দেশ অনুযায়ী খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করে প্রত্নতাত্ত্বিকদের একটি দল। ২০০৩ সালের আগস্টে ৫৭৪ পৃষ্ঠার একটি রিপোর্ট কোর্টে জমা দেয় এএসআই। রিপোর্টে সংস্থাটি দাবি করে, বিধ্বস্ত বাবরি মসজিদের নিচে মাটি খুঁড়ে তারা একটি ‘বিশালাকার কাঠামো’ খুঁজে পেয়েছে। তবে সেটা যে কোনো মন্দিরের, এর পক্ষে কোনো প্রমাণ তারা তাদের রিপোর্টে বলেননি এএসআইর এই রিপোর্ট নিয়ে আপত্তি ওঠে দলের অন্যান্য প্রত্নতাত্ত্বিকদের মধ্য থেকেই। রিপোর্টকেঅস্পষ্ট ও স্ববিরোধীনাকচ করে দেয় বাররি মসজিদ মামলার বাদী সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড পরবর্তীতে ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১০- হাইকোর্ট রায় দেয়,বিতর্কিত জমি সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড, নির্মোহী আখড়া এবং রামলালার মধ্যে সমবণ্টন করে দেয়া হোক। এই রায়ে তিন বিচারপতি সহমত পোষণ করেননি। ২-১ ভিত্তিতে রায়দান হয়। এই রাইয়ে কোন পক্ষই সন্তুষ্ট ছিল না, উভয়পক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১১ সালে ভারতের সুপ্রীম কোর্ট সেই রায় বাতিল করে। ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ সালে বিতর্কিত স্থানে রাম মন্দির তৈরির অনুমতি চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন সুব্রহ্মণ্যম স্বামী২১ মার্চ, ২০১৭- প্রধান বিচারপতি জেএস খেহর যুযুধান পক্ষগুলোকে আদালতের বাইরে সমঝোতার প্রস্তাব দেন। একই বছরের ৭ আগস্ট- এলাহাবাদ হাইকোর্টের ১৯৯৪ সালের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে করা আবেদনের শুনানির জন্য তিন বিচারপতির বেঞ্চ গঠন করে সুপ্রিম কোর্ট ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮- সুপ্রিম কোর্টে সমস্ত দেওয়ানি মামলার আবেদনের শুনানি শুরু হয় এবং ১৪ মার্চ- সুব্রহ্মণ্যম স্বামী-সহ সকল অন্তর্বর্তী আবেদন (যারা এই মামলার পক্ষ হতে চেয়েছিল) নাকচ করে সুপ্রিম কোর্ট ৮ই জানুয়ারী, ২০১৯ সুপ্রীম কোর্ট প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈকের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠন করা হয়। বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা হলেন এস এ বোবদে, এনভি রামানা, ইউইউ ললিত এবং ডিওয়াই চন্দ্রচূড়। ১০জানুয়ারি- বিচারপতি ইউইউ ললিত নিজেকে মামলা থেকে সরিয়ে নেন। এবং ২৫ জানুয়ারি- সুপ্রিম কোর্ট পাঁচ সদস্যের নতুন সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠন করে নতুন বেঞ্চের সদস্যরা হলেন বিচারপতি রঞ্জন গগৈ, বিচারপতি এসএ বোবদে, ডিওয়াই চন্দ্রচূড়, অশোক ভূষণ এবং এস এ নাজির  সুপ্রিম কোর্ট আদালতের বাইরে সব পক্ষকে নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করেন। কিন্তু তাদের এ চেষ্টা ব্যর্থ হয় যার ফলে বাধ্য হয়েই মামলার সুনানি করতে হয়। সর্বমোট, ২৬ বছর যাবত আইনি লড়াই চলছে। শুধু সুপ্রিম কোর্টেই মামলা চলছে প্রায় আট বছর ধরে। টানা ৪০ দিন যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনের পর পরে রায় লেখার জন্য মাসখানেক সময় নেন বেঞ্চ। অবশেষে গতকাল রায় ঘোষণা হলো। অযোধ্যায় বিতর্কিত জায়গায় মন্দির নির্মাণের পক্ষে রায় দেওয়া হয়েছে। ২.৭৭ একর বিরোধপূর্ণ জমিতে মন্দিরের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে ট্রাস্ট গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। ওই জমিতেই বাবরি মসজিদ ছিল। আর মসজিদ নির্মাণের সরকারকে অযোধ্যারই কোন বিখ্যাত স্থানে পাঁচ একর জমি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের রায়ে বলা হয়, মসজিদের নিচে স্থাপনা থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে এটি মন্দির কি না, তা নিশ্চিত নয়। সুপ্রিম কোর্ট তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেছেন, মসজিদটি ফাঁকা জায়গায় নির্মাণ হয়নি। এর নিচে অন্য কাঠামো ছিল। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার খননের ফলে যেসব জিনিস পাওয়া গেছে, এতে বোঝা গেছে সেগুলো ইসলামী নয়। আদালত আরো বলেছেন,বাবরি মসজিদ ভাঙার মধ্য দিয়ে আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে রায়ে বলা হলো স্থাপনার ওপর মসজিদ নির্মিত হয়েছে। কিন্তু স্থাপনার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে নিশ্চিত করে বলা যায় না এটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ কি না। তাহলে পুরাতন স্থাপনার উপর যে যুক্তিতে  মসজিদ পুনর্নির্মাণ যৌক্তিক নয়, একই যুক্তিতে মন্দির নির্মাণও যুক্তিসংগত নয়। এটি উভয় ধর্মের তীর্থস্থান ঘোষণা করে এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য উভয় ধর্মের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি ট্রাস্ট গঠন করা অধিকতর যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য হতে পারত। এই রায় নিয়ে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন গুলো প্রবল উচ্ছাস প্রকাশ করলেও, প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে সুন্নি ওয়াক্ফ বোর্ডের আইনজীবী জাফর আইব জিলানি বলেন, ‘আমরা রায়কে সম্মান জানাই। কিন্তু এতে আমরা সন্তুষ্ট নই। আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে চিন্তাভাবনা করব।তবে এ নিয়ে তাঁরা কোনো রকম বিক্ষোভ বা প্রতিবাদ করবেন না বলেও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশেও এ রায় নিয়ে যেন প্রতিক্রিয়া না হয়,আমরাও তেমনটি প্রত্যাশা করব। এখনো রিভিও দায়ের করার আইনি লড়াই বাকি রয়েছে"/>

বাবরি মসজিদেরঅদ্যপান্ত ও রায়– মু. মাহমুদুল হাসান সাইফুল  

11 November, 2019 : 6:17 am ২৫৬

 

১৩শ শতাব্দী থেকে শুরু হওয়া সুলতানি সাম্রাজ্য এবংপরবর্তীতে তার উত্তরাধিকারী মুঘল সাম্রাজ্যের শাসকরা ভারতীয় উপমহাদেশে শিল্প এবং স্থাপত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন  তাদের নির্মিত অনেক সমাধি, মসজিদ-মাদ্রাসা স্বতন্ত্র গঠনশৈলী ও সূক্ষ নির্মাণকৌশলের নিদর্শন বহন করে। এই স্থাপত্যগুলো তকালীন শিল্প ঐতিহ্য এবং স্থানীয় কারিগরদের মার্জিত শৈলী ও দক্ষতা উভয়ই প্রকাশ পায়। সমগ্র ভারতবর্ষের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মধ্যযুগের মুসলিম শাসকদের বিভিন্ন স্থাপত্যকর্ম।

বাবরি মসজিদও তেমন একটি স্থাপত্য , যা  ১৫২৮ সালে সম্রাট বাবরের আদেশে বর্তমান ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের ফৈজাবাদ জেলার রামায়ণ-খ্যাত অযোধ্যা শহরে অবস্থিত। মসজিদটি নির্মাণের পর থেকে কোনরুপ বিরোধ ছাড়া মুসলমানরা সেখানে ইবাদাত বন্দেগী করত।

ঐতিহাসিক বাবরি সমজিদ নিয়ে প্রথম বিরোধ বাধে ১৮৫৩ সালে। কিছু হিন্দুত্ববাদী সংগঠন দাবি করতে শুরু করে রাম মন্দির গুড়িয়ে দিয়ে সেখানে তৈরি করা হয়েছে বাবরি মসজিদ। শুরু হতে থাকে হিন্দু মুসলিম সম্পর্কের টানাপোড়া। উভয়পক্ষের বিরোধ যখন তুঙ্গে তখন ১৮৫৯ সালে ব্রিটিশ সরকার একটি প্রাচীর দিয়ে হিন্দু ও মুসলমানদের আলাদা প্রার্থণার জায়গা করে দেয়। এতে বিরোধ অনেকটাই কমে গিয়েছিল, শান্তিপূর্ণ ভাবে উভয় ধর্মের মানুষই নিজ নিজ ধর্ম পালন করছিল।

পুনরায় বিরোধ বাধে ১৯৪৯ সালের ২৩শে ডিসেম্বর- বেআইনিভাবে বাবরি মসজিদের অভ্যন্তরে রাম-সীতার মূর্তি স্থাপন করা হয়। মুসলিমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং দুই পক্ষই দেওয়ানি মামলা করে। তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু উত্তর প্রদেশের মূখ্যমন্ত্রী গোবিন্দ বল্লভ কে হিন্দু দেব-দেবীর মূর্তি অপসারণ ও মসজিদের দরজা বন্ধ করে দেয়ার নির্দেশ দেন।

পরবর্তীতে, ১৯৮৪ সালে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি), ইশ্বর রামের জন্মভূমি উদ্ধার ও তার সম্মানে সেখানে রাম মন্দির স্থাপনের লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করে। উক্ত কমিটি বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদভানির নেতৃত্বে বাবরি মসজিদের তালা খোলে দেয়ার জন্য ব্যাপক আন্দোলন শুরু করে। আন্দোলোনের মুখে তৎকালিন সরকার, ১৯৮৬ সালে মসজিদের দরজা উন্মুক্ত করে দিয়ে সেখানে হিন্দুদের উপাসনার সুযোগ করে দেন। এবং ঐবছরই মুসলিমরা এর প্রতিবাদে বাবরি মসজিদ অ্যাকশন কমিটি গঠন করেন

১৯৮৯ সালে সাধারণ নির্বাচন এর আগে ভিএইচপি মসজিদ সংলগ্ন জায়গায় রাম মন্দিরের ভিত্তি স্থাপন করে এবং বিজেপি নেতা  লাল কৃষ্ণ আদভানি ভারতের দক্ষিণতম প্রান্ত থেকে মসজিদের উদ্দেশ্যে দশ হাজার কিলোমিটার দূরত্বের রাম রথযাত্রাশুরু করেন ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর এল কে আদভানি,মুরলি মনোহর যোশি, বিনয় কাটিয়াসহ অন্যান্য হিন্দুবাদী নেতারা মসজিদ প্রাঙ্গনে পৌঁছান। বিজেপি আর শিবসেনার নেতাদের আহ্বানে প্রায় দেড় লাখ মানুষ বাবরি মসজিদে হামলা চালায় ও মসজিদটি ধবংস করে ফেলে। এর ফলে পুরো ভারতে ছড়িয়ে পড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং ২ হাজারেরও বেশী মানুষ নিহত হয়।

২০০১ সালে মসজিদ ধ্বংসের বার্ষিকীতে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ঐ স্থানে আবারো মন্দির তৈরির দাবি তোলে ভিএইচপি ২০০২ সালের জানুয়ারীতে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী (হিন্দু-মুসলিম) দু’পক্ষের সমঝোতার জন্য নিজ কার্যালয়ে “অযোধ্যা সেল” গঠন করেন।  বলিউডের সাবেক অভিনেতা শত্রুঘ্ন সিনহাকে হিন্দু ও মুসলমানদের নেতাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করার দায়িত্ব দেয়া হয়  ভিএইচপি ১৫ই মার্চের মধ্যে মন্দির নির্মানকাজ শুরু করার ঘোষণা দেয়। শত শত স্বেস্বচ্ছাসেবক বিতর্কিত স্থানে জড়ো হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারী মাসে, অযোধ্যা থেকে ফিরতে থাকে হিন্দু অ্যাক্টিভিস্টদের বহনকারী একটি ট্রেনে হামলার ঘটনায় অন্তত ৫৮ জন মারা যায়। ট্রেন হামলার জের ধরে মার্চ মাসে গুজরাটে হওয়া দাঙ্গায় ১ হাজার থেকে ২ হাজার মানুষ মারা যায়

মসজিদ ধ্বংসের প্রায় ১০ বছর পর ২০০২ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়াকে অযোধ্যার বিধ্বস্ত বাবরি মসজিদের জমিতে খনন কাজ চালানোর নির্দেশ দেয়। সেই নির্দেশ অনুযায়ী খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করে প্রত্নতাত্ত্বিকদের একটি দল।

২০০৩ সালের আগস্টে ৫৭৪ পৃষ্ঠার একটি রিপোর্ট কোর্টে জমা দেয় এএসআই। রিপোর্টে সংস্থাটি দাবি করে, বিধ্বস্ত বাবরি মসজিদের নিচে মাটি খুঁড়ে তারা একটি ‘বিশালাকার কাঠামো’ খুঁজে পেয়েছে। তবে সেটা যে কোনো মন্দিরের, এর পক্ষে কোনো প্রমাণ তারা তাদের রিপোর্টে বলেননি এএসআইর এই রিপোর্ট নিয়ে আপত্তি ওঠে দলের অন্যান্য প্রত্নতাত্ত্বিকদের মধ্য থেকেই। রিপোর্টকেঅস্পষ্ট ও স্ববিরোধীনাকচ করে দেয় বাররি মসজিদ মামলার বাদী সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড

পরবর্তীতে ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১০- হাইকোর্ট রায় দেয়,বিতর্কিত জমি সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড, নির্মোহী আখড়া এবং রামলালার মধ্যে সমবণ্টন করে দেয়া হোক। এই রায়ে তিন বিচারপতি সহমত পোষণ করেননি। ২-১ ভিত্তিতে রায়দান হয়। এই রাইয়ে কোন পক্ষই সন্তুষ্ট ছিল না, উভয়পক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১১ সালে ভারতের সুপ্রীম কোর্ট সেই রায় বাতিল করে।

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ সালে বিতর্কিত স্থানে রাম মন্দির তৈরির অনুমতি চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন সুব্রহ্মণ্যম স্বামী২১ মার্চ, ২০১৭- প্রধান বিচারপতি জেএস খেহর যুযুধান পক্ষগুলোকে আদালতের বাইরে সমঝোতার প্রস্তাব দেন। একই বছরের ৭ আগস্ট- এলাহাবাদ হাইকোর্টের ১৯৯৪ সালের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে করা আবেদনের শুনানির জন্য তিন বিচারপতির বেঞ্চ গঠন করে সুপ্রিম কোর্ট ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮- সুপ্রিম কোর্টে সমস্ত দেওয়ানি মামলার আবেদনের শুনানি শুরু হয় এবং ১৪ মার্চ- সুব্রহ্মণ্যম স্বামী-সহ সকল অন্তর্বর্তী আবেদন (যারা এই মামলার পক্ষ হতে চেয়েছিল) নাকচ করে সুপ্রিম কোর্ট

৮ই জানুয়ারী, ২০১৯ সুপ্রীম কোর্ট প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈকের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠন করা হয়। বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা হলেন এস এ বোবদে, এনভি রামানা, ইউইউ ললিত এবং ডিওয়াই চন্দ্রচূড়। ১০জানুয়ারি- বিচারপতি ইউইউ ললিত নিজেকে মামলা থেকে সরিয়ে নেন। এবং ২৫ জানুয়ারি- সুপ্রিম কোর্ট পাঁচ সদস্যের নতুন সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠন করে নতুন বেঞ্চের সদস্যরা হলেন বিচারপতি রঞ্জন গগৈ, বিচারপতি এসএ বোবদে, ডিওয়াই চন্দ্রচূড়, অশোক ভূষণ এবং এস এ নাজির  সুপ্রিম কোর্ট আদালতের বাইরে সব পক্ষকে নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করেন। কিন্তু তাদের এ চেষ্টা ব্যর্থ হয় যার ফলে বাধ্য হয়েই মামলার সুনানি করতে হয়। সর্বমোট, ২৬ বছর যাবত আইনি লড়াই চলছে। শুধু সুপ্রিম কোর্টেই মামলা চলছে প্রায় আট বছর ধরে। টানা ৪০ দিন যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনের পর পরে রায় লেখার জন্য মাসখানেক সময় নেন বেঞ্চ। অবশেষে গতকাল রায় ঘোষণা হলো। অযোধ্যায় বিতর্কিত জায়গায় মন্দির নির্মাণের পক্ষে রায় দেওয়া হয়েছে। ২.৭৭ একর বিরোধপূর্ণ জমিতে মন্দিরের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে ট্রাস্ট গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। ওই জমিতেই বাবরি মসজিদ ছিল। আর মসজিদ নির্মাণের সরকারকে অযোধ্যারই কোন বিখ্যাত স্থানে পাঁচ একর জমি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের রায়ে বলা হয়, মসজিদের নিচে স্থাপনা থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে এটি মন্দির কি না, তা নিশ্চিত নয়। সুপ্রিম কোর্ট তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেছেন, মসজিদটি ফাঁকা জায়গায় নির্মাণ হয়নি। এর নিচে অন্য কাঠামো ছিল। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার খননের ফলে যেসব জিনিস পাওয়া গেছে, এতে বোঝা গেছে সেগুলো ইসলামী নয়। আদালত আরো বলেছেন,বাবরি মসজিদ ভাঙার মধ্য দিয়ে আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে রায়ে বলা হলো স্থাপনার ওপর মসজিদ নির্মিত হয়েছে। কিন্তু স্থাপনার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে নিশ্চিত করে বলা যায় না এটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ কি না। তাহলে পুরাতন স্থাপনার উপর যে যুক্তিতে  মসজিদ পুনর্নির্মাণ যৌক্তিক নয়, একই যুক্তিতে মন্দির নির্মাণও যুক্তিসংগত নয়। এটি উভয় ধর্মের তীর্থস্থান ঘোষণা করে এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য উভয় ধর্মের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি ট্রাস্ট গঠন করা অধিকতর যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য হতে পারত।

এই রায় নিয়ে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন গুলো প্রবল উচ্ছাস প্রকাশ করলেও, প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে সুন্নি ওয়াক্ফ বোর্ডের আইনজীবী জাফর আইব জিলানি বলেন, ‘আমরা রায়কে সম্মান জানাই। কিন্তু এতে আমরা সন্তুষ্ট নই। আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে চিন্তাভাবনা করব।তবে এ নিয়ে তাঁরা কোনো রকম বিক্ষোভ বা প্রতিবাদ করবেন না বলেও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশেও এ রায় নিয়ে যেন প্রতিক্রিয়া না হয়,আমরাও তেমনটি প্রত্যাশা করব। এখনো রিভিও দায়ের করার আইনি লড়াই বাকি রয়েছে

[gs-fb-comments]
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com